আরশিনগর
আসামের পাহাড়ে বিশ্ববিদ্যার দীপ্তি
বাহার উদ্দিন১৪ নভেম্বর, ২০১৭ ইং
আসামের পাহাড়ে বিশ্ববিদ্যার দীপ্তি
ঘোর সংকট যখন ঘনিয়ে আসে, হতাশা গ্রাস করতে চায় সমাজের সমষ্টিকে; যখন থমকে দাঁড়ায় যুক্তি আর বিবেকের সম্মিলিত প্রবাহ, তখনই ইতিহাসের পরোক্ষ ইঙ্গিতে ব্যক্তিপ্রতিভা তার সাংগঠনিক মেধা আর নির্বিশেষের প্রতিস্পর্ধাকে জড়ো করে রুখে দাঁড়ায়, হয়ে ওঠে আলোর অপ্রতিহত দিশারী। রক্ষণশীলতা আর রাষ্ট্রীয় কৌশল তাকে বাধা দেয়, পেরে ওঠে না। প্রতিবন্ধকতা যত বাড়ে, ততই সে মূঢ়তাকে গুঁড়িয়ে দিয়ে অবরুদ্ধ কণ্ঠধ্বনির সচেতন বিদ্যাদাতার চেহারা ধারণ করে এবং অনগ্রসর, দরিদ্র সমাজ তাকে ঘিরে স্বপ্ন দেখতে থাকে। এই উপমহাদেশে এমন উদাহরণের অভাব নেই।

গত শতাব্দীর ৯০ দশকের শুরুতে ভারতে যখন সামাজিক উত্তেজনা বাড়তে থাকল, ধূলিসাত্ হয়ে গেল মিশ্ররীতির এক ঐতিহাসিক সৌধ—তখন আমরা অনেকে লক্ষ করিনি যে, স্বেচ্ছা অবরোধ আর হীনম্মন্যতার বিসর্জন ঘটিয়ে পিছিয়ে পড়া সমাজের উদ্বিগ্ন, ভাবুক প্রতিনিধিরা ভাবতে শুরু করলেন—সর্বস্তরে, বিশেষ করে প্রান্তিক এলাকায় শিক্ষার ব্যাপক প্রসার দরকার। ঠিক ওই দশকে, নতুন শতাব্দীর শুরুতেও পুঞ্জীভূত অভিমানকে আড়াল করে, গ্রামের নিম্নবর্গকে বুকে জড়িয়ে শিল্পোদ্যোগী মোস্তাক হোসেনের নেতৃত্বে পশ্চিমবাংলার নানা প্রান্তে একাধিক বিদ্যানিকেতন গড়ে ওঠে। হাজি মহম্মদ মহসিন, স্যার সৈয়দ, আর বেগম রোকেয়ার পর আমাদের ধারণা—ব্যক্তিবিশেষের উদ্যোগে অন্য কোনো শিক্ষা আন্দোলন প্রান্তিক ও নির্মীয়মাণ গ্রামীণ মধ্যবিত্তকে এরকম নাড়া দেয়নি। বাংলায় এ আলোড়ন যখন সৃষ্টি হচ্ছিল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল তখন অনেকটা নিষ্ক্রিয়। অন্ধকারে আলো ছড়ানোর দাবি উঠছে, বিভিন্ন মহলে। কিন্তু নেতৃত্ব দেবেন কে? কে হয়ে উঠবেন সংহত চিন্তার দায়বদ্ধ প্রবক্তা? ওই সময়ে, আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে পড়াশোনা করছিলেন দক্ষিণ আসামের মেধাবী পরিশ্রমী সন্তান মাহবুল হক। হোস্টেলের বাসিন্দা। স্যার সৈয়দের ভাবাদর্শে প্রাণিত সামাজিক দায়বদ্ধতায় নিবিষ্ট। পরমত সহিষ্ণু, দৃঢ়চেতা এবং যে পীড়িত, অবরুদ্ধ সমাজে তাঁর জন্ম, এর প্রতি, দেশের আবহমান মিশ্র সংস্কৃতির প্রতিও মমতা তাঁর অশেষ। মাতৃভাষা বাঙলা ছাড়াও ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু, আরবি, অসমিয়া—এই পাঁচ ভাষায়ও দক্ষ। পাঠ্য বিষয়ে যেমন একনিষ্ঠ, তেমনি বিজ্ঞানের নানা শাখায় স্বাভাবিক বিচরণ। ২০০০ সালে, এমসিএ-তে শীর্ষস্থানে উত্তীর্ণ। বিভিন্ন বহুজাতিক সংস্থা চাকরির আমন্ত্রণ জানাল, রাজি হলেন না। আসামে ফিরে এলেন, শুরু হলো অন্য কঠিন, কঠিনতম লড়াই। শুধু বেঁচে থাকা বা আত্মপ্রতিষ্ঠার নয়, নিহিত স্বপ্নের দরজা খোলার। ভেতরে জেদ আর অঙ্গীকার, বাইরে দিবারাত্রির পরিশ্রম। পারিপার্শ্বিকের অবজ্ঞা আর কটূক্তি তাকে ঘেরাও করতে চায়, আত্মীয়হীন উদাসীন গুয়াহাটি, কপর্দকশূন্য যুবককে কেউ বাড়ি ভাড়া দেয় না, যেখানে রাত সেখানেই কাত হবার মতো অবস্থা, ভরসা কেবল আত্মবিশ্বাস, পকেটে কুল্লে ৬৫ টাকা—এই যত্সামান্য সম্বল নিয়ে একটিমাত্র কম্পিউটার আর জনাচারেক