মিয়ানমারের শরণার্থী বিষয়ে গত ১১ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ
এ সমস্যা মিয়ানমার সৃষ্টি করেছে
১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং
এ সমস্যা মিয়ানমার সৃষ্টি করেছে
শেখ হাসিনা

মাননীয় স্পিকার, এই দৃশ্য দেখা যায় না! আমরা তো মানুষ! আমাদের ভেতরে তো একটা মনুষ্যত্ব আছে। তাদের আমরা নিষেধ করব কীভাবে? কারণ আমাদেরও তো অভিজ্ঞতা আছে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঠিক যেভাবে, যে কায়দায় আমাদের উপর অত্যাচার শুরু করেছিল, অগ্নি সংযোগ করা, মেয়েদের রেপ করা, মানুষকে হত্যা করা এবং ছোট্ট শিশুকে হত্যা করা— ঠিক সেই ঘটনার সেই দৃশ্যগুলি যেন আবার চোখের সামনে ভেসে আসছে

মাননীয় স্পিকার, আজকে যে বিষয়টি নিয়ে আমরা এখানে আলোচনা করছি এবং মাননীয় সংসদ সদস্য, পররাষ্ট্র বিষয়ক স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবং সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. দীপু মনি যে প্রস্তাবটি এখানে উত্থাপন করেছেন আমি তার প্রতি সম্পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে এটুকু বলব যে, আমাদের বাংলাদেশে আমাদের প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার থেকে প্রায় কয়েক লক্ষ মানুষ আজ আশ্রয় নিয়েছে। এখানে আসতে বাধ্য হয়েছে। এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। কারণ একটি দেশের নাগরিক, তাদের উপর অমানবিক অত্যাচারের যে সমস্ত চিত্র আমরা দেখলাম তা নিন্দা করবার ভাষা আমি পাচ্ছি না।

রোহিঙ্গারা যে মিয়ানমারেরই নাগরিক এটা তো সকলেরই জানা। ১৯৫৪ সালে বার্মা অর্থাত্ বর্তমান মিয়ানমারের প্রধানমন্ত্রী উ-নু রোহিঙ্গাদের অন্যান্য যে জাতিগোষ্ঠী আছে যেমন— কাটিন, কাইয়া, মুন, রাখাইন, সান— এ ধরনের আরও বিভিন্ন প্রায় ১৪৫টির মতো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতি আছে। তাদের সকলের সঙ্গেই সমান অধিকার এই রোহিঙ্গাদের আছে। সে কথা তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং রেডিওতে তা প্রচার করা হয়েছিল। কাজেই, যে অধিকার তারা একবার দিয়েছিল এবং তাদের ভোটের অধিকার ছিল, সবকিছুই ছিল— কিন্তু সেখানে দেখা গেল যে, ১৯৭৪ সালে এই বার্মা, বর্তমান মিয়ানমারের মিলিটারি জান্তা এই অধিকার কেড়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে। আমরা লক্ষ করলাম যে, ১৯৭৮ সালে এ রোহিঙ্গাদের বিতাড়ন করা শুরু করেছিল। এরপর তারা ১৯৮২ সালে যে ‘সিটিজেন আইন’ করে সে আইনে একটা চার স্তর বিশিষ্ট সিটিজেনশিপ প্রয়োগ করে। এটা করার উদ্দেশ্যই ছিল এদের অধিকারটা কেড়ে নেওয়া। আর ২০১৫ সালে এসে এই রোহিঙ্গাদের সমস্ত ভোটের অধিকার কেড়ে নেয়। এভাবে একটা জাতির প্রতি এই ধরনের আচরণ মিয়ানমার সরকার কেন করছে, এটা সত্যিই আমাদের বোধগম্য নয়।

আমরা বারবার এটার প্রতিবাদ করেছি এবং বিশেষ করে ’৭৮ সালে একদফা এই রোহিঙ্গারা আমাদের দেশে আশ্রয় নেয়। এরপর ১৯৮১-৮২ সালে, এরপর ১৯৯১-৯২ সালে।

