জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও খাদ্য নিরাপত্তা
ড. জাহাঙ্গীর আলম১৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ ইং
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও খাদ্য নিরাপত্তা

আবহাওয়ার উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে জনজীবন যে কত বেশি প্রতিকূলতার মুখোমুখি হচ্ছে তা এখন বেশ দৃশ্যমান। মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর এর প্রভাব অত্যন্ত ক্ষতিকর ও করুণ। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অনেক উন্নয়নশীল দেশ এখন বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন। বাংলাদেশ ওই ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। এর প্রভাবে গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি, ভারী বর্ষণ, দীর্ঘস্থায়ী বন্যা, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, খরা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীর কূল ভাঙনসহ অনেক সমস্যার মুখোমুখি আমরা হচ্ছি প্রতিনিয়ত। তাতে খাদ্য নিরাপত্তা, সুপেয় পানির নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য নিরাপত্তা ও জীবিকার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মানুষ পরিণত হচ্ছে উদ্বাস্তুতে। ফলে মানুষের ক্ষুধা ও দারিদ্র্য বাড়ছে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায়। বাড়ছে রোগ-ব্যাধির প্রকোপ। তাই পৃথিবীর সকল দেশ ও মানুষ এখন জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে উদ্বিগ্ন। দেশে দেশে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হচ্ছে এ বিষয়ে মানুষকে সচেতন করার জন্য। অভিযোজন ও প্রশমন কর্মসূচি গ্রহণ করা হচ্ছে জীবন ও জীবিকার সুরক্ষার জন্য। এর জন্য এগিয়ে আসছে অনেক সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। আয়োজন করছে জলবায়ু মেলার ও শুনানির।

কিছুদিন আগে আমার সুযোগ হয়েছিল একটি জলবায়ু মেলা ও শুনানিতে অংশগ্রহণের। মেলাটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল গাইবান্ধায়। গ্রামীণ জীবনযাত্রায় স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের জন্য প্রচারাভিযান ছিল এ মেলার উদ্দেশ্য। তাতে বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি অংশ নেয় অনেক প্রান্তিক পর্যায়ের লোকজন। যারা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দুঃখ বরণ করেছে, বাধ্য হয়েছে বিপর্যস্ত জীবন যাপনে। তেমনই একজন অংশগ্রহণকারী রাধা রাণী। স্বামী কৃষ্ণ দাস। বংশানুক্রমিক জেলে। নদীর তীরে বসবাস। জীবিকা মাছ ধরা। গরু পালন ও শস্য উত্পাদন। তার জীবন ও জীবিকা আবর্তিত কৃষিকে ঘিরে। ২০ বছর আগে যখন রাধা রাণীর বিয়ে হয় তখন নদীর অবস্থান ছিল বাড়ি থেকে ৫/৬ মাইল দূরে। ক্রমেই কূল ভেঙে কাছে আসতে থাকে নদী। তারপর ২০১৭ সালের শ্রাবণের এক রাতে তার বাড়িটাও ভেঙে যায়। সব ভেসে যায় নদীর স্রোতে। অন্যান্য দিনের মতো সেদিন রাতেও স্বামী ও ছেলে-মেয়ে নিয়ে ঘুমিয়ে ছিলেন রাধা রাণী। হঠাত্ ঘুম ভেঙে গেল নদীর পানির শব্দে। কিছু বোঝার আগেই চলে গেল ঘর-বাড়ি, কল, নৌকা ও জাল। হারিয়ে গেল রাধা রাণীর পুরো সংসার। এখন পাশের গ্রামে অন্যের বাড়িতে চালাঘর তুলে থাকেন রাধা রাণী।

