হাড়কিপ্টে হ্যারেস আলি
সাঈদ সাহেদুল ইসলাম৩০ অক্টোবর, ২০১৬ ইং
হাড়কিপ্টে হ্যারেস আলি
হাড়কিপ্টে ‘হ্যারেস আলি’। তার ‘হারেছ’ নামটা অফিসের সবাই ভুলে গেছে, তার কাছে সবার ‘হ্যারসমেন্ট’-এর কারণে। প্রায়ই বাড়িতে সকালের নাস্তা তৈরি হয় না তার। বাড়িতে কয়েক টাকার মুড়ি কিনে নিয়ে এসে জলিলের চায়ের দোকানের সামনে ঘোরাঘুরি করে। কারো ওপর ভর করে পার হয়ে যায় সকালের নাস্তা। কলিগদের সঙ্গে চা খেতে গিয়ে চাকরির আঠার বছরের জীবনেও একটি টাকা দিয়েও বিল পরিশোধ করেনি সে।

অফিস সহকারী সেদিন হাজিরা খাতায় তার নাম তুলতে গিয়ে ‘হারেছ’-এর জায়গায় ‘হ্যারেস’ লিখেছেন। বসের কাছে নালিশ পর্যন্ত চলে যায়। বস একটু খোদাভক্ত মানুষ। যদিও তার হাসি আসে, সেটা চেপে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আশরাফ সাহেব, নামটা ঠিক করে লিখে দেন। মানুষের নাম নিয়ে ইয়ার্কি করা কবীরা গোনাহ্।’

২.

হারেছের বাড়ির সামনে বিশাল একটা টঙ রয়েছে। তার পাশের বাড়ির কুদ্দুস হাজি সাহেব ওটাতে বসে থাকেন প্রায় সময়ে। কখনো কখনো হাজি সাহেবের সঙ্গে বসে গল্প করে সময় কাটায় হারেছ আলি। বিশেষ করে ছুটির দিনে এক মুহূর্তের জন্য জায়গাটা ছাড়ে না সে। কেউ হাজি সাহেবের কাছে এলে প্রথমে তার সঙ্গে ভাব লাগিয়ে কথা বাড়ায়। তারপর হাজি সাহেব তার অতিথিকে বাড়িতে ডাকলে হারেছ আলি পিছু পিছু হাঁটে আর বলে, ‘আমাদের নবীজিও প্রায় অতিথিদের নিয়ে একসঙ্গে খানা খেতেন। এটা খুব সওয়াবের কাজ।’

টঙে বসা হারেছ আলিকে কোনো আগন্তুক কারো ‘বাড়ি কোথায়’ জিজ্ঞেস করলে তো কথাই নেই। বাড়ি দেখিয়ে না দিয়ে বরং তার সঙ্গে পৌঁছে যাবে তার বাড়িতে। দুপুরের খানাটা কতবার এভাবে খেয়েছে সে!

৩.

সেদিন অফিস থেকে ফেরার পথে ফুটপাতে বসে চুল-দাড়িটা বেশ সাইজ করে নেয় হারেছ আলি। ব্লেডটা একটু ভোঁতা থাকায় সে নাপিতকে বলে, ‘আজ কিন্তু আরো দু’টাকা কম পাবি, একটা ব্লেড দিয়ে আর কত কামাই করবি। বিনে পয়সায় ব্যবসা ধরেছিস তো মানুষের কষ্ট বুঝবি কী করে?’

নাপিত রেগে যায় সেদিন। হারেছ আলির কথা বেশ প্রেস্টিজে লাগে তার। নাপিত রেগে বলে, ‘বিনে পয়সায় তো আপনিও টাকা কামাতে পারেন, বসে যান আমার সঙ্গে।’ অনেক তর্কে সেদিন নাপিতকে পয়সা না দিয়েই ক্ষৌরকার্য সম্পন্ন করে হারেছ আলি।

৩.

সেদিন সাইকেলটা হাতে নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে হারেছ আলি। তার বাল্যবন্ধু বাশারউল্লাহ নামকরা আইনজীবী। তারে চেম্বারে প্রায় চা খাওয়ার কাজটা সেরে নেয় হারেছ আলি। আরেক বন্ধু মতির দেখা। মতি বলে, ‘কীরে, সাইকেল তো ভালোই আছে দেখছি। তা হেঁটে কেন?’

মুখ থেকে কারো কাছ থেকে চেয়ে নেওয়া খইনিটুকু ফেলে হারেছ জবাব দেয়, ‘বেশি সাইকেলে উঠলে টায়ার ক্ষয় বেশি হয়, তাই হেঁটেই যাচ্ছি। তাছাড়া হাঁটলে তো ডায়াবেটিস হবে না। চল বাশারের চেম্বারে চা-টা খেয়ে আসি।’ মতি বেশ জানে, একটা চায়ের কারণে বাশারের চেম্বারে প্রয়োজনে দু-এক ঘণ্টা পার করার মানুষ সে।

৪.

সেদিন পাশের পাড়ার বেশ ধনাঢ্য জাহিদ সাহেবের মেয়ের বিয়ে। বরযাত্রী এসে পড়েছে দেখে লুঙ্গি পরে প্যান্টটা হাতে নিয়ে হাঁটতে থাকে হারেছ আলি। রাত প্রায় এগারোটা। বিদঘুটে অন্ধকার। বিয়ের বাড়ির কাছাকাছি এসে একটা দোকানের পাশে ল্যাম্প পোস্টের আধো আলোয় প্যান্টটা পরে দাওয়াতে অংশ নেবে। পলিথিন থেকে প্যান্টটা বের করতেই দুজন এসে সামনে হাজির। হারেছ আলি কাঁপতে কাঁপতে শক্ত করে প্যান্টটা চেপে ধরে, ‘বাবারা, আমার কাছে কিছু নেই। আমি বিয়ে বাড়িতে যাচ্ছি।’

ছেলে দুটোর অত সময় নেই তার কথা শোনার। প্যান্টে মানিব্যাগ আছে ভেবে একজন সেটা কেড়ে নিয়ে দৌড়াতে থাকে। হারেছ আলির চিত্কারে লোকজন এগিয়ে এসে চোর খুঁজতেই প্যান্টটা পাওয়া যায় একটু দূরে। হারেছ আলি সেটা নিয়ে পকেট খুঁজতে থাকে। পকেটে কিছু না পেয়ে কাঁদতে থাকে হারেছ আলি।

একজন বলে, ‘মানিব্যাগে কত টাকা ছিল?’ হারেছ জবাব দেয় ‘ভাই, মানিব্যাগ ছিল না, একটা দু’টাকার কয়েন ছিল...।’ একজন মোবাইলের লাইট জ্বালালে কয়েনটা পাওয়া যায়। হারেছ খুশিতে গদগদ হয়ে হয়ে বলে, ‘ভাই পেয়েছি। চলেন আর কোনো অসুবিধা নেই...!’

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৩০ অক্টোবর, ২০১৮ ইং
ফজর৪:৪৭
যোহর১১:৪৩
আসর৩:৪৪
মাগরিব৫:২৪
এশা৬:৩৮
সূর্যোদয় - ৬:০৪সূর্যাস্ত - ০৫:১৯
পড়ুন