সিরিয়ায় পর্বতের মূষিক প্রসব
দশ দিগন্তে
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী১৬ এপ্রিল, ২০১৮ ইং
সিরিয়ায় পর্বতের মূষিক প্রসব
সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্র ধ্বংস করার নামে সীমিত হামলা চালানোর পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার নিজ দেশেই নতুন নামে অভিহিত হয়েছেন। কেউ কেউ বলেছেন, তিনি এখন ডোনাল্ড-কুইক জোট। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আসাদ তার সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত বিদ্রোহী বাহিনীর উপর রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করেছেন, এই অজুহাত তুলে আমেরিকা, ব্রিটেন ও ফ্রান্স মিলে আসাদকে শায়েস্তা করার জন্য যে গর্জন দ্বারা মেদিনী প্রকম্পিত করেছিলেন, তা শেষ পর্যন্ত পর্বতের মূষিক প্রসবে পরিণত হয়েছে।

সিরিয়ায় হামলা চালালে রাশিয়া তা প্রতিহত করবে—এই মর্মে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন হুমকি দেওয়ার পরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে’র গলার স্বর নরম হয়ে আসে। থেরেসা মে বলতে শুরু করেন, ‘আমরা সিরিয়ায় রেজিম চেঞ্জ করতে চাই না।’ অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার টুইটে সুর ঘুরিয়ে বলেন, ‘আমি এখনই সিরিয়ায় হামলা চালাব বা কখন চালাব তা নিয়ে কিছু বলিনি।’ এই কপট বাক্য উচ্চারণের পরই আকস্মিক হামলা। তবে সীমিত হামলা।

সিরিয়ায় রুশ ঘাঁটিতে যাতে বোমা না পড়ে, কোনো রুশ সৈন্য মারা না যায়, তার হিসাব কষে এই হামলা চালানো হয়েছে এবং আরও লক্ষ্য রাখা হয়েছে বহু মানুষ যাতে মারা না যায়। এ পর্যন্ত উল্লেখ করার মতো হতাহতের সংখ্যা পাওয়া যায়নি। হামলাকারীরা দাবি করেছেন, তারা রাসায়নিক অস্ত্র তৈরিতে সিরিয়ার সক্ষমতা অনেকটাই ধ্বংস করে দিয়েছেন। থেরেসা মে বলেছেন, ‘আসাদ আবার রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার না করলে তারা আবার হামলা চালাবেন না।’

কিন্তু কোনো কোনো পশ্চিমা পর্যবেক্ষক প্রশ্ন তুলেছেন, সিরিয়ার কাছে কেমিক্যাল উইপন আছে কি, যে তা ধ্বংস করা যাবে? তারা মধ্যপ্রাচ্যের নির্ভরযোগ্য সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, সিরিয়ার উপর পশ্চিমা হামলা চালানোর অজুহাত তৈরির জন্য এই অস্ত্র সিরিয়ায় ব্যবহার করেছে ইসরায়েলের মোসাদ। এটা পশ্চিমা জোটের পূর্বপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং থেরেসা মে দু’জনেই এখন নিজ নিজ দেশে কোণঠাসা। এই কোণঠাসা অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরানোর উদ্দেশ্যে জোরালো ইস্যু দরকার। সেই ইস্যু সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার এবং সিরিয়ার মিত্র রাশিয়াকে কোণঠাসা করার জন্য ব্রিটেনের সেলিসবারি শহরে একজন সাবেক রুশ ডাবল এজেন্ট তার কন্যাসহ রাসায়নিক বিষ দ্বারা আক্রান্ত হওয়ায় রাশিয়াকে অভিযুক্ত করা।

