শিক্ষা : নকল প্রথার নতুন সংস্করণ
১৩ জানুয়ারী, ২০১৮ ইং
ড. মোহা. এমরান হোসেন

পরীক্ষার কক্ষে উত্তরপত্র ও প্রশ্নপত্র সরবরাহ, পরীক্ষার্থীদের পূরণকৃত তথ্য সঠিক হয়েছে কিনা তা যাচাইপূর্বক স্বাক্ষর প্রদান,পরীক্ষার্থীদের উপস্থিতির স্বাক্ষর গ্রহণ, পরীক্ষা শেষে উত্তরপত্র গ্রহণপূর্বক কেন্দ্রসচিবের নিকট বুঝিয়ে দেওয়া ইত্যাদি কতিপয় দায়িত্ব পালনে যে শিক্ষককে নিয়োজিত করা হয় তাকে ইংরেজিতে বলা হয় ইনভিজিলেটর এবং বাংলায় পরিদর্শক। আমরা যখন ছাত্র ছিলাম তখন এ পরিভাষাটি ভিন্ন নামে শুনতাম। এ দায়িত্ব পালনে রত শিক্ষককে বলা হতো গার্ড। গার্ড শব্দের অর্থ হলো প্রহরী বা পাহারাদার। কোনো বস্তু বা কোনো প্রতিষ্ঠানকে শত্রু থেকে রক্ষা করার জন্য যে ব্যক্তি দায়িত্বে নিয়োজিত থাকে তাকে প্রহরী বা পাহারাদার বলে। বিশেষ দিক বিবেচনায় তখন পরিভাষাটির প্রয়োগ যথার্থই ছিল। কারণ তখন পরীক্ষার কক্ষে দায়িত্বরত একজন শিক্ষকের জন্য উক্ত দায়িত্বগুলো ছিল গৌণ। তাদের মুখ্য দায়িত্ব ছিল নকল নামক অবৈধ কাজকে রক্ষা করা এবং শত্রু নামক ম্যাজিস্ট্রেট বা প্রশাসনিক লোককে পাহারা দেওয়া। ম্যাজিস্ট্রেট বা প্রশাসনিক লোক এসেছেন কি না, এসে থাকলে তিনি বর্তমানে কোন্ ভবনে অবস্থান করছেন, তিনি চলে গেলেন কি না ইত্যাদি খবর সংগ্রহ করতে তিনি শশব্যস্ত। সত্যিই তিনি পাহারাদার হিসেবে যথেষ্ট কৃতিত্বের পরিচয় দিতেন।

অবশ্য কিছু কিছু নীতিবান শিক্ষকও ছিলেন। তারা পরীক্ষার্থীদেরকে ঘাড় বাঁকা করতে দিতেন না। তারা সকলের নিকট খুব খারাপ শিক্ষক বলে পরিচিত হতেন এবং তারা খুব ঝুঁকির মধ্যে থাকতেন। পরে একসময় নীতিবান শিক্ষকদের বিজয় ঘটল। ব্যতিক্রমধর্মী এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলো। পরীক্ষা কক্ষে কারো কাছে নকল পাওয়া গেলে পরীক্ষার্থীসহ ঐ কক্ষের পরিদর্শককেও বহিষ্কার করাসহ পরিদর্শকের বেতন ভাতা বন্ধের প্রক্রিয়া চালু হলো। ম্যাজিস্ট্রেটদেরকে এসে নকল বন্ধ করতে হলো না। শিক্ষকরাই নকল বন্ধ করে দিলেন। তারা গার্ডের পরিবর্তে পরিদর্শকের মর্যাদা লাভ করলেন। টাচ অ্যান্ড পাশের যুগ হওয়ার পরও বর্তমানে নবরূপে নকল প্রথার পুনঃপ্রবর্তন ঘটেছে। মূলত এটি শুধুমাত্র পাশের জন্য নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে তা জিপিএ’র মান বৃদ্ধির জন্য। সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি হওয়ায় বর্তমানে বইয়ের পাতা বা হাতে  লেখা কপি নকল হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ নেই। বর্তমান নকলের কয়েকটি ধরন রয়েছে। এক. পরীক্ষার্থীদেরকে পরস্পর দেখা-দেখির সুযোগ দেওয়া হয়। দুই. অবজেক্টিভ প্রশ্নের উত্তর বলে দেওয়া হয় অনেক সময়। পরিদর্শক হিসেবে দায়িত্বরত কতিপয় নীতিহীন শিক্ষকই বলে দেন। ক্ষেত্রবিশেষে কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ বাইরের একজন বিশেষজ্ঞ এনে নিয়োগ করেন উত্তরগুলো বলে দেওয়ার জন্য। বিশেষত পরীক্ষা কক্ষে পরিদর্শক হিসেবে নিয়োজিত শিক্ষকদের যদি কোনো আত্মীয়-স্বজন থাকে, বা বন্ধু-বান্ধবের সন্তান থাকে, সেই আত্মীয় বা বন্ধুর ছেলে অন্য কক্ষে হলেও, তিনি তাকে অবজেকটিভের উত্তরগুলো বলে দেন। ১০ মিনিটের মধ্যেই ৩০/৪০ নম্বরের উত্তর বলে দেওয়া সম্ভব। কাজেই বর্তমানে ডিজিটাল পদ্ধতিতে নকল হচ্ছে।

