আমরা একটা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি
রেজাউল করিম খোকন১৬ এপ্রিল, ২০১৮ ইং
আমরা একটা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি

আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনার প্রেক্ষিতে মনের মধ্যে একটি প্রশ্ন কেবলই ঘুরপাক খাচ্ছে, আর তা হলো, আমরা কোথায় চলেছি? প্রতিদিন পত্রিকার পাতায় চোখ রাখলে সহিংসতা, নির্মমতা, পাশবিকতা, অমানবিকতার শিকার নারী-পুরুষ ও শিশুর খবর চোখে পড়ছে। পারিবারিক কলহ, ইভটিজিং, বিয়ের প্রস্তাবে রাজি না হওয়া, আর্থিক লেনদেন, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব বা এলাকার আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের হাতে মানুষ খুন হচ্ছেন। পরিবার হলো মানুষের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। কিন্তু এখন পরিবারের মধ্যেও নিরাপত্তা খুঁজে পাওয়া দায় হয়ে পড়েছে। ব্যক্তিগত স্বার্থের দ্বন্দ্বে আপনজনের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। রাজধানীসহ সারা দেশে বাবা-মায়ের হাতে সন্তান হত্যার ঘটনা যেমন ঘটছে, তেমনি সন্তানের হাতে জন্মদাতা বাবা-মায়ের প্রাণহানিও ঘটছে। পরকীয়ার কারণে স্বামীর হাতে স্ত্রী এবং স্ত্রীর হাতে স্বামীর খুন হওয়ার ঘটনাও কম নয়। সামপ্রতিক খুনের ঘটনাগুলোর ধরন অন্য সময়ের সঙ্গে মিলছে না। মানুষ দিনে দিনে খুব অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে। তুচ্ছ কারণে খুনের মতো ঘটনা ঘটছে। নিষ্ঠুরতার মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। মানুষ যেন ক্রমেই আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে। সুকুমার বৃত্তিগুলো কমে যাচ্ছে। মানুষ ক্রমেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। এর সঙ্গে প্রযুক্তি ও বিত্ত-বৈভব মানুষের আবেগ ও মূল্যবোধে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। এ অবস্থা থেকে রক্ষা পেতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।

এটা সত্যি, আমরা একটা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। মানুষের জীবনধারা বদলে যাচ্ছে। অপরাধের ধরনের মধ্যেও বিচিত্রতা আসছে। এখন খুব তুচ্ছ ঘটনাতেও মানুষ খুন হচ্ছে। খুনের ক্ষেত্রে এমন অপরাধী পাওয়া যাচ্ছে, জীবনে যাদের এটাই প্রথম কোনো অপরাধ। এ ধরনের অপরাধ পুলিশের দ্বারা প্রতিরোধযোগ্য নয়। তবে বিচার প্রক্রিয়া আরেকটু ত্বরান্বিত হলে শাস্তির দৃষ্টান্ত স্থাপিত হতো, অপরাধও কমে যেত। সভ্যতার ক্রমবিকাশ ও বিবর্তনে মানুষ সংবেদনশীলতা হারাচ্ছে। যার ফলে আমাদের এখন অনেক নিষ্ঠুর ও বিচিত্র ধরনের অপরাধ দেখতে হচ্ছে।

নারীকে অনেকে সম্পত্তির মতো মনে করতে চান। প্রেম বা বিয়ের পথে সেই সম্পত্তি দখল করতে ব্যর্থ হলে তারা সহিংস হয়ে ওঠে। এ প্রবণতা অনেক পুরুষেরই আছে। জীবনের চলার পথে নারীর ভালো লাগবে পুরুষকে, পুরুষের পছন্দ হবে কোনো নারীকে। তার মানেই প্রেমে রাজি হতে হবে, বিয়েতে রাজি হতে হবে তা তো নয়। তাই বলে আক্রমণ করে বসতে হবে ওই নারীটিকে? তাকে উত্ত্যক্ত করতে হবে? এসিড মারতে হবে? আগুনে পুড়িয়ে দিতে হবে? গায়ের ওপর মোটর সাইকেল তুলে দিতে হবে? এই বর্বরতা, এই পাশবিকতা আর কতোদিন দেখতে হবে আমাদের? সমাজের সর্বত্রই অসহিষ্ণুতা বাসা বেঁধেছে। কারো ভিন্ন মত সহ্য হচ্ছে না। সমাজটা অসুস্থ হয়ে পড়ায় তার খেসারত দিতে হচ্ছে প্রাণের বিনিময়ে। এক অসম্ভব মনোবৈকল্যের শিকার এখন দেশের বিরাট সংখ্যক মানুষ। খুনি মানেই সে কোনো না কোনোভাবে মানসিক ভারসাম্যহীন।