ব্রিটেনের লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়া সেলিসবারি ঘটনার জন্য রাশিয়াকে দায়ী করতে রাজি হননি এবং সিরিয়ায় গত শনিবারের মিসাইল হামলাকে ‘বে-আইনি যুদ্ধ’ আখ্যা দিয়েছেন। পার্লামেন্টের অনুমোদন ছাড়াই থেরেসা মে এই যুদ্ধ চালিয়েছেন। ইতিপূর্বে ক্যামেরন সরকারের আমলে সিরিয়ায় বোমা হামলা চালানোর অনুমোদন চাওয়া হয়েছিল। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট অনুমোদন দেয়নি। এবারেও দেবে না এই আশঙ্কায় থেরেসা মে পার্লামেন্টকে এড়িয়ে এই যুদ্ধ চালিয়েছেন। অতীতের গালফ যুদ্ধের মতো এই যুদ্ধেও জাতিসংঘকে প্রথমেই বাইপাস করা হয়েছে।

সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার অবৈধ গালফ যুদ্ধে ব্রিটেনকে জড়ানোর জন্য জঘন্য মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘সাদ্দাম হোসেনের হাতে বিধ্বংসী মারণাস্ত্র আছে।’ পরবর্তীকালে প্রমাণিত হয়েছে, এটা ছিল ডাহা মিথ্যা। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, আমাদের হাতে রাসায়নিক অস্ত্র আছে বলে বর্তমান ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী যে অভিযোগ তুলেছেন, তাও কতটা সত্য?

সাদ্দামের মতো আসাদকেও নিষ্ঠুর দানব প্রমাণ করার জন্য পশ্চিমা মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। সাদ্দাম গর্ভবতী নারীর পেট কেটে শিশু বের করে তাকেও হত্যা করতেন বলে প্রচারণা চালানো হয়েছিল। পরে প্রমাণিত হয় মার্কিন সিআইএ তাদের দেশের ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিম ছবি তৈরি করে তা মিডিয়ায় প্রচার করেছে। এবারেও একই পদ্ধতিতে আসাদের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। ১৫ এপ্রিলের সানডে টাইমস-এর প্রথম পাতায় কোনো খবরই নেই। এমনকি সিরিয়ায় বোমা হামলার খবরও ভেতরের পাতায় চলে গেছে। একটি আহত মেয়ের ছবি ছেপে ডাবল ব্যানার হেডিং দেওয়া হয়েছে, 'The Little girl whose agony set the west on path to war' (‘এই ছোট্ট মেয়ের কষ্টই পশ্চিমা শক্তিকে যুদ্ধের পথে টেনে নিয়েছে।’)

এই ছবি দেখে যে কোনো মানুষের মনে হবে এটা সাদ্দামের বিরুদ্ধে প্রচারের পুনরাবৃত্তি। ইরাকে যারা দিনের পর দিন মিসাইল হামলা চালিয়ে হাজার হাজার শিশু ও নারী হত্যা করেছে, তারা এখন একটি শিশুর জন্য দরদের বশবর্তী হয়ে আরেকটি যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে, এ কথা কি কোনো পাগলেও বিশ্বাস করবে? আর ছবির এই মেয়েটি মার্কিন মিসাইলে নয়, আসাদের রাসায়নিক অস্ত্রে আহত হয়েছে তার নিশ্চয়তা কে দেবে? তবু প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের চাইতে প্রেসিডেন্ট আসাদের কপাল ভালো। একটি অন্যায় ও অবৈধ যুদ্ধে সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত ও হত্যা করা পশ্চিমা জোটের পক্ষে সম্ভব হয়েছে; কারণ, গর্বাচবের রাশিয়া তার পাশে দাঁড়ায়নি। তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। এবার আসাদের পাশে আছে পুতিনের শক্তিশালী রাশিয়া। তাই ১৯৫৬ সালের সুয়েজ যুদ্ধে তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের এক ধমকেই যেমন ব্রিটেন, ইসরায়েল ও ফ্রান্সকে যুদ্ধ বন্ধ করতে হয়েছিল, এবার তেমনি রাশিয়ার ধমকে শুধু মুখ রক্ষার জন্য পশ্চিমা ত্রিশক্তিকে সীমিত মিসাইল হামলার মধ্যে নিজেদের বাহাদুরি সীমাবদ্ধ রাখতে হয়েছে।

আমি ইতোপূর্বে অন্য পত্রিকায় প্রকাশিত কলামে লিখেছিলাম, সিরিয়া সংকট বা সেলিসবারির ঘটনা থেকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঘটার আশঙ্কা নেই। যেটা হতে পারে পশ্চিমা জোটের সঙ্গে রাশিয়ার সীমিত কনফ্রন্টেসন। সেটা ঘটেছে। এরপর কী ঘটে তা দেখার রইল। জাতিসংঘ-প্রধান বলেছেন, ‘স্নায়ুযুদ্ধ তার পূর্ণশক্তিতে আবার ফিরে এসেছে।’ এখন প্রশ্ন, এই স্নায়ুযুদ্ধ কি আঞ্চলিক (বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের) গরম যুদ্ধ প্রশমিত করবে, না তার আরো বিস্তার ঘটাবে?