এখন এমসিকিউ প্রশ্নের মান ৪০ এর স্থলে ৩০ করা হয়েছে। এটিকে আমরা সাধুবাদ জানাই। তবে এটিই যথেষ্ট নয়, বরং নকল প্রথার মূল উত্পাটন করতে হলে এবং শিক্ষার মান বাড়াতে হলে এমসিকিউ পদ্ধতির পুরোপুরি বিলোপ সাধন করতে হবে। অবশ্য সকল পরীক্ষার্থীই ডিজিটাল নকলের সুযোগ পায় না। সকল শিক্ষকই নীতিহীন নয়। যে কক্ষের শিক্ষক নীতিবান সে কক্ষের পরীক্ষার্থীরা এ সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। অবজেক্টিভ প্রশ্নের উত্তর বলে দেওয়ার অবৈধ পথ অবলম্বন করেন কোনো কোনো কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ তাদের নিজস্ব পরীক্ষার্থীদের জন্য। এজন্যই দেখা যায়, যেসব প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় তাদের ছেলে-মেয়েদের ফলাফল তুলনামূলকভাবে ভালো হয়। এ অবস্থা স্কুল, কলেজ ও মাদরাসা সর্বত্রই সকল পরীক্ষাতেই কমবেশি বিরাজমান। শিক্ষার সব স্তর থেকেই নকল প্রথার মূলোত্পাটন হওয়া উচিত। পাশের হার বৃদ্ধির দিকে নজর না দিয়ে গুণগত মান বৃদ্ধির দিকে নজর দেওয়া আবশ্যক।

গুণগতমানের দিকে নজর না দিয়ে পাশের হার বৃদ্ধি করতে থাকলে শিক্ষিত জনসম্পদ তৈরি না হয়ে সমাজের জন্য শিক্ষিত বোঝা তৈরি হবে। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এমডিজি) মেয়াদকাল অতিক্রম করে আমরা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) দিকে গমন করতে যাচ্ছি। শিক্ষায় গুণগত মানের দিকে নজর না দিলে টেকসই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়। কারণ একজন গুণগত মানহীন লোক শিক্ষা সনদ নিয়ে চাকরি পাবে না, সে কামলা খাটতেও পারবে না। নিজের বিদ্যা দিয়ে সৃজনশীল কিছু করতেও পারবে না। তখন সে পরিবার ও সমাজের জন্য বোঝা হিসেবে গণ্য হবে।

n লেখক : শিক্ষক ও গবেষক

এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
১৩ জানুয়ারী, ২০১৮ ইং
ফজর৫:২৩
যোহর১২:০৭
আসর৩:৫৬
মাগরিব৫:৩৫
এশা৬:৫১
সূর্যোদয় - ৬:৪২সূর্যাস্ত - ০৫:৩০
পড়ুন