সম্পদ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে হবে
ড. মো. নাছিম আখতার২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং
সম্পদ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে হবে
মানুষের জীবন-ধারণের জন্য মাটি, পানি, বায়ু ও খাদ্যের কোনো বিকল্প নেই। জীবন-ধারণের অন্য সব সুবিধা কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে নিঃশেষ হয়ে গেলেও উপরোল্লিখিত উপাদানগুলো বিরাজমান থাকলেই মানুষ আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সামর্থ্য অর্জন করতে পারে। তাই অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারে আমাদেরকে সাশ্রয়ী হতে হবে। আমরা সব কিছুতেই উন্নত দেশের অনুকরণ করতে চাই। কিন্তু যে বিষয়গুলো অনুকরণ করলে আরো উন্নত হওয়া যায় সেগুলো না করে উন্নত বিশ্বের ধসে পড়া পারিবারিক জীবনের নানান অনুষঙ্গ অনুকরণ করে নিজেদের সমাজ ও সংস্কৃতিকে আরো নিম্ন দিকে ধাবিত করছি। আমাদের উচিত সেই বিষয়গুলো অনুকরণ করা যা আমাদের উন্নত জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সাহায্য করবে। অস্ট্রেলিয়াতে পানির সাশ্রয়ী ব্যবহারে গাড়ি ধোয়ার জন্য নির্দিষ্ট দিন আছে। অর্থাত্ যেকোনো দিন ইচ্ছে করলেই গাড়ি ধোয়া যাবে না। আবার গাছ কাটতে হলে সরকারের অনুমতি নেওয়ার পরেই কেবল গাছ কাটা সম্ভব। সেদিক দিয়ে আমরা আছি অপচয়ের মহোত্সবে। সব জায়গাতেই হয়ত আছে কিছু নিয়ম কিন্তু প্রতি মুহূর্তেই সেই নিয়ম ভঙ্গ করা হচ্ছে। নিয়ম ভঙ্গ করে আমরা ভুগছি আত্মতুষ্টিতে, কিন্তু সমগ্র জাতি যে ধীরে ধীরে নিমজ্জিত হচ্ছে ঘন অমানিশায় তা আমরা ভাবতেই চাই না। আমরা গর্বের সঙ্গে প্রায়ই বলি অনিয়মই আমাদের জন্যে নিয়ম। কিন্তু এর সুদূরপ্রসারী ক্ষতির পরিমাণ কি ভেবে দেখেছি? আমাদের এই প্রিয় জন্মভূমিকে অক্ষত, সমৃদ্ধ এবং বসবাস উপযোগী রাখতে হলে আমরা আমাদের জীবন-ধারণে সম্পদ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হব। জীবন-ধারণের অনুষঙ্গগুলো ব্যবহার করব প্রয়োজনমতো। নিশ্চয়ই এমনভাবে ব্যবহার করব না যা অপচয়ে পর্যবসিত হয়। বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবনের জন্য দুইটি সত্য ঘটনার অবতারণা করছি। এই ঘটনা দুইটি থেকে প্রতীয়মান হবে যে, উন্নত জাতি গঠনের জন্য কত বেশি সচেতন হওয়া জরুরি।

প্রথম ঘটনাটি ছিল এইরূপ, একবার খাবার অপচয়ের দায়ে জরিমানা দিতে হয়েছিল ভারতীয় ধনকুবের রতন টাটাকে। জার্মানি গিয়ে এক রেস্তোরাঁয় খাবার নষ্টের অপরাধে তাঁকে ৫০ ইউরো জরিমানা করা হয়। এই সামান্য অর্থ তার জন্য বড় কোনো বিষয় ছিল না, তবে সেদিন রেস্তোরাঁয় গিয়ে যা শিখেছেন, তিনি তা সত্যিই অনেক গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। ঐ দিনের বর্ণনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘টুইটার’-এ দেওয়া এক পোস্টে তুলে ধরেন রতন টাটা। তিনি লেখেন—

“বিশ্বের অন্যতম শিল্পোন্নত দেশ জার্মানি। অনেকেই হয়ত ভাবতে পারেন যে, ওই দেশের নাগরিকরা খুবই বিলাসবহুল জীবনযাপন করে। সহকর্মীকে নিয়ে হামবুর্গে একটি রেস্তোরাঁয় গিয়েছিলাম আমি। যেহেতু আমরা খুব ক্ষুধার্ত ছিলাম, সেজন্য বেশ অনেকটা খাবার অর্ডার করেছিল আমার সহকর্মী। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খাবারই ছুঁয়ে দেখা হলো না আমাদের।

এরপর আমি ও আমার সহকর্মী যখন রেস্তোরাঁ থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, ওই সময় এক বয়স্ক মহিলা বিরক্ত হয়ে বললেন, “তোমাদের খাবার নষ্ট করা উচিত হয়নি।”