জলবায়ু পরিবর্তনে সৃষ্ট প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের দুঃসহ স্মৃতি বয়ে বেড়ানো আর একজন মানুষ আয়না বিবি। কয়রা উপজেলার মহাবাজপুর ইউনিয়নের দশহালিয়া গ্রামের বাসিন্দা। আইলার ঝড়ে সব হারিয়ে বেড়ি বাঁধের ওপর ঘর করে আছেন। স্বামী আনোয়ার মোড়ল সম্পন্ন গৃহস্থ ছিলেন। নিজের ভিটেবাড়িতে লাউ হতো, অন্যান্য সবজি হতো। পুকুরে মাছ ছিল। কিন্তু ২৫ মে ২০০৯ আইলার ছোবল সব ভাসিয়ে নিয়ে গেল। সেই থেকে আশ্রয় নিয়েছেন বাঁধের ওপর। তার মতো অনেকে ঘর পেয়েছেন, ফিরে গেছেন বাঁধের আশ্রয় থেকে। নতুন করে জীবন শুরু করেছেন। কিন্তু আয়না বিবি এখনো রয়ে গেছেন বাঁধেই। কেন ফিরে যাননি, তেমন প্রশ্নের উত্তরে আয়না বিবি বলেন, ‘ঘর পেতে হলে একখণ্ড জমি থাকতে হয়। আমার তাও নেই। আমাদের ভিটাবাড়ি নদী হয়ে গেছে। তাই আমাদের ঘর হয়নি। বয়স নেই। শরীরে শক্তি নেই। আমাদের জন্য কাঁদারও কেউ নেই।’ গত ২ ফেব্রুয়ারি এমনিভাবে তাঁর কষ্টের অভিব্যক্তি বর্ণনা করছিলেন কয়রা থেকে আসা আয়না বিবি। রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ওই জলবায়ু শুনানি। তাতে অংশ নিয়েছিলেন সাতক্ষীরার শ্যামনগর থেকে আসা কৃষক আতিয়ার রহমানও। তিনিও জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক বৈরিতার কারণে তার বিপন্নতার চিত্র তুলে ধরেন। তেমন বিপর্যয়ের সাক্ষ্য দিয়েছেন আরো অনেকে। আইলার ছোবলে কিংবা নদীভাঙনের কারণে জনজীবনে যে কী করুণ পরিণতি ডেকে এনেছে আমরা তা শুনেছি। অনুভব করেছি। এগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত। দিনের পর দিন প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রা বাড়ছে। বাড়ছে ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ।

জলবায়ু পরিবর্তনের ধীরগতির প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠে তাপমাত্রা ও উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের গড় তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০৫০ সালের মধ্যে ১.৪ ডিগ্রি এবং ২১০০ সালের মধ্যে ২.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যেতে পারে। এ সময় মৌসুমি বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে ৫-১০ শতাংশ। শুষ্ক মৌসুমে তা আবার কমেও যেতে পারে। ফলে বন্যা ও খরার প্রাদুর্ভাব বেড়ে যেতে পারে। অপরদিকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১৪ থেকে ৮৮ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে দেশের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ থেকে এক-চতুর্থাংশ এলাকা তলিয়ে যেতে পারে পানির নিচে। তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি মানুষ। এদের অনেকে পরিণত হবে জলবায়ু উদ্বাস্তুতে। বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থায় এদের পুনর্বাসন করা হবে অত্যন্ত দুরূহ কাজ। তা ছাড়া গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়ার কারণে সাগরের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেলে কক্সবাজার ও কুয়াকাটা সামুদ্রিক তটভূমি পানির নিচে হারিয়ে যেতে পারে। তলিয়ে যেতে পারে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবনের অধিকাংশ এলাকা। অপরদিকে দেশের বিভিন্ন এলাকা দিয়ে প্রবাহিত অনেক নদীর গতিপথের পরিবর্তন হবে। কোথাও শুকিয়ে যাবে নদী। পানি সেচ হবে বিঘ্নিত। অনাবৃষ্টি ও খরার প্রকোপে ক্ষতিগ্রস্ত হবে কৃষির উত্পাদন। তদুপরি ঘন ঘন বন্যা ও জলোচ্ছ্বাস ভাসিয়ে নিয়ে যাবে মাঠের ফসল। ফলদ বৃক্ষ। সাম্প্রতিক এক হিসাবে বিশ্বব্যাংক আশঙ্কা করছে, লবণাক্ততার কারণে বাংলাদেশে শতকরা ১৫ ভাগ ফসল কম হতে পারে। বর্তমানে দেশের ১৯টি উপকূলীয় জেলা লবণাক্ততার শিকার। এখন উপকূল থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার ভেতরে পৌঁছে গেছে লবণাক্ততা। আইপিসিসি-এর চতুর্থ মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে চলতি শতকে বাংলাদেশের ধান উত্পাদন ২০ শতাংশ এবং গমের উত্পাদন ৩০ শতাংশ হ্রাস পাবে। খাদ্যশস্যের উত্পাদন হয়ে পড়বে অলাভজনক। পশু পাখি ও মত্স্য সম্পদের উত্পাদন হ্রাস পাবে। তাতে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। বিপর্যয় নেমে আসবে মানুষের জীবনে। ইতোমধ্যেই এ ধরনের বিপর্যয় আমরা অবলোকন করছি। তাতে বাড়ছে জলবায়ু উদ্বাস্তুর সংখ্যা। বর্তমানে ঢাকায় যারা রিকশা চালায়, যারা মোট বয় তাদের অধিকাংশই এসেছে জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল থেকে। এক সমীক্ষায় দেখা যায়, এদের ৫৬ শতাংশ নদী ভাঙনের শিকার। বাকিরা ছুটে আসে উত্তরাঞ্চলের বন্যা এবং দক্ষিণাঞ্চলের ঘূর্ণিঝড়ের কারণে। বিগত ২০০৮-২০১৪ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে উদ্বাস্তু হয়েছে দেশের প্রায় ৪৭ লাখ মানুষ। আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে প্রতি ৭ জনের ১ জন পরিণত হবে জলবায়ু উদ্বাস্তুতে। তাদের পুনর্বাসন করা, কর্মসংস্থান করা ও খাদ্য জোগানো হবে অত্যন্ত দুরূহ কাজ। তাদের রাজধানীমুখী অভিযাত্রা ঠেকাতে হবে। স্থানীয়ভাবে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে এই উদ্বাস্তুদের। স্থায়ী নিবাস স্থাপন করতে হবে এদের জন্য। এর জন্য স্থানীয়ভাবে পরিকল্পনা করা এবং তা বাস্তবায়ন করা দরকার।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আমাদের উপকূলবর্তী অঞ্চলে জলমগ্নতা ও লবণাক্ততা বাড়ছে। বর্তমানে উপকূলসমূহের প্রায় সাড়ে চার লাখ হেক্টর জমি জলমগ্নতা ও লবণাক্ততার শিকার। সেখানে শস্যের নিবিড়তা মাত্র ১৩৩ শতাংশ। দেশের গড় নিবিড়তা ২০০ শতাংশ থেকে তা অনেক কম। উপকূল  অঞ্চলে একটি মাত্র ফসল ভালোভাবে হয়। তা হলো আমন ধান। বর্তমানে সেখানে ‘কমপোজিট ফার্মিং’ এর চর্চা করা হচ্ছে। অনুসরণ করা হচ্ছে সমন্বিত কৃষি কাজের। তা ছাড়া জলমগ্নতা, লবণাক্ততা ও খরা মোকাবিলায় শস্যের বিভিন্ন জাত উদ্ভাবন করা হচ্ছে। তবে গতানুগনিক ধারায় এক্ষেত্রে ইপ্সিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। এর জন্য আলাদা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা দরকার। তা ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কৃষকের আয়-উপার্জন হ্রাস পেতে পারে। তার সুরক্ষার জন্য উপকরণ ভর্তুকি ও উত্পাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য কৃষকদেরকে সহায়তা করতে হবে আর্থিকভাবে। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এ সহায়তার হার ও মাত্রা বেশি হওয়া উচিত। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় দুটো পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়ে থাকে। একটি প্রশমন এবং অন্যটি অভিযোজন। আমরা সাধারণত যেসব কর্মসূচি গ্রহণ করছি, তা অভিযোজনধর্মী। প্রশমন কর্মসূচি তেমন উল্লেখযোগ্য নয়। তবে জীবাস্ম জ্বালানি (জ্বালানি তেল, কয়লা ইত্যাদি) হ্রাস এবং সৌরশক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি কার্বন উদগীরণ প্রশমনে সহায়ক হতে পারে। কৃষিতে অতিমাত্রায় রাসায়নিক সারের প্রয়োগ ও কীটনাশকের ব্যবহার নিরুত্সাহিত করেও গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণকে সীমিত করা যায়। এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।

