ঝালকাণ্ড
বিশ্বজিত্ দাস১৩ আগষ্ট, ২০১৭ ইং
ঝালকাণ্ড
বাজার থেকে ফিরে কাঁচা মরিচের ঝালটা কাঁচা থাকতেই ঝেড়ে দিল সেলিম, ‘বাসায় এত কাঁচা মরিচ লাগে কেন? তরকারিতে একটু কম মরিচ দিলে কী হয়!’

রাবু অবশ্য হজম করার পাত্রী না।

সঙ্গে সঙ্গেই ঝেড়ে দিল সে, ‘আহা! ভাত খেতে বসলে আলাদা করে গরুর মতো কাঁচামরিচ কে চিবিয়ে চিবিয়ে খায়? সেটা কি আমি?’

চুপসে গেল সেলিম।

সেদিন দুপুরে অফিসের ক্যান্টিনে বসেও এভাবেই কথা শুনতে হয়েছিল ওকে। বেয়ারাকে ও কাঁচা মরিচ দিতে বলেছিল।

ছেলেটি সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিয়েছিল, ‘স্যার, কাঁচা মরিচের যা দাম! আপনি বরং অন্য কিছু ফ্রি চান।’

‘কী হলো? চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলে যে?’ স্ত্রীর ডাকে বর্তমানে ফিরে এলো সেলিম।

দীর্ঘশ্বাস চাপল।

মিনমিন করে বলল, ‘কাঁচা মরিচের দাম হঠাত্ বেড়ে গেছে।’

‘কোন জিনিসের দাম বাড়েনি শুনি,’ ঝঙ্কার দিয়ে বলল রাবু।

‘না মানে, কাঁচা মরিচ তো কখনো এত দাম দিয়ে কিনি না।’

‘কিনেছ। তোমার মনে নেই। বর্ষাকালে গোড়ায় পানি জমায় এমনিতেই মরিচের গাছ মরে যায়।’

গাছের কথায় সেলিমের মনে পড়ে যায়, ছাদে দু-তিনটা মরিচের গাছ টবে লাগানো ছিল।

‘আচ্ছা, আমাদের ছাদে তো মরিচের গাছ আছে। মরিচ ধরেনি?’ সেলিম জানতে চাইল।

‘আমি কী জানি! কতদিন ধরে ছাদে যাই না। তোমার ছয়তলা বিল্ডিংয়ের ছাদে যাওয়ার ইচ্ছা বা সাধ্য কোনোটাই আমার নেই।’

সেলিম নিজেও বহুদিন ছাদে যায় না। বাধ্য হয়ে রুম্পাকে ডাকল সে, ‘মামণি, তুমি তো ছাদে যাও। গাছগুলো কেমন আছে?’

‘আছে বাবা। অনেক টবে জঙ্গল হয়ে গেছে। ওগুলো পরিষ্কার করতে হবে। কয়েকটা গাছ মরে গেছে।’ তার গলায় বেজায় দুঃখ।

সেলিম তার ছোট্ট মেয়েটির কষ্ট বুঝতে পারল।

‘গাছ কি একেবারেই মরে গেছে?’

‘না। কোনো কোনোটা আধমরা হয়ে আছে।’

‘আচ্ছা, আমি তোমাকে নতুন গাছ এনে দেব।’

‘বাবা, আধমরা গাছগুলোকে কি কোনোভাবেই বাঁচানো যায় না?’

‘হুমম।’ চিন্তিত হলো সেলিম।

‘আমরা যদি আধমরা হই তাহলে ওষুধ খেয়ে ভালো হই। তাহলে গাছকে কেন বাঁচানো যাবে না।’

‘যাবে না কেন, অবশ্যই যাবে।’

‘কীভাবে?’

‘মনে কর, তোমার একটা আমগাছ মরো মরো হয়েছে। তুমি ওই গাছে একটা আমগাছ বেঁধে দিয়ে গাছটিকে সুস্থ হওয়ার অনুপ্রেরণা দিতে পার।’

সেলিম নিজেই খুব অনুপ্রাণিত হলো। আরে এ তো মারাত্মক আবিষ্কার। রুগ্ন গাছকে বাঁচানোর চমত্কার উপায়।

সেলিম ফেসবুক খুলল। একটু পরেই টের পেল—চশমা ছাড়া কিছুই পড়তে পারছে না।

অগত্যা রুম্পামণিকে চশমা এনে দিতে বলল ও।

‘অনুপ্রেরণা দিয়ে গাছ বাঁচানো’ লিখে সার্চ দিল।

নাহ্! কিচ্ছু নেই।

মনে মনে উল্লসিত হলো ও। ইতিহাসের ছাত্র হয়ে উদ্ভিদবিজ্ঞানের বড় আবিষ্কার করে ফেলেছে। ঠিক করল, আজ সন্ধ্যায় এ নিয়ে বড়সর একটা স্ট্যাটাস লিখবে ও এফবিতে।

দুই.

