রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বহুপাক্ষিক কূটনীতি
১৩ মার্চ, ২০১৮ ইং
রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বহুপাক্ষিক কূটনীতি

মুহা. রুহুল আমীন

মিয়ানমারের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপর সেদেশের সেনাবাহিনী, শাসক, মৌলবাদী বৌদ্ধরা মিলে যে গণহত্যা, ধর্ষণ, হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ করে চলেছে তা থেকে মুক্তি পেতে নির্যাতিত রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছে। এ পর্যন্ত প্রায় ১২ লাখ নির্যাতিত রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশু বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। এ সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার যখন দ্বিপাক্ষিকভাবে চুক্তি করেছিল, তখন অনেক বিশ্লেষক মন্তব্য করেছিলেন, এ চুক্তির কারণে কোনো প্রত্যাশিত ফলাফল অর্জিত হবে না। তখন অনেকে বহুপাক্ষিক চুক্তির উপর গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। বর্তমানে এ বহুপাক্ষিক নীতির প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কে নানা দ্বন্দ্ব-সংঘাত নিরসনে দ্বিপাক্ষিক নীতির কার্যকারিতার পূর্বশর্ত হলো ঐ বিষয়ে বিবদমান পক্ষগুলো সমান শক্তির অধিকারী হবে। অর্থাত্ দুটি বিবদমান রাষ্ট্র যদি অর্থনৈতিক বা সামরিক শক্তির বিবেচনায় একে অপরের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়, তাহলে তাদের দ্বন্দ্ব নিরসনে যেকোনো চুক্তি কার্যকর হয়। কিন্তু যদি তাদের শক্তির প্রকৃতি, মাত্রা ও গুরুত্বের মধ্যে বড় পার্থক্য থাকে তাহলে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি কার্যকর হয় না, বরং তা অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী রাষ্ট্রের স্বার্থ হাসিল করে। অন্যদিকে বহুপাক্ষিক ফোরামে কোনো দ্বন্দ্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা শুরু হলে সেই ইস্যুতে বহুমুখী আলোচনা ও সংলাপের পরিবেশ তৈরি হয়। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নির্মোহ আলোচনা ও বিতর্ক চললে ন্যায্যতা ও সুবিচারের পক্ষে আলোচনা এগোতে থাকে। আলোচনার প্লাটফর্মটি মজবুত হতে থাকে এবং একসময় একটি জটিল বিষয়ও দ্রুত সমাধানের পথে এগোয়।

রোহিঙ্গা ইস্যুর সমাধানে বাংলাদেশ মিয়ানমার চুক্তির দ্বিপাক্ষিকতার সুবিধা নিজের স্বার্থে ব্যবহার করে আসছে মিয়ানমার। গতবছর (২০১৭) আগষ্টে রোহিঙ্গা নির্যাতনের সবচেয়ে করুণ অধ্যায়ের সূচনা হলে মিয়ানমার বাংলাদেশের সঙ্গে দ্রুততার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষর করে এবং বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নিতে প্রতিশ্রুতি দেয়। তখন স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছিল, মিয়ানমার চুক্তি অনুযায়ী কাজ করবে না বরং চুক্তিটিকে কালক্ষেপণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে। আশঙ্কাটি অবশেষে বাস্তবায়িত হলো।

রোহিঙ্গা নির্যাতনের করুণ দৃশ্যগুলো যখন বিশ্বমিডিয়ায় ছাপা হচ্ছিল, রোহিঙ্গা নির্যাতনের বিরুদ্ধে যখন বিশ্বময় মিয়ানমারবিরোধী জনমত তৈরি হচ্ছিল, ঠিক তখনি মিয়ানমার ইস্যুটিকে আড়াল করার জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি সই করে। এ চুক্তির বাহ্যিক অঙ্গীকার ছিল নির্যাতিত রোহিঙ্গাদেরকে যথাশিগগিরই নিরাপত্তা, মর্যাদা, নাগরিকত্ব ও কর্মসংস্থানসহ স্বদেশে ফিরিয়ে নেয়া হবে। যদিও মজলুম রোহিঙ্গারা কখনো এ চুক্তিকে সম্মান করেনি বা মিয়ানমারকে বিশ্বাস করেনি, তবুও তাদেরকে বাইরে রেখেই চুক্তি সম্পন্ন করা হয়েছে।

লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে নিজ দেশে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ মহানুভব, উদার ও বন্ধুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির দৃষ্টান্ত স্থাপনে সফল হয়েছে। উচ্চমানের বৈশ্বিক ইমেজ গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের। কিন্তু চুক্তির বাস্তবায়ন না হলে অর্থাত্ রোহিঙ্গারা স্বদেশে ফিরে না গেলে যে মানবিক বিপর্যয়, নিরাপত্তা হুমকি ও মানব ব্যবস্থাপনার বোঝা বাংলাদেশের উপর চাপবে, তা বহন করা বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব হবে কিনা সেটি ভাববার সময় এখন।

কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ভূকৌশলগত ও আর্থ নিরাপত্তাগত কারণে মিয়ানমার আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বৃহত্ শক্তির কাছে সাম্প্রতিক সময়ে অতীব গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ঐ বৃহ্যত্ শক্তিবর্গের বিনিয়োগ গন্তব্যে মিয়ানমার গুরুত্বপূর্ণ ভূমি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। চীন, রাশিয়া, ভারতসহ ঐ বিশ্ব শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো মিয়ানমারের অভ্যন্তরে গভীর সমুদ্র বন্দর ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনে তত্পর। বৃহত্ শক্তিবর্গের ভূ-কৌশলগত ও অর্থনৈতিক বিবেচনায় মিয়ানমার এখন এমন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে যে, ঐ রাষ্ট্রগুলো কোনোটিই চাইবে না মিয়ানমার নাখোশ হোক। দ্বিতীয়ত, মিয়ানমার অত্যন্ত কৌশলে প্রচার করছে যে, উগ্র ও মৌলবাদী রোহিঙ্গারা ‘আরসা’ নামক যে সংগঠন গড়ে তুলেছে তার সদস্যদের আক্রমণ থেকে তাদের সেনাবাহিনীকে রক্ষার জন্য মিয়ানমার নিরাপত্তা নীতির কারণেই রোহিঙ্গাদের উপর কঠোর হচ্ছে। তৃতীয়ত, মিয়ানমার সরকার ও সেনাবাহিনী বরাবর এটা অস্বীকার করে আসছে যে তারা রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতন করছে। ফলে চীন, রাশিয়াসহ যে রাষ্ট্রগুলো অভ্যন্তরীণভাবে বিচ্ছিন্নতাবাদী ও ধর্মীয় আন্দোলনের অভিজ্ঞতার মধ্যে বিচরণ করছে। তারা সহজে মিয়ানমারের শঠতা, প্রতারণা ও মিথ্যা বক্তব্য বিশ্বাস করছে। সর্বোপরি বিশ্বসম্প্রদায়, আন্তর্জাতিক সংস্থা, বিশ্বনেতৃবৃন্দ—এদের কেউই মিয়ানমারের অত্যাচারের বিরুদ্ধে জোর প্রতিবাদ জানাচ্ছে না বা রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

