লিমিট ছাড়া কিপ্টেমি
ইকবাল খন্দকার৩০ অক্টোবর, ২০১৬ ইং
লিমিট ছাড়া কিপ্টেমি
না, ভদ্রলোকের নাম বলা যাবে না। তবে তার কাণ্ডকারখানার সুদীর্ঘ বয়ান দেওয়া যেতে পারে। আমি যে ফ্ল্যাটে থাকি, ভদ্রলোকও সেই ফ্ল্যাটেই থাকেন। কিন্তু দাপটের দিক থেকে তিনি আমার চেয়ে কয়েক কিলো এগিয়ে। কেন এগিয়ে? কারণ আমি থাকি ভাড়া বাসায়, ভদ্রলোক থাকেন নিজের বাসায়। ঢাকা শহরে নিজের বাসা থাকা যে আলাদা পদমর্যাদার ব্যাপার, সেটা ভদ্রলোক ভালো করেই জানেন এবং নিজের পদমর্যাদা প্রকাশের ব্যাপারে চেষ্টারও ত্রুটি করেন না। কারো সঙ্গে কথা শুরু করার এক মিনিটের মধ্যেই তিনি কোনো না কোনো উপায়ে প্রকাশ করেই ছাড়বেন, তার নিজের বাসা আছে। তবে ব্যাপার সেটা না, ব্যাপার হচ্ছে তার কিপ্টেমি। লম্বা ফিতা দিয়ে মাপলে আকাশেরও হয়তো একটা সীমা পাওয়া যাবে, কিন্তু তার কিপ্টেমির কোনো সীমা নেই। একদম লিমিটবিহীন কিপ্টেমির সঙ্গে সুনিবিড়ভাবে জড়িত তিনি। তার সঙ্গে পরিচয়ের এক সপ্তাহের মাথায় তার ব্যাপারে একটা দুঃসংবাদ পেলাম। তিনি নাকি বাথরুমের কমোড থেকে পড়ে বিরাট ব্যথা পেয়েছেন। কোমরের হাড় নড়ে গেছে বা ভেঙে গেছে, এমন অবস্থা। আমি তার খোঁজ নেওয়ার জন্য তার ফ্ল্যাটে গেলাম। গিয়ে দেখি তিনি লম্বা হয়ে শুয়ে আছেন বিছানায়। তবে মুখ দেখে বোঝা গেল কথা বলতে কোনো সমস্যা নেই। কথা চালালাম। এক পর্যায়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কমোড থেকে মানুষ পড়ে যায়, জীবনেও শুনিনি। আপনি পড়লেন কীভাবে?’ ভদ্রলোক বললেন, ‘বসতে গিয়েছিলাম। কিন্তু কমোডে না বসে বসে গেলাম একটু ডানপাশে। ব্যস, ধপাস করে পড়ে গেলাম নিচে। কোমর মড়াত্ করে উঠল। আমার মনে হয় শুধু কোমরের গাড়ই ভাঙেনি, রগও ছিঁড়েছে দুয়েকটা। আচ্ছা, কোমরের রগ ছিঁড়ে গেলে জোড়া লাগানোর কোনো কায়দা আছে কি?’ আমি তার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বললাম, ‘আমার ধারণা আপনি ঘুম ঘুম চোখে কমোডে বসতে গিয়েছিলেন। তাই বুঝতে পারেননি কোনটা কমোড আর কোনটা ফাঁকা জায়গা। আসলে ঘুম ঘুম চোখে আমাদের কোনো কাজই করা উচিত না। দেখেন না ঘুম ঘুম চোখে গাড়ি চালাতে গিয়ে ড্রাইভাররা কী বড় বড় দুর্ঘটনা ঘটিয়ে বসে!’ ভদ্রলোক আমার কথায় বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘বেহুদা কথা বলবেন না তো! কমোডে বসা আর ড্রাইভিং সিটে বসা কি এক কথা? আর ঘুম ঘুম চোখে কমোডে বসতে গিয়েছিলাম, এই আজগুবি কথা আপনাকে কে বলল?’ আমি বললাম, ‘তাহলে ঠিকমতো কমোডে বসতে পারলেন না কেন? কমোডে বসা তো এমন কঠিন কোনো কাজ না যে বসার আগে প্রশিক্ষণ দিয়ে শিখে নিতে হবে।’ ভদ্রলোক থমথমে গলায় বললেন, ‘বাথরুমে অন্ধকার ছিল। কোনটা কমোড, কোনটা কী, কিছুই দেখতে পাইনি।’ আমি বললাম, ‘বাথরুমে অন্ধকার কেন থাকবে? গত কয়েক দিনের মধ্যে তো রাতের বেলা কোনো লোডশেডিং হয়নি!’ ভদ্রলোক বললেন, ‘অন্ধকার ছিল অন্য কারণে। আমি ইচ্ছে করেই লাইট জ্বালাইনি।’ আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘তার মানে আপনি জেনেশুনেই অন্ধকার বাথরুমে ঢুকেছিলেন? কিন্তু কেন?’ ভদ্রলোক বললেন, ‘কেন আবার? আমার বিদ্যুত্ বিল কি আপনি দেবেন? টয়লেট সারার মতো টুকটাক কাজ করার সময় লাইট জ্বালালে কত বিল আসবে চিন্তা করতে পারেন?’ আমি বিল কত আসবে সেই চিন্তা করতে না পারলেও ভদ্রলোকের লিমিটবিহীন কিপ্টেমির কথা চিন্তা করতে করতে নিজের ঘরে চলে এলাম।