ছাত্র নিয়ে গড়ে তুললেন সেন্ট্রাল আইটি কলেজ। একটি ঘরে সীমিত পরিসর। সরঞ্জাম বলতে টেবিলে চেয়ার, সোফা। এটাই তাঁর শিক্ষাকেন্দ্র, অফিস, এটাই তাঁর বাসস্থান। সোফায় কোনোমতে রাত কাটে, ভোর হলেই আবার লড়াই শুরু। চার শিক্ষানবিশকে প্রশিক্ষণ দিতে হয়, যন্ত্রাংশ জড়ো করে কম্পিউটারের নির্মাণ, কখনো কখনো অন্যদের বিকল তথ্যপ্রযুক্তি মেশিনের মেরামতি—এভাবে ধীরে ধীরে গড়ে উঠল মাহবুল হকের কম্পিউটার ল্যাব। সেন্ট্রাল আইটি কলেজেরও সুনাম বাড়ল, দুঃসাহসী তরুণের অঙ্গীকারে ছোট-বড়ো স্বপ্ন আর সাফল্য এসে যোগ দেয়। বছর কয়েকের মধ্যে আমরা দেখতে পাব, নবীন আইটি কলেজ মনিপাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় ভারত-সেরা হয়ে উঠছে এবং তাঁরই একক নেতৃত্বকে সম্মান জানাচ্ছে শুভবুদ্ধি, একে একে তিনি গড়ে তুলেছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির একাধিক মহাবিদ্যালয়, মেঘালয়ের সীমান্ত ছোঁয়া ও পাহাড় টিলায়, সবুজের সমারোহে ইউএসটিএম (ইউনিভারসিটি অব্ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, মেঘালয়) এবং রিজিওনাল ইন্সটিটিউট অব্ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (রিস্ট)। সবকটি প্রতিষ্ঠান একই ফাউন্ডেশনের (ইআরডিএফ) ছত্রছায়ায়। লক্ষ্য কী? কেজি থেকে পিজি পর্যন্ত, উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যেসব বিদ্যানিকেতন ইতোমধ্যে তার আওতায় নির্মিত অথবা নির্মীয়মাণ—তাদের তদারকির দায়িত্বের সার্বিক বিকেন্দ্রীকরণ। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক—এসব প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, মহাবিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় কি ব্যক্তিমালিকানাধীন? না তা নয়, এটা শিক্ষা নিয়ে, বিদ্যাদান নিয়ে একধরনের সামাজিক ব্যবসা।

ফলিত অর্থনীতি ও দায়বদ্ধতার আধুনিক সূত্রকে কেন্দ্র করে মাহবুল হকের নেতৃত্বাধীন ইআরডিএফের ছত্রতলে গড়ে উঠল স্বয়ংসম্পূর্ণ অত্যাধুনিক একটি বিশ্ববিদ্যালয় (ইউএসটিএম), একের অধিক ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, কেন্দ্র রাজ্যের অনুমোদিত একাধিক স্কুল, বিএড কলেজ, আইন কলেজ, মহিলা কলেজ, কোচিং গাইডেন্স সেন্টার এবং শিক্ষা পুনর্বাসন কেন্দ্র। যেখানে মুনাফার উচ্চাশা নেই, প্রধান উচ্চাকাঙ্ক্ষা সমাজের সব এলাকায় শিক্ষার বিকিরণ। এখানেই তিনি স্যার সৈয়দের নিখুঁত উত্তরাধিকারী। যে বঞ্চিত যে পীড়িত তার ঘরেও বিদ্যা পৌঁছে দেব, প্রতিষ্ঠানের লোকসান হলে দায় নেব, মুনাফা হলে সুফল পাবে বিদ্যার্থী আর বিদ্যাদাতারা। এই ব্রত পালনে তিনি নিঃসঙ্গ নন—সঙ্গী ও সক্রিয় সহযোগী ৭০০ দক্ষ শিক্ষক ও সংগঠক। সাধারণত বলা হয়, বাঙালির সম্মিলিত প্রয়াসের সাফল্য খুব সীমিত। কিন্তু ইআরডিএফ-এর কর্মচাঞ্চল্য আর স্বপ্নময়তা সরেজমিনে যারা দেখেছেন, মুক্তদৃষ্টি নিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন, স্বজাতিকে হেয় করার বহিরাগত রটনা যে সবসময় সত্য নয়, আশা করি তা তারা স্বীকার করবেন। বলবেন, ব্যক্তিপ্রতিভা যখন সমাজমনস্ক, তেজোদীপ্ত রূপ নিয়ে সমষ্টিকে যুক্ত করে, সত্যপ্রেমিকের মতো সাংগঠনিক স্বপ্ন