বাংলাদেশের ব্যাংক ব্যবস্থায় ব্র্যান্ডিংয়ের গুরুত্ব
রেজাউল করিম খোকন০৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং
বাংলাদেশের ব্যাংক ব্যবস্থায় ব্র্যান্ডিংয়ের গুরুত্ব
ব্র্যান্ডিং নিয়ে সাধারণভাবে বিভিন্ন জন বিভিন্ন ধারণা পোষণ করেন। ফলে বাজারে ব্র্যান্ডিং নিয়ে এক ধরনের বিভ্রান্তি রয়ে গেছে। ব্র্যান্ড ও ব্র্যান্ডিং নিয়ে অনেক ধরনের কথাই হতে পারে। অনেকে তাদের নিজস্ব জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিষয়গুলোকে ব্যাখ্যা করেন। আসলে ব্র্যান্ড বলতে কী বুঝব আমি? এ প্রশ্নের জবাবে বলা যায়, ‘আমি যদি কোথাও উপস্থিত হই, তখন মানুষ আমার সম্পর্কে কী বলেন? আমার সম্পর্কে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন? আমার প্রতি তাদের আস্থার জায়গাটি কতটা উজ্জ্বল? এতসব প্রশ্নের জবাব যদি ইতিবাচক হয় তখনই সেখানে ব্র্যান্ডের একটি প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে। ব্র্যান্ডকে বলা হয়, আস্থার প্রতীক। যে পণ্যের ওপর সাধারণ ক্রেতাদের আস্থা নেই সেটি কখনো ভালো পণ্য হতে পারে না। এ কথা মনে রাখতে হবে একটি খারাপ পণ্য দীর্ঘমেয়াদে বাজারে টিকে থাকতে পারে না। পৃথিবীর বিখ্যাত ব্র্যান্ডগুলোর শত বছরের ইতিহাস রয়েছে। ওই ব্র্যান্ডগুলো ক্রেতাদের মনে আস্থার প্রতীক হয়ে উজ্জ্বল অবস্থানে ঠাঁই করে নিয়েছে। যে কোনো ভালো ব্র্যান্ড প্রতিশ্রুতি রক্ষার ব্যাপারে শতভাগ অঙ্গীকারাবদ্ধ। একটি ব্র্যান্ডের মূলমন্ত্র হওয়া উচিত ‘যা তুমি দিতে পারবে তার প্রতিশ্রুতি দাও, আর যা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছ তার চেয়ে বেশি দেওয়ার চেষ্টা কর’।

বর্তমান সামাজিক কাঠামোতে ব্যাংক একটি নিত্য প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ব্যাংক ছাড়া এখন কোনো সমাজ এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কথা কল্পনা করা যায় না। তেমন প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন তোলা যায়, ‘ব্যাংকের জন্য ব্র্যান্ডিং কতটা প্রয়োজনীয়? আদৌ এর কী কোনো প্রয়োজন আছে?’ এখন থেকে দুই আড়াই দশক আগের প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করলে তখনকার দিনে ব্যাংকগুলো ব্র্যাণ্ডিং নিয়ে তেমন কোনো চিন্তা-ভাবনা করেনি। তখন বিভিন্ন পণ্য উত্পাদনকারী কোম্পানি তাদের পণ্যের ব্র্যান্ডিং নিয়ে দারুণ চিন্তা-ভাবনা করেছে। কোম্পানির ব্র্যান্ডিং নিয়ে ভেবেছে। কিন্তু এখন পরিবেশ, পরিস্থিতি, সাধারণ মানুষের রুচিবোধ ও পছন্দ পাল্টে গেছে। এখন প্রতিযোগিতামূলক বাজারে একজন মানুষ ব্যাংকিং সেবা হোক, মোবাইল ফোন সেবা কিংবা চিকিত্সা সেবা হোক তা গ্রহণ করার আগে অনেক বিষয় চিন্তা-ভাবনা করে তারপর নিজের জন্য পছন্দের কোম্পানি কিংবা ব্যাংক অথবা হাসপাতালটিকে বেছে নিচ্ছে। ব্যাংকগুলো যখন নিজেদের পারফরমেন্স ড্রাইভেন প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভাবতে শুরু করেছে তখন থেকেই দৃৃশ্যপট ধীরে ধীরে পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। ব্র্যান্ডিং নিয়ে ব্যাংকের আলাদা চিন্তা ভাবনার সূত্রপাত হয়েছে।