পরদিন তার সঙ্গে নিচে দেখা। আমাকে দেখেই বললেন, ‘দশ মিনিট ধরে লিফটের জন্য দাঁড়িয়ে আছি। লিফট কেন আসছে না বলতে পারেন?’ আমি বললাম, ‘আপনি থাকেন দোতলায়, এই দোতলায় ওঠার জন্য এতোক্ষণ লিফটের জন্য দাঁড়িয়ে থাকার কোনো মানে হয়?’ ভদ্রলোক বললেন, ‘অবশ্যই মানে হয়। কারণ, লিফট সবার টাকায় চলে। লিফটে উঠলে সবারটা খরচ হবে। আমার একার কিছু না। কিন্তু আমি যদি সিঁড়ি বেয়ে উঠি, লসটা কিন্তু আমার একার হবে। কারণ, পায়ের জুতাগুলো আমার একার টাকায় কেনা। এখানে কারো শেয়ার নেই। সিঁড়ি বেয়ে যদি জুতাগুলো ক্ষয় করি...’ আমি ভদ্রলোকের কথা পুরোটা না শুনেই নিজের কাজে চলে গেলাম।

একদিন পর তার সঙ্গে বাজারে দেখা। আমাকে দেখেই বলতে লাগলেন, ‘মাছ কিনতে এসেছিলাম। কিন্তু মাছবাজারে একদমই ভিড় নেই। তাই এখানে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছি। যখন ভিড় লাগবে, তখন যাব।’ আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘এইসব কী বলছেন আপনি! ভিড় লাগলে যাবেন মানে! মানুষ মাছবাজারের ভিড় এড়িয়ে চলার চেষ্ট করে, আর আপনি ভিড় লাগার জন্য অপেক্ষা করছেন?’ ভদ্রলোক বললেন, ‘এটা একটা টেকনিক। জীবনে বহু টেকনিক মেনটেইন করতে হয়।’ আমি বললাম, ‘আপনি আপনার টেকনিকটা একটু খোলাসা করেন।’ ভদ্রলোক খোলাসা করলেন, ‘এখন মাছবাজারে গেলে দেখে শুনে ভালো মাছটা কিনতে হবে। যেহেতু ভিড় নেই। কিন্তু ভিড় থাকলে হবে কী, কোনো রকমে ভিড়ের আশপাশ থেকে কাচকি মাছ বা এই জাতীয় কম দামি কোনো মাছ কিনে নিয়ে চলে যাব। বাসায় গিয়ে বউকে বলব, ভালো মাছ কীভাবে আনব বলো, ভিড়ের জন্য তো বাজারেই ঢুকতে পারিনি। আমি হার্টের রোগী, আমি কি পাবলিকের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কিতে লিপ্ত হতে পারি?’

 

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৩০ অক্টোবর, ২০১৮ ইং
ফজর৪:৪৭
যোহর১১:৪৩
আসর৩:৪৪
মাগরিব৫:২৪
এশা৬:৩৮
সূর্যোদয় - ৬:০৪সূর্যাস্ত - ০৫:১৯
পড়ুন