মাননীয় স্পিকার, ইতোমধ্যে আপনি আমাদের মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে শুনেছেন যে, তখন মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের একটা কূটনৈতিক সম্পর্ক হয় এবং একটা সমঝোতা স্মারক হয়। যার ফলে প্রায় আড়াই লাখ রোহিঙ্গা তাদের নিজের মাতৃভূমিতে প্রত্যাবর্তন করে। ১৯৭৮ সালে যারা এসেছিল তারাও সকলে চলে গেল। ১৯৮১-৮২ সালে যারা এসেছিল তাদেরও ফেরত নেওয়া হলো। ১৯৯১-৯২ সালে যারা এসেছিল তাদেরও ফেরত নেওয়া হলো। কিন্তু সেখানে কিছু রোহিঙ্গা থেকে গেল। তাদের আর ফেরত নেওয়া হ’ল না। সেখানেই একটা বাধা পড়ল। আমরা বারবার এ ব্যাপারে তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছি। বলেছি যে, তাদের নাগরিকদের তাদের ফিরিয়ে নেওয়া উচিত।

এরপরে যখন গণতন্ত্র ফিরে এল, অং সান সু চি হচ্ছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তার সঙ্গে আমার বিভিন্ন সময়ে দেখা হয়েছে। যখনই দেখা হয়েছে তাকেও আমরা এই অনুরোধটা করেছি যে, যারা এখন আমাদের দেশে আছে তাদের ফিরিয়ে নাও। কিন্তু ফিরিয়ে নেওয়া তো দূরের কথা, আমরা দেখলাম এরপরে আবার সেই ২০১২ সালে একদফা আবার এই রোহিঙ্গারা আমাদের দেশে এসে আশ্রয় নিতে বাধ্য হলো। কারণ তাদের উপর একটা অমানবিক অত্যাচার শুরু হলো।

এরপর ২০১৫-১৬ সালে, আবার এই ২০১৭ সালে এখন ব্যাপক হারে এসেছে। এই ঘটনার সূত্রপাতটা আমরা যেটা দেখি ওখানে কোনো একটা গোষ্ঠী আছে তারা মিলিটারির উপর হামলা করেছে। মিয়ানমারের যে বর্ডার ফোর্স তাদের উপর হামলা করে বেশ কয়েকজন সদস্যকে হত্যা করে। ২০১২ সালে একবার এই ঘটনা ঘটায়। তখনই সাধারণ নাগরিকের উপর অত্যাচার শুরু হয়। আবার ২০১৬ সালে এবং ২০১৭ সালে ঠিক একই ঘটনা ঘটানো হলো। যার ফলাফলটা হিসেবে সাধারণ নিরীহ মানুষের উপর অত্যাচার, নির্যাতন শুরু হলো। এই নির্যাতন এমন পর্যায়ে গেছে যে, যেটা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না।

 যখন মানুষ আসতে শুরু করেছে আমরা দেখেছি নারী, শিশুই বেশি। নৌকাডুবি হয়ে সেখানে শিশুর লাশ নাফ নদীতে ভাসছে। এমনকি গুলি খাওয়া, মাথায় এবং বুকে গুলি খাওয়া লাশ নদীতে অথবা সাগরে ভেসে ভেসে সেই লাশ চলে আসছে। সেখানে আগুন দিয়ে ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। মেয়েদের উপর পাশবিক অত্যাচার করা হচ্ছে।

মাননীয় স্পিকার, এই দৃশ্য দেখা যায় না! আমরা তো মানুষ! আমাদের ভেতরে তো একটা মনুষ্যত্ব আছে। তাদের আমরা নিষেধ করব কীভাবে? কারণ আমাদেরও তো অভিজ্ঞতা আছে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঠিক যেভাবে, যে কায়দায় আমাদের উপর অত্যাচার শুরু করেছিল, অগ্নি সংযোগ করা, মেয়েদের রেপ করা, মানুষকে হত্যা করা এবং ছোট্ট শিশুকে হত্যা করা— ঠিক সেই ঘটনার সেই দৃশ্যগুলি যেন আবার চোখের সামনে ভেসে আসছে। আমাদের জন্য এটা কঠিন যে, এতগুলো মানুষকে এখানে রাখা, তাদের আশ্রয় দেওয়া। কিন্তু এরা তো মানবজাতি। আমরা তো ফেলে দিতে পারি না। কারণ আমরা তো ভুক্তভোগী, আমরা জানি। আমিও তো রিফিউজি ছিলাম ছয় বছর। ’৭৫-এ যখন আমার মা-বাবা, ভাই-বোন সকলকে হত্যা করল, আমিও তো দেশে আসতে পারিনি। কাজেই একটা রিফিউজি হয়ে থাকা সেটা যে কতটা অবমাননাকর এই যন্ত্রণা তো আমি আর আমার ছোট বোন রেহানা আমরা খুব ভালোভাবে বুঝি। তাই আমরা এদের আশ্রয় দিয়েছি মানবিক কারণে।

