মিয়ানমারে ভবিষ্যত্ যুদ্ধের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হলো কি?
নাদিরা মজুমদার১৪ নভেম্বর, ২০১৭ ইং
মিয়ানমারে ভবিষ্যত্ যুদ্ধের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হলো কি?

শান্তি কী, শান্তি কাকে বলে—ব্রিটিশ ও জাপানি উপনিবেশের অধীনস্থ বার্মা বা মিয়ানমার কোনোদিন জানেনি। কমসে কম ১৩৫টি নৃতাত্ত্বিক দল নিয়ে গঠিত মিয়ানমারীয় সমাজ মোজাইকের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তারা নিরন্তর বিবাদে লিপ্ত। দশকের পর দশক ধরে সামরিক একনায়কত্ব দেশের বিরাট অংশে আপাত প্রতীয়মান শৃঙ্খলা বজায় রাখে। মিয়ানমারীয়রা নিষ্ঠুর দমননীতি নামক মূল্যকে মেনে নিতে বাধ্য হয়। অবশেষে ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে সেনাবাহিনী দেশের এক সাগর পরিমাণ সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান করতে অং সান সূ চি’র সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগি করতে রাজি হয়।

বসবাসের জন্য, রোহিঙ্গারা আরাকানের উত্তরাংশে (আধুনিক রাখাইনে) আসে ষোড়শ শতাব্দীতে। ব্রিটিশ দখলদারির আমলে, কয়েকশ বছর আগে, বিশাল শ্রম-শক্তির অভিবাসন ঘটে। এরা প্রায় সবাই মুসলমান, মিয়ানমারের সংখ্যাগরিষ্ঠরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। রোহিঙ্গাদের জন্মহার স্থানীয় আরাকানি বৌদ্ধদের চেয়ে বেশি। মিয়ানমারের চৌহদ্দি ছাড়িয়ে সুদূর করাচিতে, আরাকানাবাদে রয়েছে আরো লাখ পাঁচেক রোহিঙ্গা। সত্তর ও আশির দশকে এরা আফগান সরকার ও আফগানিস্তানে সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। বাংলাদেশের জন্মের পূর্ব থেকেই মক্কা শরীফে রয়েছে তিন লাখ রোহিঙ্গা শ্রম-শক্তি, পরিবার ছাড়া। প্রকৃতপক্ষে, রোহিঙ্গারা পৃথক নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী নয়, সংখ্যালঘু।

রোহিঙ্গা-ইস্যুর স্থায়ী সমাধানের দৃঢ়সংকল্প নিয়ে সুচি কফি আনানের নেতৃত্বে ৯ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেন। অজস্র প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও সমস্যা সমাধানের সুপারিশসহ কমিটি একটি রিপোর্ট তৈরি করে। এরপরে কী ঘটে সে প্রসঙ্গে আসার আগে সংক্ষেপে সু চি’র পারিবারিক আবহের খবর নেওয়া যাক।

অং সান সু চি’কে পশ্চিম ‘গণতন্ত্রের আইকন’ হিসেবে প্রচার করে, তিনি পশ্চিমের ‘ডার্লিং’য়ে পরিণত হন। যেমন : প্রেসিডেন্ট ওবামা দক্ষিণ এশিয়ায় গেলেই সু চি’কে তার মিয়ানমারের বাড়িতে ‘হ্যালো’ না বলে দেশে ফিরে যেতেন না। তবে সু চি’ সর্বাগ্রে খাঁটি জাতীয়তাবাদী। কোয়ালিশন সরকারে সু চি’র পজিশন উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো মনে হলেও আসলে ক্ষমতার রত্ন-ভাণ্ডার জেনারেলদের হাতেই থেকে যায়।

সূ চি’র বাবা ‘থেকিন আউং সান’ ছিলেন বার্মা ইনডিপেন্ডেন্স আর্মির (বিআইএ) স্বনামধন্য নেতা ও ‘জাতির পিতা’। বার্মা ব্রিটেনের উপনিবেশ। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় বার্মাকে স্বাধীন করতে তিনি রাজকীয় জাপানি সেনাবাহিনীর পক্ষ নিয়ে ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ করেছিলেন।

বার্মাকে নিয়ে ব্রিটিশ-জাপানি সংঘর্ষের দিনগুলোতে নৃতাত্ত্বিক-বিবাদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯৪২ সালে জাপানি-বাহিনী রাখাইনে প্রবেশ করে এবং ব্রিটিশ রাজের (বর্তমানে বাংলাদেশের) সীমান্তের কাছে ‘মংডু’ শহরে চলে আসে। ব্রিটিশ-বাহিনী পশ্চাদপসরণ করে, ফলে রাখাইন তখন ‘ফ্রন্ট লাইন’ হয়। আরাকানের স্থানীয় বৌদ্ধরা ‘বিআইএ’ ও জাপানিদের সঙ্গে সহযোগিতা করে, কিন্তু রোহিঙ্গারা ব্রিটিশদের পক্ষে জাপানিদের (ও মিয়ানমারীয়দের) বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। এটি হলো ফ্যাসিস্ট-ইউফোবিয়ার ঝাপ্টায় মানুষ কেমন বোধশক্তি হারায় তার ট্র্যাজিক উদাহরণ।