এখন তো যে কোনো ভালো ব্যাংক, পেশাদার ব্যাংক ব্র্যান্ডিং ছাড়া সামনে এগিয়ে যাওয়ার কথা চিন্তাও করতে পারে না। রিটেইল ব্যাংকিং-এর কথা বিবেচনা করলে এ ধারণাটিকে অনেকটা সুপারশপের মত মনে হয়। সুপারশপে গেলে আমরা কী কেনাকাটা করি? সাবান, কসমেটিকস, চাল, ডাল, মাখন, দুধ, জেলি, আলু, পটল, পেঁয়াজ, মাছ, মাংস- সবই পাওয়া যায় সুপারশপে। ঠিক অনুরূপভাবে, একটি রিটেইল ব্যাংকে যাওয়ার পর সেখানে একজন গ্রাহক কী পান?

একজন গ্রাহক ব্যাংকে যাওয়ার পর তার প্রয়োজন অনুযায়ী একটি সঞ্চয়ী কিংবা চলতি অথবা ডিপিএস হিসাব খুলতে পারেন। আবার কোনো গ্রাহক কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর স্থায়ী ফিক্সড ডিপোজিট হিসাব খুলতে পারেন। আবার কেউ লকার সার্ভিস নিতে পারেন, কার লোন, হোম লোন, পারসোনাল লোন নিতে পারেন। এ ছাড়া ক্রেডিট কাডর্, ডেবিট কার্ড নিতে পারেন আর করপোরেট গ্রাহক কিংবা আমদানিকারক রফতানিকারক ব্যবসায়ী এলসি খুলতে পারেন, শিল্প ঋণ নিতে পারেন। মোটকথা, গ্রাহকের লাইফস্টাইল, আর্থিক সক্ষমতা, রুচি পছন্দ এবং চাহিদা অনুযায়ী অনেক কিছুই একটি রিটেইল ব্যাংক থেকে নেওয়া সম্ভব। ব্যাংকের প্রডাক্ট বা আর্থিক সেবাগুলো যখন গ্রাহকদের লাইফস্টাইলের সঙ্গে জড়িত তখন ওই প্রডাক্টগুলো মানুষ তার প্রয়োজনেই নেবে। দেশে বর্তমানে ৫৭টি ব্যাংক সাধারণ মানুষের জন্য নানা ধরনের আর্থিক সেবা পণ্য নিয়ে সদা প্রস্তুত। তারা তাদের সেবা পণ্যগুলো গ্রাহকদের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে নানামুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে। পত্র-পত্রিকা রেডিও টিভিতে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দিচ্ছে, রাস্তায় মনোরম বিল বোর্ড, ব্যানার, হোর্ডিং সজ্জিত করছে। কোনো ব্যাংক হয়তো রিটেইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে তাদের সেবা পণ্য বিক্রির চেষ্টা করছে। আবার কোনো ব্যাংক একই পণ্য অন্য নামে বিক্রি করছে।