কিন্তু আমরা চাই তারা তাদের নিজের ভূমিতে যেন ফিরে যায়। আমরা সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়— এই নীতিতে বিশ্বাসী। আমাদের মহান নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে পররাষ্ট্র নীতি দিয়েছেন সেই নীতিমালা অনুসরণ করেই আমরা প্রত্যেক দেশের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে রাষ্ট্র পরিচালনা করছি। কারও সাথে বৈরি সম্পর্ক হোক সেটা আমরা চাই না। সকলের সাথে বন্ধুত্ব নিয়েই থাকতে চাই।

 মিয়ানমার সরকারকে আমি এইটুকু বলব যে, তাদের নাগরিক, শত শত বছর ধরে তারা বাস করছে। এক সময় তাদের ভোটের অধিকার ছিল। তাদের সবই ছিল। হঠাত্ তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া বা তাদের ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়া বা তাদের দেশ থেকে বিতাড়িত করা, এর ফলাফল ঠিক কী দাঁড়াতে পারে সেটা কি তারা চিন্তা করেছে? কেন তারা এ ধরনের কাজ করছে?

 আমাদের দেশেও পার্বত্য চট্টগ্রামে একটা অশান্ত পরিবেশ ছিল। দুই দশক ধরে অর্থাত্ সেই ১৯৭৬ সাল থেকে এই সমস্যাটা সৃষ্টি হয় এবং সেটা অব্যাহত ছিল। ১৯৯৬ সালে যখন আমরা সরকার গঠন করি, তখন পার্বত্য চট্টগ্রামে আমরা শান্তি চুক্তি করি। পার্বত্য চট্টগ্রামে এই অশান্ত পরিবেশ মোকাবিলা করার জন্য এখানে সামরিক কায়দায় এটাকে সমাধানের চেষ্টা করা হতো। যখন আমাদের দেশে যে সামরিক জান্তারা ক্ষমতায় ছিল তারা ঐ পথ অনুসরণ করত।

আমি ১৯৮১ সালে বাংলাদেশে ফিরে এসে ঘোষণা দিয়েছিলাম যে, এটা সামরিকভাবে সমাধান করার যোগ্য না। এটা রাজনৈতিকভাবেই সমাধান করতে হবে। আমাদের পার্টির পক্ষ থেকে ছোট্ট একটা সেল গঠন করি এবং সঙ্গে সঙ্গে জানার চেষ্টা করি। যখন ১৯৯৬ সালে সরকার গঠন করি, দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে পার্লামেন্টের একটা কমিটি করে আমরা এটা সমাধান করি। আমরা শান্তি চুক্তি করি এবং বাংলাদেশের যারা নাগরিক ভারতে রিফিউজি হিসেবে ছিল তাদের সকলকে ফিরিয়ে এনে পুনর্বাসন করি। কারণ আমি মনে করি, যারা আমার দেশের নাগরিক, তারা অন্য দেশে রিফিউজি হয়ে থাকা এটা আমার দেশের জন্য মোটেই সম্মানজনক নয়। কারণ আমাদের নাগরিক আমাদের দেশেই থাকবে। অন্য দেশে তারা কেন থাকবে? তাই তাদের আমরা ফিরিয়ে এনেছি।

আমি একথাটা বারবার মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে যখনই আমার কথা হয়েছে তখনই বলেছি। এমনকি এদের পুনর্বাসনের জন্য আমরা এটাও বলেছি যে, আমরা আমাদের বহু গৃহহারা মানুষ, নদীভাঙা মানুষ, ভূমিহীন মানুষ তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে থাকি। কাজেই আমরা এ বিষয়ে তাদের সহযোগিতা করতে পারি। আমাদের অভিজ্ঞতা তারা যাতে কাজে লাগাতে পারে, সে ব্যবস্থা আমরা করে দেব। কিন্তু তারা যেন তাদের লোকগুলো ফেরত নিয়ে যায়।