সন্ধ্যার পরই লঙ্কাকাণ্ড শুরু হলো।

মোবাইল নিয়ে মাত্র টিভির সামনে বসেছে সেলিম, অমনি ছুটে এলো রাবু, ‘বিশ্বাস কর—আমি এই বুয়াকে আর এক মুহূর্তও রাখব না।’

‘কেন! কী হয়েছে?’

‘কী হয়নি তাই বল! একটু আগে নিচতলার ভাবি কয়েকটা মরিচের জন্য ওদের বুয়াকে পাঠিয়েছেন। সকালে তোমার আনা মরিচগুলো আমি একটা বাটিতে করে রেখেছিলাম বোঁটা ছাড়িয়ে ফ্রিজে রাখব বলে। এখন দেখি একটা মরিচও নেই।’

সোজা হয়ে বসল সেলিম। ‘বল কী!’

‘এ নিশ্চয়ই বুয়ার কাচ। বাজারে কাঁচা মরিচের দাম বেশি। না হয় একটা-দুটো মরিচ সরাবি। তাই বলে সব একেবারে সাবাড় করে দিবি।’

‘বুয়া হয়তো অন্য জায়গায় মরিচগুলো রেখেছে। ফোনে জিজ্ঞেস করে দেখ।’

‘ফোন করেছিলাম। ওর পিচ্চি মেয়েটা ধরেছিল। বলল, মা তো এখন পাশের বাড়ির টিভিতে ‘মিস লংকা’  ছবি দেখতে গেছে।’

‘বুয়ার বোধহয় আবার মিস হওয়ার ইচ্ছে হয়েছে।’ ধীরে ধীরে বলল সেলিম। বাসার এই বুয়াটির জীবন বেশ চমকপ্রদ।

তিন তিনটি স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর এখন চতুর্থ স্বামীর সঙ্গে ঘর করছে বুয়া।

‘কাল আসুক। ওর মিস লংকা হওয়ার শখ মিটিয়ে দিয়ে লঙ্কাকাণ্ড দেখিয়ে দেব ওকে।’

সেলিম মনে মনে ভাবল, বাজারে জিনিসপত্রের যে দাম তাতে বুয়ারা দামি দামি গহনা বা টাকা-পয়সা চুরি করছে না—এটাই স্বস্তির বিষয়।

 

তিন.

স্বস্তির শীতল পরশ বয়ে গেল সেলিমের শরীর বেয়ে। চোখ পিটপিট করল ও। যা দেখছে সত্যি তো? চশমা সঙ্গে আনেনি। তাই ঝুঁকে আবার ভালো করে দেখল সেলিম। আজ ভোরে কী মনে করে ছাদে এসেছে ও।

কাঁচা মরিচের গাছের দিকে তাকাতেই চমকে উঠেছে ও। গাছভর্তি মরিচ ঝুলছে। গাছে এত মরিচ আছে জানলে বাজার থেকে কিনে আনত না।

সেলিম ঠিক করল, এখন থেকে মাঝে মাঝেই ছাদে এসে গাছগুলোর পরিচর্যা করবে। কাঁচা মরিচগুলো সব ছিঁড়ে তাড়াতাড়ি নিচে নেমে এলো।

রাবু তখনো ঘুমিয়ে আছে।

রুম্পামনি পড়তে বসেছে।

বুয়া বাসনকোসন পরিষ্কার করছে।

সেলিম ওয়াশরুমে ঢুকল।

ঠিক করল, রাবু ঘুম থেকে উঠলে ওকে কাঁচা মরিচগুলো দেবে। আশা করা যায়, সকালবেলাতেই বউ বনাম বুয়ার লঙ্কাকাণ্ড দেখতে হবে না।

ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে সেলিম দেখল, রাবু উঠেছে। রুম্পামণি কাঁদছে।

‘মামনি কাঁদছ কেন?’

‘দ্যাখো না আব্বু, তোমার কথা শুনে আমি মরিচ গাছ বাঁচানোর জন্য গাছটাতে অনেক কষ্ট করে সুতা দিয়ে মরিচ বেঁধে রেখেছিলাম। এখন ছাদে গিয়ে দেখি, কে যেন সব মরিচ ছিঁড়ে নিয়েছে।’

সেলিম কিছু একটা বলতে যাবে, তার আগেই রাবু বলে উঠল, ‘এ নিশ্চয়ই আমাদের আশপাশের কারো কাজ। মরিচের দাম বেড়েছে। আমি বুঝি না কার এত বড় সাহস যে আমার মেয়ের গাছে লাগানো মরিচ ছিঁড়তে পারে।’  ঘরের ভিতরের দিকে চেয়ে বলল রাবু।

তখনই ড্রইংরুম ঝাড়ু দিতে দিতে বেরিয়ে এলো বুয়া। একহাতে ঝাড়ু আর অন্য হাতে একটা বাটি।

‘আম্মা দ্যাখেন তো, সোফার নিচে এই মরিচের বাটি রাখছে কে?’

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১৩ আগষ্ট, ২০১৮ ইং
ফজর৪:১৩
যোহর১২:০৪
আসর৪:৩৯
মাগরিব৬:৩৭
এশা৭:৫৪
সূর্যোদয় - ৫:৩৩সূর্যাস্ত - ০৬:৩২
পড়ুন