আমাগো ঢাকা ভ্রমণ
১৩ আগষ্ট, ২০১৭ ইং
আমাগো ঢাকা ভ্রমণ
মো. মাঈন উদ্দিন

দাপ্তরিক কাজে ঢাকা যাওয়ার সমন জারি হলো। আব্দুল্লাহ ভাই আমাদের সিনিয়র অফিস সহায়ক, যার মাথার পিছন দিকে কিছু চুল থাকলেও সামনের দিকে একদম ফকফকা। কথিত আছে, তার মাথা অল্পতেই ভীষণ গরম হয়ে যায়। তাই রোদ থাকুক আর নাই থাকুক, তিনি ছাতা ছাড়া বাইরে যান না। এক কথায় অত্যন্ত সাবধানী লোক তিনি। অফিস অর্ডার তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললাম, ‘আগামীকাল আমাদের ঢাকা যেতে হবে।’ তিনি অসহায় দৃষ্টিতে আমার দিয়ে তাকালেন। হঠাত্ মাথায় হাত দিয়ে টুলে বসে পড়লেন। আমি থতমত খেয়ে গেলাম। বললাম, ‘মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন যে?’ তিনি মাথায় হাত রেখেই বললেন, ‘ঢাকার জ্যাম আর মানুষের ভিড় ঠেলে গন্তব্যে পৌঁছা আর যুদ্ধ জয় করা একই কথা। তাই ঢাকার কথা শুনলেই আমার মাথাব্যথা শুরু হয়ে যায়।’

পরের দিন গাড়ি করে একটি টিম ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিলাম। যাত্রার শুরুটা ভালোই হয়েছিল; কিন্তু উত্তরায় ঢোকার পর এসির ডিসেন্ট্রি শুরু হয়ে গেল। এই স্টার্ট নেয় এই বন্ধ হয়। বাধ্য হয়েই জানালা খুলে দিলাম। প্রাকৃতিক বাতাস খাওয়া শুরু হলো। রাস্তার পাশের দোকান থেকে ফলের মিষ্টি ঘ্রাণ আসছে। পরক্ষণেই আসছে হোটেল থেকে পোলাও-গোশতের সুঘ্রাণ। নজরুল স্যার লম্বা লম্বা শ্বাস টানলেন। উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বললেন, ‘বাহ! জানালা খোলাতে দেখছি লাভই হলো।’

চপল স্যার বললেন, ‘এসির খরচ থেকে বাঁচলেন বলে?’

নজরুল স্যার উত্তরে বললেন, ‘আরে নাহ, দেখছেন না পোলাও-গোশতের কি চমত্কার ঘ্রাণ আসছে। পোলাও-গোশত খাওয়ার চেয়ে ঘ্রাণটাই আমার কাছে বেশি ভালো লাগছে।’

বনানীর কাছে এসে গাড়ি একেবারে থমকে দাঁড়াল। সামনে বিশাল জ্যাম। আধা ঘণ্টা পরপর গাড়ি একহাত করে এগোচ্ছে। গাড়িতে সবাই ঘেমে একেবারে আলু সিদ্ধ। ঘাম পড়ছে টপটপ করে। হঠাত্ সবাই একযোগে নাক চাপা দিল। কেউ হাত দিয়ে, কেউ রুমাল দিয়ে, কেউ বা পলিথিন দিয়ে নাক চেপে ধরেছে। এরমধ্যে রাস্তার পাশের পচা আবর্জনা থেকে টকটক গন্ধ পেটে ঢুকে পেট ফুলতে শুরু করেছে। ড্রাইভার রানা ওয়াক ওয়াক করতে করতে বলল, ‘স্যার, গাড়ি থাইকা না নামলে দুর্গন্ধে আমি বমি কইরা দিমু।’

কিছু দূর যাওয়ার পর একটি গ্যাস পাম্পে গাড়ি ঢুকে গেল। উদ্দেশ্য, মুক্ত হাওয়া টেনে নেওয়া এবং গাড়িতে গ্যাস ভরা। গ্যাস পাম্পে নেমেই চপল স্যার পায়চারী শুরু করে দিলেন। তার পায়চারীর কারণটা তাত্ক্ষণিকভাবে ধরতে পারছিলাম না। কারণ জিজ্ঞাস করাতে তিনি ধমকের সুরে বললেন, ‘দেখছ না আশপাশে কত মশা? এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা মানে মশার কামড় খাওয়া। আর মশার কামড় খাওয়া মানে নিশ্চিত চিকুনগুনিয়া বাঁধানো। মিয়ারা দ্রুত পায়চারী করো।’

ভাবলাম বুদ্ধিটা মন্দ না। সুতরাং লেফট-রাইট করে পায়চারী করতে লাগলাম। গ্যাস নেওয়া শেষ হলেও আমরা গাড়িতে উঠতে পারছিলাম না; কারণ আইন কর্মকর্তা দুতলা টয়লেটে প্রাকৃতিক কাজ শেষ করে তখনো ফিরেনি। তিনি আধা ঘণ্টা পরে ফেরত এলেন। হাতে জ্বলন্ত কয়েল।

নজরুল স্যার বললেন, ‘আপনার হাতে জ্বলন্ত কয়েল কেন?’