মাননীয় স্পিকার, আপনি শুনেছেন, আমাদের পররাষ্ট্র সচিব বারবার তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন, সেখানে গেছেন। আমাদের মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী গেছেন, আলোচনা করেছেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে, তারা ফেরত নেওয়া তো দূরের কথা— এমন একটা অবস্থার সৃষ্টি করল যে, আজকে সমস্ত বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছে। আমি ঠিক জানি না। বিশ্বব্যাপী আমি যদি তাকাই আমার খুব কষ্ট হয়। সমস্ত বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের উপরে আক্রমণ করার একটা মানসিকতা দেখতে পাচ্ছি। মুসলমানরা রিফিউজি হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এখানে সেখানে। আমরা যেমন আইলানের লাশ দেখেছি সাগরপাড়ে ঠিক তেমনি নাফ নদীতে দেখি শিশুদের লাশ। কেন?

আমাদের আর একটা দুর্ভাগ্য হলো যে, আমাদের সমস্ত মুসলিম দেশ বা মুসলিম উম্মাহ যদি এটা অনুভব করতে পারত আর সবাই যদি ঐকমত্যে থাকতে পারত; তাহলে মুসলমানদের উপর এই অত্যাচারটা কেউ করতে পারত না। কিন্তু দুর্ভাগ্য, এটা আমি দেখতে পাচ্ছি বিশ্বব্যাপী এরকমই একটা ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। এখানে কে হিন্দু, মুসলমান, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ- এটা কোনো কথা না। আমরা মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখি এবং মানবিকভাবে তাদের আমরা আশ্রয় দিয়েছি। কারণ, এখানে শুধু মুসলমান না, বেশ কিছু হিন্দুও নির্যাতিত হয়ে এসেছে। আজকে আমরা যখন দেখি ঐ লাশের ছবি, আজকে সত্যিই তা বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছে।

এখানে অনেকেই অং সান সুচির ব্যাপারে কথা তুলেছেন। আপনারা জানেন যে, মিয়ানমারে দীর্ঘদিন মিলিটারি ডিকটেরশিপ চলেছে। কেবল গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু। কিন্তু সেখানেও আইন করে অং সান সুচিকে কিন্তু মিয়ানমারের রাষ্ট্রপতি হতে দেয়নি বা সরকারপ্রধান হতে দেয়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব তাকে দেয়া হয়েছে। কাজেই তার ক্ষমতাই-বা কতটুকু আছে, সেটাও আপনাদের একটু বিবেচনা করতে হবে। নিজের ক্ষমতা প্রয়োগ করবে পার্লামেন্টে, সেখানেও কিন্তু তাদের সংখ্যাধিক্য বেশি। মিলিটারি প্রতিনিধির সংখ্যা বেশি। পলিসি মেকিংয়ে তারা যেটা বলবে, সেটাই। কাজেই এখানে যেটা দেখা যাচ্ছে যে, তারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। তারা ধাপে ধাপে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিচ্ছে। তাদের দেশ থেকে বিতাড়িত করছে। কেন তারা এটা করছে? সেটাই হলো আমাদের প্রশ্ন।

আজকে আমরা মানবিক কারণে তাদের জায়গা দিচ্ছি। আমাদের সমস্যা যে, এত লোক এখানে এসে গেছে, ছোট ছোট শিশুরা, নারীরা; এদের আমরা কোথায় ঠাঁই দেব? আজকে আমরা তাদের জায়গা দিচ্ছি। কারণ আমরা তো অমানুষ হতে পারি না। আমরা তো অমানবিক আচরণ করতে পারি না। কিন্তু মিয়ানমারকে এটা স্পষ্টভাবে মানতে হবে যে, এরা তাদেরই নাগরিক; আইন করে যেভাবেই হোক তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিতে পারবে না।