আশঙ্কার কথা এই যে, গরম যুদ্ধের মতো স্নায়ুযুদ্ধও বিশ্বশান্তি এবং তার স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করতে পারে। আর এই যুদ্ধের স্পটগুলো বিশ্বময় ছড়িয়ে আছে। এশিয়ায় চীন ও ভারত, ভারত ও পাকিস্তানের বর্তমান সমস্যা, সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যেও বিরোধ এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি আরব ও তার জোটের মিত্র দেশগুলোর বন্ধুত্ব মধ্যপ্রাচ্য-সমস্যার নতুন ডায়মেনসন তৈরি করতে পারে।

আগে আঞ্চলিক শান্তির কিছুটা নিরাপত্তা ও ঐক্য কিছু আঞ্চলিক সংস্থা রক্ষা করত। যেমন কমনওয়েলথ ও সার্ক ইত্যাদি। বর্তমানে এগুলো ঠুঁটো জগন্নাথ। জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনটিরও একই অবস্থা। ভবিষ্যতে আমেরিকা ও রাশিয়ার মধ্যে ঠান্ডাযুদ্ধ ও আঞ্চলিক প্রক্সিযুদ্ধ যদি তুঙ্গে ওঠে, তাহলে এশিয়া ও আফ্রিকার স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে জোট নিরপেক্ষ সম্মেলন বা ন্যাম পুনরুজ্জীবনের উপর অবশ্যই গুরুত্বারোপ করতে হতে পারে।

আমেরিকার ডোনাল্ড কুইক জোট বেশিদিন ক্ষমতায় থাকতে পারবেন কিনা সন্দেহ। এফবিআই ও তার সাবেক প্রধানের সঙ্গে তার বিরোধ ক্রমশই তার জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। ব্রিটেনে থেরেসা মে-ও আগের টোরি নেতা মার্গারেট থ্যাচার হতে চান। কিন্তু থ্যাচারের ব্যক্তিত্ব, প্রজ্ঞা ও জনপ্রিয়তা কোনোটাই তার নেই। নেই তার পেছনে ঐক্যবদ্ধ দল। এই অবস্থা থেকে বাঁচার জন্য যুদ্ধংদেহী মনোভাব কোনো কাজ দেবে না।

পৃথিবী দ্রুত বদলাচ্ছে। আরো বদলাবে। আমেরিকার আগের একক পরাশক্তির অবস্থান এখন আর নেই। চীন, রাশিয়া, ব্রাজিল, ইরান এবং কিছুটা ভারত মিলে যে শক্তিজোট তৈরি হতে যাচ্ছে, তাতে বিশ্বের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক শক্তি কেন্দ্র দ্রুত এশিয়ায় স্থানান্তর হবে। আমেরিকার সামরিক শক্তিও নিঃশেষিত হবে মধ্যপ্রাচ্যের অব্যাহত যুদ্ধে। ইউরোপের কোনো কোনো রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকের ধারণা, মধ্যপ্রাচ্যের মাকড়সার জাল থেকে সময় থাকতে সরে না এলে মধ্যপ্রাচ্যেই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কবর রচিত হবে।

[লন্ডন, ১৫ এপ্রিল, রবিবার , ২০১৮]

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১৬ এপ্রিল, ২০১৮ ইং
ফজর৪:১৯
যোহর১১:৫৯
আসর৪:৩১
মাগরিব৬:২৩
এশা৭:৩৯
সূর্যোদয় - ৫:৩৭সূর্যাস্ত - ০৬:১৮
পড়ুন