সহকর্মী ওই মহিলাকে উত্তর দিল, “আমরা টাকা দিয়ে খাবার কিনেছি। খাবার নষ্ট করব, নাকি খাব—এটাতে তোমার মাথা ঘামানোর কী আছে?” এই উত্তরে বেশ খেপে গেলেন ওই মহিলা। সঙ্গে থাকা আরেকজন তত্ক্ষণাত্ ফোন বের করে কাকে যেন ফোন করলেন। সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা সংস্থার পোশাক পরা এক ব্যক্তি এসে হাজির হলেন। ওই ব্যক্তি সবকিছু শুনে আমাকে এবং সহকর্মীকে ৫০ ইউরো জরিমানা করে বসলেন। ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব হয়ে যাই আমি। তারপর সেই কর্মকর্তা রাগান্বিত সুরে বললেন, “তুমি তোমার টাকায় খাবার কিনলেও, সম্পদ তো সমাজের। বিশ্বের অনেক মানুষ সম্পদের অভাবে রয়েছে। সুতরাং সম্পদ নষ্ট করার কোনো অধিকার তোমার নেই।”

দ্বিতীয় ঘটনাটি ছিল এইরূপ : অধ্যাপক হওয়ার সুবাদে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা-সংক্রান্ত কাজে যেতে হয়। ঢাকার মধ্যে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশ্ন মডারেশনে গিয়ে আলাপ হচ্ছিল কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের একজন শিক্ষিকার সঙ্গে। কথা প্রসঙ্গে জানলাম সন্তানকে নিয়ে তারা থাইল্যান্ডে বেড়াতে গিয়েছিলেন। ভ্রমণ পথে তারা কলকাতায় বেড়িয়েছেন। তিনি কলকাতার যে বিষয়টি বললেন তা তার ভাষাতেই তুলে ধরছি-

“স্যার আমরা দুপুরে হোটেলে বসে তিনজনের জন্যে এক প্লেট মাছ, এক প্লেট খাসির মাংস আর এক প্লেট মুরগি দিতে বললাম এই ভেবে যে, প্রত্যেকেই একটু একটু করে টেস্ট করে দেখব, কিন্তু ওয়েটারই বলল ‘দিদি আগে মাছ নিন এখানে তিন টুকরা পাবেন, তারপরে যদি মন চায় তো অন্যকিছু নেবেন। আমার সেই শিক্ষিকা দম্পতি আশ্চর্য হলেন এই ভেবে যে হোটেলের বিক্রি যাতে বেশি হয় সেই চেষ্টা না করে ওয়েটার তাদেরকে মিতব্যয়িতা শেখাচ্ছেন। আসলে সবকিছুতেই হিসাব করে খরচ করা তাদের প্রাত্যহিক জীবনের অভ্যাস। সেই অভ্যাসবশতই হয়ত আমাদের অর্ডারের ব্যাপারে পরামর্শ দিয়েছেন।”

সরকারের আইসিটি মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত হয়ে চাইনিজদের সঙ্গে কাজ করি। ওখানে দেখেছি, চাইনিজরা মিতব্যয়ী। তিন টাকা দামের একটি কলম দিলেও তা নিজে থেকেই চেয়ে ফেরত নেবে। চীনাদের সঙ্গে চায়নাতে যারা থেকেছে তাদের থেকে শোনা— বেতনের সবটুকু তারা কখনোই খরচ করে না, কিছু অংশ ভবিষ্যতের জন্য জমা করে। যে তিনটি জাতির কথা বললাম তারা বিশ্বের প্রভাবশালী জাতি হিসেবে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে। মিতব্যয়ী ব্যক্তি তার ব্যক্তিজীবনে কখনোই অর্থকষ্টে পড়ে না। সে সব সময়ই একটি সুশৃঙ্খল জীবন যাপনের মাধ্যমে নিজের জীবন অতিবাহিত করে। সব থেকে বড় কথা নিজের জীবন চালানোর জন্য অন্যের কাছে তার হাত পাতার দরকার হয় না। কিন্তু বেহিসাবী মানুষের জীবনে অর্থকষ্টে পড়ার সম্ভাবনা থাকে এবং হিসাবের বাইরে খরচ করার জন্যে তার অবৈধ আয়ের উেসর প্রতি মনোযোগ আসতে পারে। তাই অন্যের মিতব্যয়িতা দেখে উপহাস না করে আমাদের উচিত তাদের দৃষ্টান্তকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের দেশ, জাতি ও সমাজকে সুদৃঢ়, সুসংহত ও সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করা। বিপুল জনসংখ্যার এই দেশে যদি আমরা প্রত্যেকটি প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাশ্রয়ী না হই, তবে পানি ও গ্যাসের মতো প্রাকৃতিক সম্পদ অচিরেই ফুরিয়ে যাবে। কোনো সম্পদের সাশ্রয়ী ব্যবহারকে আমরা কৌতুকের চোখে না দেখে যদি সম্মানের চোখে দেখি তাহলে আমাদের দেশটাও সমৃদ্ধ হবে আমরা পাব দুর্নীতিমুক্ত সমাজ। কারণ চাওয়া ও পাওয়ার মধ্যে সমন্বয়হীনতাই মানুষকে দুর্নীতিগ্রস্ত করে তোলে। আর চাওয়ার ক্ষেত্রে মাত্রা থাকলেই দুর্নীতি আমাদের জীবন তথা দেশ ও জাতিকে গ্রাস করবে না। দেশ হবে সমৃদ্ধ আর জাতি হবে বিশ্বে সুপ্রতিষ্ঠিত।

n লেখক :বিভাগীয় প্রধান, কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ডুয়েট, গাজীপুর

 

এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
ফজর৪:৩১
যোহর১১:৫২
আসর৪:১৫
মাগরিব৫:৫৯
এশা৭:১২
সূর্যোদয় - ৫:৪৬সূর্যাস্ত - ০৫:৫৪
পড়ুন