বলাই বাহুল্য যে, ব্রিটিশ ও জাপানি, দুই বাহিনীই নিজেদের সামরিক স্বার্থ হাসিলের জন্য স্থানীয় জনসমষ্টির বিদ্বেষ, সংঘর্ষ ও সক্রিয় শত্রুতাকেই ইচ্ছামতো অপব্যবহার করে।

জাপানের বিরুদ্ধে ব্রিটিশরা বিজয়ী হয়, আলোচনার মাধ্যমে ‘থেকিন আউং সান’ বার্মার স্বাধীনতা অর্জন করেন, কিন্তু ১৯৪৭ সালে তিনি নিহত হন, সু চি তখন দুই বছরের শিশু। সেই ১৯৪৭ থেকে বার্মা, পরে মিয়ানমার নামে পরিচিত দেশটিকে সেনাবাহিনীর প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্যাকশনগুলো শাসন করে আসছে।

সু চি ব্রিটিশ শিক্ষায় শিক্ষিত, আশি ও নব্বইয়ের দশকে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে ঝগড়া করেছেন তিনি। তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়, ‘পশ্চিমের’ শিক্ষিত সমাজ তাকে ‘মানবাধিকারের প্রগতিশীল রক্ষক’ বলে আখ্যায়িত করে। সু চি পশ্চিমের মাথার ‘তাজ’ এখন।

সু চি ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে স্বদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। সরল, কাঁচা বলতে যা বোঝায় (ইংরেজিতে বোধহয় হবে: নাঈভ) ঠিক সেভাবে তিনি তার দেশের জনসমষ্টির সমস্যাবলীর বিস্তারিত বর্ণনাসহ কিভাবে, কী উপায়ে সেগুলোর দ্রুত সমাধান করতে চান তার ব্যাখ্যা দেন, এবং সর্বাগ্রে যে রোহিঙ্গা-ইস্যুর হিল্লা করা হবে, তাও বলেন। অর্থাত্ ক্ষণিকের জন্য কাঁচামনের সু চি স্বপ্ন দেখেন যে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধানের উদ্যোগে অ্যাংলো-স্যাক্স মিত্রদের সহানুভূতি পাবেন। দেশে ফিরে আসার পরে, সু চির আক্কেলগুড়ুম হয়, হাড়ে হাড়ে টের পান যে তার প্রাক্তন মার্কিন মিত্ররাসহ পশ্চিম আসলে তার দেশের মিত্র নয়, শত্রু। ‘ফেইথ মুভমেন্ট’ তথা ব্রিটিশদের কল্যাণে নতুন নামকৃত “আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি” (অক্টোবর, ২০১৬) মংডু’র সীমান্ত পুলিশ ঘাঁটিতে সন্ত্রাসী আক্রমণ চালায়, এবং অস্ত্রশস্ত্রের লুটপাট, কাস্টমস অফিসার ও সৈন্যদের হত্যার ঘটনা ঘটে।

কফি আনান ২৫ আগস্ট (২০১৭) যে রিপোর্টটি দেন, তাতে প্রকৃত সমাধানের পরামর্শ/সুপারিশ রয়েছে। কিন্তু সেই দিনই টার্বো-ক্ষিপ্রতার সঙ্গে “আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি” কয়েকটি কমান্ডে বিভক্ত হয়ে সেনা-ব্যারাক ও পুলিশ স্টেশনে হামলা চালায়। এ পর্যন্ত যতগুলো সশস্ত্র হামলা পরিচালিত হয়েছে, সবসময় আফগান যুদ্ধে অভিজ্ঞ আতাউল্লাহ্ আবু আমার জুনজুনির নাম শোনা যাচ্ছে। (আতাউল্লাহ্র জন্ম করাচির রোহিঙ্গা পরিবারে)। মিয়ানমার সেনাবাহিনী জিহাদিদের সন্ত্রাস দমনে এক সপ্তাহব্যাপী অভিযান চালায়। ফলস্বরূপ, তাদের পরিবাররা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে।