মিয়ানমারের এক জেনারেল সাহেব ঘোষণা দিয়েছেন, এরা সবাই বাঙালি। বাঙালি তো শুধু বাংলাদেশে নাই, বাঙালি তো পশ্চিমবঙ্গেও আছে। বাঙালি পৃথিবীর বহু দেশেই আছে। বাঙালি বলেই তাদের তাড়িয়ে দেবে, এটা কেমন কথা? তাদের ভাষা, সব কিছু তো আলাদা, তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ আলাদা, সবই তো বার্মিজ, মিয়ানমারেরই। তো তাদের আবার কালার দেওয়া হবে কেন? আর মানুষ কখনও এদিকে আসে, ওদিকে যায়, এরকম তো যাতায়াত করতেই থাকে, যুগ যুগ ধরে হয়েছে। কিন্তু এরা শত শত বছর ধরে মিয়ানমারেই থেকেছে, ওখানে তাদের আদিনিবাস। তাহলে তাদের কেন এভাবে বিতাড়িত করা হবে? অত্যাচার করা হবে? এভাবে নির্যাতন করা হবে?

সেই সাথে আমি বলব যে, যারা দুইটা পুলিশ মারল, দশটা পুলিশ মারল, কি পাঁচটা মিলিটারি মারল বা একশ’টা আর্মি লোক মারল— এটা মেরে তারা কী অর্জন করছে? তারা কি এটা বোঝে না যে, তাদের এ সমস্ত কারণে আজকে লক্ষ লক্ষ মানুষ, যারা নিরীহ, তাদের ঘর-বাড়ি পুড়ে যাচ্ছে? তারা মৃত্যুবরণ করছে, তাদের উপরে আঘাত করছে, ছোট ছোট শিশুদের উপর অত্যাচার হচ্ছে, তাদেরই মা-বোনদের উপর পাশবিক অত্যাচার হচ্ছে। তাহলে এ অত্যাচারের সুযোগটা এরা কেন সৃষ্টি করে দিচ্ছে? আর এ থেকে তারা কী অর্জন করেছে? হয়ত যারা এদের অস্ত্র সরবরাহ করছে, তারা লাভবান হচ্ছে। কারণ অস্ত্র বিক্রি করতে পারছে। এদের অর্থ যারা জোগান দিচ্ছে, হয়ত তারা লাভবান হচ্ছে। কিন্তু তাদের এ সমস্ত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে আজকে মিয়ানমারের লোকগুলি কষ্ট পাচ্ছে। আজকে তারা গৃহহারা, ঘরবাড়ি হারা, মানবেতর জীবন-যাপন করছে।

কাজেই আমি এটা বলব যে, এ সমস্ত কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে হবে। মিয়ানমার সরকারকে আমরা এটাও বলছি যে, আমরা এদের আমরা কোনোমতেই প্রশ্রয় দেব না। আমাদের যে সিদ্ধান্ত, এটা আমরা সব সময় রক্ষা করি। কিন্তু মিয়ানমারকেও সেরকম ব্যবহার করতে হবে যে, কয়েকটা লোক, যারা অপরাধী তাদের খুঁজে বের করুন। কিন্তু কিছু ঠকবাজদের কথা বলে এরা সাধারণ মানুষকে হত্যা করবে; ছোট ছোট শিশুরা কি অপরাধ করেছে? নারীরা কি অপরাধ করেছে? তাদের উপরে অত্যাচার হবে, এটা আমরা কখনও মানতে পারি না। এটা কিছুতেই মানা যায় না। কাজেই তাদের এটা বুঝতে হবে। তাদেরই নাগরিক, যারা আজকে বাংলাদেশের মাটিতে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের সকলকে তাদের ফেরত নিতে হবে। সেখানে তাদের প্রত্যাবসনের ব্যবস্থা করতে হবে। যারা আজকে দেশ ছেড়ে চলে এসেছে, তাদের নিরাপত্তা দিতে হবে। তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে ‘সেফ জোন’ করে তাদের সেখানে রেখে সমস্ত নিরাপদ ব্যবস্থা তৈরি করে দিতে হবে। আর রাখাইন রাজ্য থেকে যাদের বিতাড়িত করেছে, তাদেরও তাদের ফেরত নিতে হবে।