বাংলাদেশের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ এখনো ব্যাংকিং সেবা বলয়ের বাইরে রয়েছে। এ কারণে এখানে ব্যাংকের সেবা পণ্যের বাজার এখনো একটি নির্দিষ্ট জায়গায় সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। একারণে প্রতিটি ব্যাংক তাদের পণ্য বিক্রির জন্য পুশ মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি অনুসরণ করছে। যে যেভাবে পারছে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে চাইছে। শিক্ষিত জনগোষ্ঠী সাধারণত বেশি ব্যাংকিং সেবা গ্রহণ করে। ফলে তাদের মনোযোগ আকর্ষণে ব্যাংকগুলো এখন তাদের নিজস্ব ব্যাংকিং প্রডাক্ট বা সেবা পণ্যগুলো নিয়ে গ্রাহকদের ঘরে ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে। তাদের সেবা পণ্য গ্রহণে তাদের সুযোগ-সুবিধাগুলো বিশদভাবে তুলে ধরছে। কিন্তু গ্রাহক তো তাদের মুখের কথায় গলে পড়ছে না। গ্রাহক কোনো প্রডাক্ট গ্রহণের আগে নানা বিষয় চিন্তা-ভাবনা করছে। তুলনামূলক বিচার করছে বিভিন্ন ব্যাংকের সেবা পণ্য নিয়ে। অনেক বিচার বিশ্লেষণ করছে। গ্রাহকের আস্থার জায়গায় পৌঁছানোর জন্য তখন ব্র্যান্ডিং ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকছে না। কারণ ব্র্যাংন্ডিংয়ের সঙ্গে আস্থা, পরিচিতি, প্রতিশ্রুতি, নির্ভরযোগ্যতা-প্রতিটি বিষয়ই জড়িত।

ব্যাংক জনগণের টাকায় ব্যবসা করে। গ্রাহকদের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করে তা আবার ঋণ প্রত্যাশীদের কাছে ঋণ হিসেবে বিতরণ করে। আমানতের সুদের হারের চেয়ে ঋণের সুদের হার বেশি থাকে স্বাভাবিকভাবে। আর এ দু’য়ের পার্থক্যই হলো ব্যাংকের মুনাফা। যদিও মুনাফার আরেকটি অংশ আসে পরিচালনা খাত থেকে। এখন যদি কোনো ব্যাংকের ওপর গ্রাহকের আস্থা না থাকে তাহলে ঐ ব্যাংকে গ্রাহক আমানত রাখবে না। ব্যাংকে আমানত না রাখলে ওই ব্যাংকের পক্ষে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করাও সম্ভব নয়। যে ব্যাংক গ্রাহকের কাছে আস্থার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতে পেরেছে ওই ব্যাংক অপেক্ষাকৃত কম সুদহারেও গ্রাহকদের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করতে পারছে। তখন ওই ব্যাংক গ্রাহককে কম সুদহারে ঋণও দিতে পারছে। ব্যাংকিং সেক্টরে ব্র্যান্ড মার্কেটিংয়ের অনেক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও শীর্ষ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের অজ্ঞতা ও উদাসীনতার কারণে ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ব্র্যান্ডিংয়ের দিকে ঠিক মতো নজর দিচ্ছে না, এখনো টোটাল ব্র্যান্ড কমিউনিকেশন না করে; প্রাচীনপন্থী করপোরেট অ্যাফেয়ার্স বিভাগ চালু রেখেছে অনেক ব্যাংক। তারা না বোঝে ব্র্যান্ড, না বোঝে প্রকৃত মার্কেটিং। ব্র্যান্ডিংয়ের নামে এসব তথাকথিত করপোরেট অ্যাফেয়ার্স বিভাগকে ভুল বা বিকৃত লোগো দিয়ে স্পন্সরশিপ করতেও দেখা যায়, যা করপোরেট আইডেনটিটির জন্য বিশাল ঝুঁকি। ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা করলে দীর্ঘ মেয়াদি ব্যবসার উন্নতি হয়। এ জন্য বিশেষভাবে মনোযোগী হতে হবে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ব্যাংক খাতে পজিটিভ ব্র্যান্ড ইমেজ তৈরি করার এখনই সময়।

 লেখক : ব্যাংকার

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৭ নভেম্বর, ২০১৭ ইং
ফজর৫:০৭
যোহর১১:৫০
আসর৩:৩৬
মাগরিব৫:১৫
এশা৬:৩২
সূর্যোদয় - ৬:২৭সূর্যাস্ত - ০৫:১০
পড়ুন