এমতাবস্থায় বাংলাদেশকে তার নিজের স্বার্থে রোহিঙ্গা কূটনীতির পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পাদিত দ্বিপাক্ষিক চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বহুপাক্ষিক কূটনীতির সৃজনশীল পথে পা বাড়াতে হবে। আগেই উল্লেখ করেছি, অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক রাজনীতি এবং বিশ্বরাজনীতির সাম্প্রতিক বাস্তবতায় কেন বাংলাদেশ-মিয়ানমার দ্বিপাক্ষিক চুক্তি কার্যকর হওয়া সম্ভব নয়। বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গতবছর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ভাষণে পাঁচ দফা শান্তি প্রস্তাব পেশ করেছিলেন। এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দফা হলো মিয়ানমারের অভ্যন্তরে রোহিঙ্গা মুসলমানদের জন্য ‘নিরাপদ বলয় বা সেইফ জোন’ তৈরি করতে হবে। তাঁর বক্তব্যের প্রায়োগিক বাস্তবতার অগ্রাধিকার হলো বহুপাক্ষিক ফোরামের মাধ্যমে বহুমুখী আলোচনার দ্বারা বহুমুখী কূটনীতির চাপে মিয়ানমারকে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির বাস্তবায়নে বাধ্য করা, ইতোপূর্বে আমি একাধিক লেখায় স্পষ্ট করেছিলাম যে, মিয়ানমারকে তোষণ করে বা তোয়াজ করে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করা যাবে না, বরং মিয়ানমারের উপর অব্যাহত চাপ সৃষ্টি করেই কেবল দেশটিকে কূটনৈতিক সমাধানে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।

ইতোপূর্বে বিশ্বসংস্থা ও বিশ্বরাষ্ট্রগুলো রোহিঙ্গা নির্যাতনকে জাতিগত নিধন বলে অভিহিত করলেও একে গণহত্যা হিসেবে প্রচার করেনি, ফলে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে আইনি চাপে রাখা যায়নি। কিন্তু জাতিসংঘসহ বিশ্বের বড় রাষ্ট্রগুলো এখন রোহিঙ্গা নির্যাতনকে গণহত্যা, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে প্রচার করা শুরু করেছে। মিয়ানমারে অসংখ্য গণকবরের সন্ধান পাওয়া গেছে এবং সেই অত্যাচারের চিহ্নগুলোও যে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ মুছে ফেলছে, এমন খবরও পত্র-পত্রিকায় আসছে। জাতিসংঘ মানবাধিকার লঙ্ঘনের অসংখ্য প্রমাণ প্রচার করছে। এমতাবস্থায় বাংলাদেশের এখন সবচেয়ে বড় নীতি-অগ্রাধিকার হলো বহুপাক্ষিক কূটনীতির আশ্রয়ে বাংলাদেশ-মিয়ানমার দ্বিপাক্ষিক চুক্তির বাস্তবায়নের চেষ্টা করা। কয়েকদিন আগে মিয়ানমার সরকারের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা রোহিঙ্গা ইস্যুটির সমাধানে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্টতার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। বাংলাদেশ তার গঠনমূলক কূটনীতির পারদর্শিতা দিয়ে মিয়ানমারের এ প্রস্তাব বিশ্বফোরামে দৃঢ়ভাবে তুলে ধরতে পারে। বিশেষ করে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর নেতৃস্থানীয় দেশ হিসেবে বাংলাদেশ তার জাতিসংঘ কূটনীতির মাধ্যমেও মিয়ানমারে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠাতে কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ইইউ, জার্মানিসহ ইতোমধ্যে অনেক রাষ্ট্র মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপের প্রসঙ্গ তুলেছে। বাংলাদেশের হাতে মোক্ষম সুযোগ হলো মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে নানাবিধ অবরোধ এবং মিয়ানমার রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বহুমুখী অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের কূটনীতি প্রণয়ন করা। বৈশ্বিক অবরোধ আরোপ করে জাতিসংঘকে ব্যবহার করে, শান্তিরক্ষী কূটনীতি অবলম্বন করে বাংলাদেশ মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পাদিত দ্বিপাক্ষিক চুক্তির বাস্তবায়নে বহুপাক্ষিক কূটনীতির সুযোগ নিতে পারে।

n লেখক :অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ইমেইল: [email protected]

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
১৩ মার্চ, ২০১৮ ইং
ফজর৪:৫৪
যোহর১২:০৯
আসর৪:২৭
মাগরিব৬:১০
এশা৭:২২
সূর্যোদয় - ৬:০৯সূর্যাস্ত - ০৬:০৫
পড়ুন