 আর কফি আনান যে সুপারিশটা করেছেন তা বাস্তবায়ন করতে হবে। এই কফি আনান কমিশন মিয়ানমার সরকারই গঠন করেছে। তারা কফি আনানকে আসতেও দিয়েছে, সেখানে কাজ করার সুযোগ দিয়েছে। তাহলে তার সুপারিশটা তারা গ্রহণ করবে না কেন? আর যদি সেখানে তাদের কোনো আপত্তি থাকে, তারা আলোচনা করতে পারে। আলোচনা করে তারা যেভাবে হোক এ সমস্যাটা সমাধান করুক। আমাদের এখানে যারা আশ্রয় নিয়ে আছে দীর্ঘদিন থেকে এবং এখন যারা এসেছে, তাদের প্রত্যেক নাগরিককে তাদের ফিরিয়ে নিতে হবে। কারণ এ সমস্যা মিয়ানমার সৃষ্টি করেছে। এ সমস্যার সমাধানও মিয়ানমারকেই করতে হবে। এটা হলো বাস্তবতা। এখানে যদি কোন রকম সহযোগিতা লাগে, হ্যাঁ প্রতিবেশী দেশ হিসেবে আমরা সে সাহায্য করব। আমি এটুকু বলতে চাই যে, অনেকে আজকে যারা আমাদের এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছে, তাদের সাহায্যে এগিয়ে এসেছে: তাদের আমি ধন্যবাদ দিচ্ছি। আমি এটুকু বলব যে, এরা আজকে কষ্ট করে আমাদের দেশে আশ্রয় নিয়েছে। এদের এ দুর্ভোগ্যের সুযোগ নিয়ে কেউ যেন একদিকে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চেষ্টা না করেন।  আর কেউ এখান থেকে নিজেদের ভাগ্য গড়ার জন্য চেষ্টা যেন না করে। আর্থিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা যেন না করে।

ষোল কোটি মানুষকে আমরা খাবার দেই, তার সাথে আরও এরকম দু-চার/পাঁচ লাখ লোককে খাবার দেওয়ার মতো সে শক্তি বাংলাদেশের আছে। এটুকু আমি অন্তত বলতে পারি। আমাদের সাধ্যমত আমরা সে চেষ্টা করে যাব।

 আপনারা জানেন যে, আমি ১৬ তারিখে জাতিসংঘে যাচ্ছি। সেখানে সাধারণ অধিবেশনে বক্তব্য দেব। নিশ্চয়ই আমি আমার বক্তব্যে মিয়ানমারের বিষয়টা তুলে ধরব। আমাদের যারা ওখানে স্থানীয় সংসদ সদস্যরা আছেন, যে সমস্ত প্রতিনিধিরা আছেন, তাদের সকলেই এদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাছাড়া, প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, আমাদের বর্ডার গার্ড থেকে শুরু করে সকলে এখন সক্রিয় আছেন। সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। সেই সাথে সাথে আমাদের দলের থেকেও ত্রাণের ব্যবস্থা আমরা করেছি। তারাও কাজ করে যাচ্ছে। মানবতার খাতিরে আমরা এদের পাশে দাঁড়িয়েছি। এদের সহযোগিতা করে যাচ্ছি। কিন্তু এটা সাময়িক ব্যবস্থা। অবশ্যই মিয়ানমারকে তাদের নাগরিকত্বের অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। তাদের নিজের ভূমিতে ফেরত নিতে হবে মিয়ানমারকেই, সে কথা বলেই আজকে যে প্রস্তাবটি এসেছে, মাননীয় স্পীকার, সেটা হলো মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ধর্মীয়, জাতিগত, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর অব্যাহত নির্যাতন, নিপীড়ন বন্ধ, তাদের নিজ বাসভূমি থেকে বিতাড়িত করে বাংলাদেশে ‘পুশ-ইন’ করা থেকে বিরত থাকা এবং রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিয়ে নাগরিকত্বের অধিকার দিয়ে নিরাপদে বসবাসের ব্যবস্থা গ্রহণে মিয়ানমার সরকারের উপর জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলে জোরালো কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানানো হউক। সংসদে এই যে প্রস্তাবটি আমাদের ড. দীপু মনি নিয়ে এসেছেন, আমরা এ প্রস্তাবটিকে সর্বান্তকরণে সমর্থন জানাচ্ছি। (সংক্ষেপিত)

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং
ফজর৪:২৯
যোহর১১:৫৫
আসর৪:২০
মাগরিব৬:০৭
এশা৭:২০
সূর্যোদয় - ৫:৪৪সূর্যাস্ত - ০৬:০২
পড়ুন