দেখে, তখন তার সাফল্য তার দূরদর্শিতা মরাগাঙেও জোয়ার আনে। এখানে নির্মাণ আর নব নব সৃষ্টির অপরিমেয় শক্তি হয়ে ওঠে ঐতিহ্য, অতীতের ব্যক্তিগত অথবা সামাজিক বেদনা। মাহবুল হকের উদ্যোগেও সত্যের মাঙ্গলিক এ বিস্তার। অপ্রতিহত। মাসতিনেক আগে, তার নেতৃত্বাধীন বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বর্ধিষ্ণু গৌরব ও বহুমুখী কর্মকাণ্ডের খবর কানে আসে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, হয়ত মুনাফামুখী—এসব ভেবে আমল দিইনি। এর প্রায় মাস কয়েক পরেই ইউআরডিএফ-এর টেকনো সিটি—বারিদুয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় সমাবর্তন উত্সবে (২০১৭) আমি হাজির। সমাবর্তন উত্সবে আমার আগ্রহ নেই, চোখ বন্ধ করে ভাষণ শুনছি। মঞ্চে দেশ-বিদেশের বহু অতিথি। সমাবর্তন শেষ, উঠে পড়লাম। বাইরে হাঁটছি। অভিভূত, মুগ্ধ আমি। হোটেলে ফিরেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি বই পড়তে পড়তে রাত ১২টা, মনে হলো, যা দেখেছি যথার্থ নয়। আবার ক্যাম্পাসে যেতে হবে। পরদিন দশটা থেকে আবার খতিয়ে দেখছি, এদিনই কলকাতা ফিরব, অতএব যথাসম্ভব দ্রুত ঘুরছি, নোট করছি, সঙ্গী ইউএসটিএম-এর রেজিস্ট্রার ড. আজমল হোসেন, এই প্রথম দেখা প্রথম আলাপ। এক বিল্ডিং থেকে আরেক বিল্ডিং-এ নিয়ে যাচ্ছেন, সায়েন্স আর্টসের সব বিভাগ ঘুরে দেখছি, যেখানে যাচ্ছি সেখানেই দেখি ফ্যাকাল্টি সদস্যদের বড়ো অংশই মহিলা। তবু একটা পরিসংখ্যান খতিয়ে দেখার কৌতূহল জাগল। ভাবলাম, গত দুুদিন জুড়ে লিঙ্গ সমতার (জেন্ডার ইকুয়েলিটি) আর জাতিগত ও ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে সামাজিক সুবিচারের যে আবছা আভাস পেয়েছি—তার নিখুঁত তথ্য জানা প্রয়োজন। একজন দিলদরাজ নথিপত্রের আবরণ সরিয়ে দিয়ে বললেন, এই দেখুন। দেখেই আমি স্তম্ভিত। ৬৫০ ফ্যাকাল্টি সদস্যের ৭৫ শতাংশ মহিলা। অশিক্ষক সংগঠকদের মধ্যে তাঁদের সংখ্যাগত আধিপত্য। ৭০০০ শিক্ষার্থী, জেনারেল ছাত্রের হার ৫৩ শতাংশ, ৫৭ শতাংশ জনজাতি, সমতলের উপজাতি ও অন্যান্য অনগ্রসর পরিবারের সন্তান। আমার শিক্ষকতা আর সাংবাদিকতার ৪২ বছরে বৈষম্যহীন ব্যবস্থার যথাসাধ্য প্রতিষ্ঠা আর মহিলাদের প্রতি স্পর্ধামুখর ক্ষমতায়নের এরকম বিস্তৃত, সচেতন উদ্যোগ অন্য কোনো কো-এড শিক্ষাঙ্গনে বা ভিন্নতর প্রতিষ্ঠানে আমি অন্তত দেখিনি। মাহবুল হককে সেলাম, এখানেও স্বতন্ত্র তাঁর স্বধর্মের অর্জিত শিক্ষা আর দূরদর্শিতা। এর উত্স কী? উত্তরণের প্রেক্ষাপট আর শৈশবের অবদমিত পরিবেশ? সীমিত পরিসরে এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা কঠিন। পরেও আমরা বলব। অন্য ভাষায়। অন্য জমিনে। এখন শুধু এইটুকু বলতে ইচ্ছে করছে, মেঘালয়ের টিলায় টিলায়, পাহাড়ি খাদে বিশ্ববিদ্যার, প্রধানত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার যে বিশাল মশাল উনি জ্বালিয়েছেন, তাঁর দীপ্তি আদিগন্ত বিস্তৃত। প্রাণ চঞ্চল। দিক দিশারী।

n লেখক : ভারতীয় সাংবাদিক, সম্পাদক আরম্ভ পত্রিকা

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১৪ নভেম্বর, ২০১৭ ইং
ফজর৪:৫৩
যোহর১১:৪৩
আসর৩:৩৮
মাগরিব৫:১৭
এশা৬:৩২
সূর্যোদয় - ৬:১১সূর্যাস্ত - ০৫:১২
পড়ুন