বসন্তের রঙে ভালোবাসতে চাই পৃথিবীকে
জ্যোত্স্না তঞ্চঙ্গ্যা১৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ ইং
বসন্তের রঙে ভালোবাসতে চাই পৃথিবীকে

পহেলা ফাল্গুন অর্থাত্ ঋতুরাজ বসন্তের সূচনায় প্রকৃতি বাসন্তী সাজে অপরূপা হয়ে উঠেছে। ফাগুনে পুরাতন পৃথিবী হয়ে ওঠে শ্যামল-বরণী, যেন যৌবন-প্রবাহ ছুটে চলে দিগ্বিদিক। কখনো কখনো পুরানো স্মৃতি জাগিয়ে দেয়, আবার হাতছানি থাকে নতুন মিলনের।

আসলে বসন্ত আসে নতুন জীবনের বারতা নিয়ে। এজন্য রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘মধুর বসন্ত এসেছে মধুর মিলন ঘটাতে / মধুর মলয়-সমীরে মধুর মিলন রটাতে।’ বসন্তের সঙ্গে মিলন যেমন একীভূত তেমনি বিরহে ব্যথিত হয় কবির কবিতা। নির্মলেন্দু গুণ লিখেছেন—‘হয়তো ফোটেনি ফুল রবীন্দ্রসংগীতে যত আছে, / হয়তো গাহেনি পাখি অন্তর উদাস করা সুরে / বনের কুসুমগুলি ঘিরে। আকাশে মেলিয়া আঁঁখি / তবুও ফুটেছে জবা, দুরন্ত শিমুল গাছে গাছে, / তার তলে ভালোবেসে বসে আছে বসন্ত পথিক।’ এই যে মৃত্তিকার বুকে আনন্দ জাগানিয়া শিহরণ, দুপুরের ঘূর্ণিপাতার গুঞ্জরণ, চঞ্চল হূদয়ের সংগীত লহরি—সবই এই ঋতুরাজ নিংড়ে নেয় মানবজীবন থেকে। এই আগ্রাসী ঋতুর কবল থেকে আমরা রক্ষা পাই না কেউ-ই। এসময় গাছে গাছে কচিপাতা ও ফুলের সৌরভ, শিমুলডগায় নেচে চলা কোকিলের কুহুতান আর প্রেমিকযুগলদের একে-অপরের প্রতি মুগ্ধতা—সবই বসন্ত বন্দনায় লীন হয়ে যায়। অবশ্য বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের কাছে বসন্ত বিদ্রোহের প্রতিমূর্তি, প্রেরণাদাত্রী। তাঁর ভাষায়—‘এলো খুনমাখা তৃণ নিয়ে খুনেরা ফাগুন।’

পহেলা ফাল্গুন ‘বসন্ত উত্সব’ নামকরণের পেছনে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা আছে। তাঁর সংগীত, নাটক ও কবিতায় এই ঋতুর আত্মপ্রকাশ ঘটেছে অবারিত ভাবে। শান্তিনিকেতনে তিনি বসন্ত উত্সব শুরু করেন ফাগুনের প্রথম দিনে। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার বকুলতলায় উদযাপিত ‘বসন্ত উত্সব’ আমাদের আঙিনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান, যা নতুন রং নিয়ে উপস্থাপিত হচ্ছে। একইভাবে আমি যখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি, বসন্তের আগমনের ভেতরে দিয়ে সেই ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের ভেতরে তৈরি হয় বিস্ময়কর অনুভূতি। সেই স্মৃৃতিই এখানে বর্ণনা করছি আমি।

দেখতে দেখতে শীতের আবহ পাল্টে গেল। কী অদ্ভুত সৌন্দর্যে জেগে উঠল ক্যাম্পাসের চারপাশ। ফাগুনের মোহনায় মনমাতানো মহুয়া ফুলের গন্ধ ঢেউ খেলে আমাকে মোহিত করল। রঙিন পাখিদের আলাপন আর সুখ মেখে থাকা ঠোঁটে পাতার সৌন্দর্য আমাকে টেনে নিয়ে গেল অজানা প্রান্তরে। আমার প্রিয় জারুলতলা, কাটা পাহাড়ের নির্জন পথ আর পাহাড়ে হেলান দিয়ে থাকা বৌদ্ধবিহারের পাশে দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ কিংবা আইন অনুষদের সোনালুর ফুলঝুরি—প্রকৃতির এই ঐশ্বর্য ফাগুনের স্বতন্ত্র রূপ নিয়ে আমাকে আলোড়িত করে। কাটা পাহাড়ের গায়ে লুকিয়ে থাকা আবাবিল পাখির কলতানের কথা মনে পড়ে। এই ক্যাম্পাসে আমি ছিলাম দীর্ঘদিন। প্রকৃতি যেমন পাল্টে যায় জীবনও তেমনি বদলে যায়। আজকের পহেলা ফাগুনের আনন্দ, উত্সাহ, উদ্দীপনা ক্যাম্পাস জীবন থেকে ভিন্ন। সেই জীবনটা ছিল স্বপ্নময়, আলোড়িত, কচিপাতার মায়ায় জড়ানো। হয়ত তখন আমার চিন্তার জগত্ ততটা প্রসারিত হয়নি। সবকিছুই দেখছি সহজ চোখে, মধুর হয়ে উঠছে যা দেখছি; যা ভাবছি তাই করছি। নিজের অনুভূতি অন্যের কাছে শেয়ার করে খুশি হচ্ছি। ক্যাম্পাসের জীবন স্মৃতিময়, সুখের কলাপাতা যেন, যার কোনায় লেগে থাকে স্বচ্ছ জলের ধারা।