দেশের সুশীল সমাজ, মানবাধিকার সংস্থা, বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এমনকি গণমাধ্যমও হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার। কিন্তু এটা খুব উদ্বেগজনক যে, হত্যাকাণ্ড বন্ধ হচ্ছে না। এমনও ঘটনা ঘটছে যা আদিম বর্বরতাকেও হার মানায়। বিষয়টি কোনো ব্যক্তি বা পারিবারিক সমস্যা নয় বলেই আমরা মনে করি। দিন দিন দেশ, সমাজ, দেশের মানুষ এগিয়ে যাবে— এটা স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা যেন মানসিকভাবে দিনের পর দিন পিছিয়েই যাচ্ছি। কোনোভাবেই আমাদের সমাজ যেন আলোর দিকে অগ্রসর হতে পারছে না। কূপম্লুকতা যেমন আমাদের সমাজকে দিন দিন গ্রাস করছে,  নারীর ক্ষেত্রে যেন সমাজ দিন দিন আরো নিষ্ঠুর হয়ে উঠছে। নিষ্ঠুরতার বলি হচ্ছে নারী। কোনোভাবেই তা রোধ করা যাচ্ছে না।

মনে রাখতে হবে, জনগণের স্বাভাবিক জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারেরই দায়িত্ব। আমরা প্রত্যাশা করি, সরকার নারী নির্যাতনের মতো ঘৃণ্য প্রবণতাকে দমন করতে যথাযথ পদক্ষেপ নেবে এবং একই সঙ্গে এর সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি প্রদানে কোনোরকম পিছপা হবে না। আমরা চাই নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো ঘটনা এই স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র থেকে নির্মূল হোক এবং নিশ্চিত হোক নারীর অধিকার ও নিরাপত্তা।  বর্তমানে বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের হার ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার মূল কারণই হলো দারিদ্র্য, যৌতুক, বহুবিবাহ এবং অশিক্ষা। এছাড়া এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, ঢাকায় অবৈধ বস্তি গড়ে উঠেছে যেখানে উঠতি বয়সী মেয়েদের মা-বাবারা যখন কর্মস্থলে চলে যান, তখন তাদের কিশোরী মেয়েরা অনেকটাই অরক্ষিত থাকে। আর নিম্নআয়ের বাবা-মা সন্তানদের ফেলে রেখেই যেতে বাধ্য হন জীবিকার প্রয়োজনে।

নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো ঘটনার জন্য যেসব কারণ চিহ্নিত করা হচ্ছে তা নির্মূল করতে আন্তরিক ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। ক্ষয়িষ্ণু এই সামাজিক অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। সামাজিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তার বিষয়টি দিনে দিনে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। তাহলে সমাজ কি প্রতিদিন পেছনের দিকে যাচ্ছে? এ থেকে রক্ষা পেতে হলে এখনই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। আইনের শাসন নিশ্চিত করতে না পারলে সমাজকে নিরাপদ করা যাবে না। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে তাই সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। অপরাধী চক্রকে চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। আমরা মনে করি, সত্যিকার শিক্ষা, জনসচেতনতা ও সর্বোপরি মনুষ্যত্ববোধ জাগ্রত করতে না পারলে অস্বাভাবিক মৃত্যু, হিংস্র মনোভাব কোনোভাবেই রোধ করা সম্ভব হবে না।

n লেখক : সমাজকর্মী ও ব্যাংকার

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১৬ এপ্রিল, ২০১৮ ইং
ফজর৪:১৯
যোহর১১:৫৯
আসর৪:৩১
মাগরিব৬:২৩
এশা৭:৩৯
সূর্যোদয় - ৫:৩৭সূর্যাস্ত - ০৬:১৮
পড়ুন