বাংলাদেশের শস্যখাতে অভিযোজন কর্মসূচি মোটামুটিভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু শস্যবহির্ভূত কৃষিখাতে তার দৃষ্টান্ত বড় একটা চোখে পড়ে না। বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকায় মত্স্য ও পশু-পাখি সম্পদের লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবনে বিশেষ যত্নের প্রয়োজন। এর জন্য অর্থের সংস্থান করতে হবে। তা ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় কৃষি বীমা খাতে অর্থায়ন ও পুনঃঅর্থায়নের জন্য তহবিলের ব্যবস্থা করতে হবে। আন্তর্জাতিক সহায়তা তহবিল থেকেও এসব খাতে অর্থায়ন সম্ভব। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশে জলবায়ুর অভিঘাত মোকাবিলার জন্য দুটো তহবিল গঠন করা হয়েছে। একটি জাতীয় অর্থায়নে গঠিত ‘ক্লাইমেট চেইঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড’। অপরটি উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নে গঠিত ‘ক্লাইমেট চেইঞ্জ রেজিলিয়েন্স ফান্ড’। আগামীতে কৃষি, বনায়ন, সৌরশক্তি ও খাদ্য নিরাপত্তা খাতে প্রকল্প গ্রহণের জন্য এবং ভুক্তভোগীদের কৃষি পুনর্বাসনের জন্য ওই দুটো খাত থেকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দিয়ে বিপন্ন মানুষের জীবনে আস্থা ফিরিয়ে আনা যেতে পারে।

n  লেখক:কৃষি অর্থনীতিবিদ।  উপাচার্য, ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজ (্ইউজিভি)।

E-mail:[email protected]

 

 

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ ইং
ফজর৫:১৬
যোহর১২:১৩
আসর৪:১৭
মাগরিব৫:৫৬
এশা৭:০৯
সূর্যোদয় - ৬:৩৩সূর্যাস্ত - ০৫:৫১
পড়ুন