পরবর্তী ঘটনা প্রবাহ সম্বন্ধে আমরা মোটামুটি জ্ঞাত। যেমন : সামরিক অপারেশন স্থগিত হওয়ার পরেও উত্তর আরাকানে জ্বালাও-পোড়াও অব্যাহত থাকে, এবং রোহিঙ্গারা দুর্গম পথ ঠেলে বাংলাদেশেই আসে। অথচ আক্রান্ত স্থানীয় বৌদ্ধরা দেশের অভ্যন্তরে অন্যত্র আশ্রয় নেয়। এবং আজগুবি মনে হলেও দক্ষিণ আরাকানে বসবাসরত রোহিঙ্গারা উদ্বাস্তু হয়নি। ‘পশ্চিমের’ মিডিয়া উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাদের প্রাধান্য দেয়, হাইলাইট করে।

আটাশে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ সালে ইসলামিক অর্গানাইজেশন অব কো-অপারেশনের অনুরোধে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের মিটিং ডাকা হয়। সেই মিটিংয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং সু চি’র কয়েকজন মিত্র মিয়ানমারের কোয়ালিশন সরকারকে ‘গণহত্যা’র অভিযোগে অভিযুক্ত করে। ইউরোপীয় আইনিবিধি অনুযায়ী বিপুল সংখ্যক মানুষের হত্যাকাণ্ডকে ‘গণহত্যা’ বলে চিহ্নিত করা হয়, অপরদিকে মার্কিন আইনবিধি অনুযায়ী হত্যাকাণ্ডে ব্যবহূত পদ্ধতি বা ‘মেথড’ গুরুত্বপূর্ণ, তাই অপরাধী যদি একজনকেই মাত্র হত্যা করে তো নিরাপত্তা পরিষদের সমর্থন ছাড়াও ওয়াশিংটন যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারে। যেমন: যুগোস্লাভিয়া। ‘গণহত্যা’ নামক অভিযোগে অভিযুক্ত মিয়ানমারে ভবিষ্যত্ যুদ্ধের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হলো কি?

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্স ২০০৭ সালের ‘সাফ্রান বিপ্লব বা রিভিউলেশন’র সময় (পূর্ব-ইউরোপের দেশগুলোর “কালার রেভিউলেশন”র কথা মনে করিয়ে দেয়) একনায়কের বিরুদ্ধে অহিংস প্রতিরোধ সৃষ্টির জন্য ‘ডার্লিং’ সু চি এবং বৌদ্ধ ভিক্ষুদের প্রতি অপরিমেয় ভক্তি-শ্রদ্ধা কি প্রদর্শন করেনি? করেছে। তাহলে ২০১৭ সালে সহসা মিয়ানমারীয় সেনাবাহিনী, এমনকি সু চি, এবং দেশের তাবত্ বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী ‘খারাপ লোক/ব্যাড গাইজ’ হয়ে গেল! সু চি’র, সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রতিশ্রুতির এবং জিহাদি সন্ত্রাসীদের হামলার নিন্দা করা হোক— এর আবেদন কোথায় তলিয়ে গেল...

২০১৩ সাল থেকে পশ্চিমের মিডিয়া সু চি ও মিয়ানমারকে অপছন্দ করতে থাকে। এই সময়টায় আবার সিরিয়াতে বিভিন্ন নামে পরিচিত জিহাদিদের বিস্তার ঘটে। কাকতালীয় কি? কে জানে! কিন্তু এই যে বিগত কয়েক বছর ধরে রাখাইনে সুসংহত জিহাদি কমান্ডো আক্রমণ ঘটছে—কে বা কারা তাদের অর্থায়ন, ট্রেনিং, অস্ত্র সজ্জিত করছে?

তদুপরি আরাকান রাজ্যের ভূ-কৌশলগত গুরুত্বকে অস্বীকার করা যায় না। ভৌগোলিক সমস্থানিকতার কারণে, চীনের অভিনব সিল্ক-রোড ওরফে ‘বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই)-এর ‘ইউনান পাইপলাইন’ রাখাইনের মধ্য দিয়ে যাবে এবং বঙ্গোপসাগরের মাধ্যমে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত হবে, গভীর-সমুদ্রের বন্দর, তেল গ্যাস, নৌ-পথের পাহারাদারিতে চীনাদের ইলেকট্রনিক সার্ভেইলেন্স পোস্ট—সে এক এলাহী কর্মকাণ্ড। কিন্তু ‘বিআরআই’-য়ের বিরোধীদল তো রয়েছে, এবং সু চি বিআরআই-য়ের ‘মোহ’ ত্যাগ করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

সু চি কি হতোদ্যম হবেন? না, হবেন কেন? নিশ্চয়ই আসল খাঁটি বন্ধুর খোঁজ পাবেন, যারা মিয়ানমারকে নৈরাজ্যের ভারে অবনত হতে দেবে না।

n লেখক : প্রবাসী সাংবাদিক

[email protected]

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১৪ নভেম্বর, ২০১৭ ইং
ফজর৪:৫৩
যোহর১১:৪৩
আসর৩:৩৮
মাগরিব৫:১৭
এশা৬:৩২
সূর্যোদয় - ৬:১১সূর্যাস্ত - ০৫:১২
পড়ুন