ফাগুনের সকাল ছিল উত্তেজনার, বিপুল উদ্যমের। ঘুম ভাঙতেই শুভেচ্ছা জানানো শুরু হতো। তারপর নিজেকে প্রস্তুত করে হলের বাইরে চলে আসা। বের হওয়ার আগেই সতীর্থদের সাজসজ্জা দেখে প্রাণের আবেগ উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠত। এক একজনের শাড়ি দেখে আমি নিজেই মোহিত হতাম। ফাগুনের রং কত সুন্দর হয়ে মেখে থাকত সকলের চোখে-মুখে। হলুদের বৈচিত্র্য সত্যিই দেখার মতো ছিল। কেউ কেউ আবার গামছা দিয়ে নিজেকে গ্রামীণ জীবনের মোড়কে তুলে ধরত। আমরা যারা আদিবাসী ছিলাম তারা নিজেদের পোশাককে ফাগুনের সঙ্গে মিলিয়ে পরতাম।

ক্যাম্পাসে সেদিন যখন দখিন দুয়ার খুলে গেছে তখন নিজেকে বাতাবী নেবুর ঘ্রাণে আর আমের মুকুলের গন্ধে ছড়িয়ে দিয়েছি। মাঝে মাঝে উন্মনা হয়েছি। বন্ধু আসবে বলেও যখন আসে না তখন নতুন প্রকৃতির পুষ্পসাজ বিষণ্ন হয়ে ওঠে। মনের আকাশে ফাগুনের আগুন জ্বলে; পিয়াসী পাখি উড়ে চলে সুদূরে। নিজের পাখনায় ভর করে ছুটে চলতে ইচ্ছে জাগে। কারণ আমি তো হূদয়ের ডাক শুনতে পাই এই ফাগুনে।

ক্যাম্পাসের বসন্ত রাতগুলো ছিল অসাধারণ। রাতের ক্যাম্পাসে কখনো কখনো চাঁদের আলোতে, কখনো বসন্ত সমীরণে সেই ত্রিভুবন জয়ী, অপার রহস্যময়ী আনন্দ-মুরতি জেগে উঠত মনে। রবীন্দ্রনাথের কথাই সত্য বলে মানি। তিনি লিখেছেন: ‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহ দহন লাগে। তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে। তবু প্রাণ নিত্যধারা, হাসে সূর্য চন্দ্র তারা, বসন্ত নিকুঞ্জে আসে বিচিত্র রাগে।’ আসলে ফাল্গুনে বিকশিত কাঞ্চন ফুল, ডালে ডালে পুঞ্জিত আম্রমুকুল, চঞ্চল মৌমাছি গুঞ্জরি গায়, বেণুবনে মর্মরে দক্ষিণবায়, স্পন্দিত নদীজল ঝিলমিল করে আর পূর্ণিমা রাত্রির মত্ততা নিয়ে আমি এখনো সেই স্মৃতির পরশে জেগে থাকি। প্রকৃতপক্ষে প্রকৃতির এক অপরূপ সৌন্দর্যের মাঝে আমরা হারিয়ে যেতে চাই, জীবনকে প্রকৃতির রঙ, রূপ ও গন্ধে মাতিয়ে নিতে চাই। বসন্তের রঙে পৃথিবীকে ভালোবাসতে চাই, সুন্দর পৃথিবী দেখতে চাই। এজন্যই সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত।’

n লেখক : সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা, সিলেট

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ ইং
ফজর৫:১৬
যোহর১২:১৩
আসর৪:১৭
মাগরিব৫:৫৬
এশা৭:০৯
সূর্যোদয় - ৬:৩৩সূর্যাস্ত - ০৫:৫১
পড়ুন