আইন কর্মকর্তা গম্ভীর গলায় বললেন, ‘ঢাকা শহরে এই এক প্রবলেম। টয়লেটে গেলেও চিকুনগুনিয়ার ভয়। কয়েল ছাড়া টয়লেটে গেলে কাজটা রিস্কি হয়ে যায় না? তাই কয়েল জ্বালিয়েই টয়লেটে ঢুকলাম।’

গাড়িতে ওঠার সময় দেখা গেল আব্দুল্লাহ ভাইয়ের সিট ভিজে টইটম্বুর। শান্তাহার বলল, ‘আব্দুল্লাহ ভাই, আপনার সিট ভেজা কেন? আপনি আবার সিটে মাইনাস...’

আব্দুল্লাহ ভাই রেগে গেলেন। বললেন, ‘গরমে যেখানে মাথার ঘাম পায়ে পড়ছে, সেখানে মাথার ঘামে সিট ভেজাটাই স্বাভাবিক। এতে টিপ্পনী কাটার কী হলো!’

পরের দিন বিকালে ঢাকার দর্শনীয় জায়গা দেখতে আশিক ভাই, আব্দুল্লাহ ভাই ও শান্তাহারকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। রাস্তায় নেমেই আশিক ভাই জ্ঞানগর্ভ বাণী ডেলিভারি দিলেন। বললেন, ‘ঢাকার রাস্তায় শত শত লোক হাঁটছে কিন্তু কাঠফাটা রোদেও কেউ ছাতা ব্যবহার করছে না। কেন জানেন? আসলে ঢাকা শহরে রোদ থাকলেও তেমন গাছপালা নেই। দু-একটা থাকলেও গাছে তেমন পাখি নেই। সুতরাং পথিকের পোশাকে পাখির ইয়ে পড়ে পোশাক নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা নেই। এজন্য ছাতার ব্যবহারও নেই।’ ঠিক তখনই মাথার উপরে কারেন্টের তারে বসে থাকা একটা কাক নিশানা বজায় রেখে তার গায়েই কাজটা সেরে ফেলল!

কাওরান বাজারে যেতেই ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হলো। বৃষ্টি শেষ হলো; কিন্তু এরমধ্যে রাস্তায় হাঁটু পানি জমে গেল। আমরা সবাই প্যান্ট ভাঁজ করে সাবধানে হাঁটছি। আব্দুল্লাহ ভাই বরাবরই রসিক প্রকৃতির লোক। তিনি খুব মজা করে হেলেদুলে হাঁটছেন। আমি বললাম, ‘রাজধানীর রাজপথে হঠাত্ বৃষ্টিতে হাঁটু পানি! রাজধানীর আসল রহস্য এখানেই। এই যে দেখুন, রাজপথকে মনে হচ্ছে ছোটখাটো একটি খাল। গ্রাম থেকে এসে এমন পরিবেশে হাঁটার মজাই আলাদা।’ এমন সময় আব্দুল্লাহ ভাইয়ের চিত্কার শুনতে পেলাম, ‘বাঁচান, বাঁচান।’ বামপাশে তাকিয়ে দেখি আব্দুল্লাহ ভাই গলা পানিতে সাঁতরাচ্ছেন। কাতরাচ্ছেন। বুঝতে পারলাম, তিনি রাস্তার খোঁড়াখুঁড়ি জনিত গর্তে পড়ে সাঁতরাচ্ছেন। দ্রুত আমরা তাকে টেনে ওপরে তোলার চেষ্টা করলাম। আশিক ভাই হাসতে হাসতে বললেন, ‘ভাই, যেহেতু গলা পানিতে পড়েই গেছেন, অন্তত একটা ডুব দিয়ে নিন। আমরা আপনার একখান ছবি তুলে ফেসবুকে আপলোড করে দিই। যার ক্যাপশন হবে—ঢাকা ভ্রমণে এসে এ কী করলেন আমাদের আব্দুল্লাহ ভাই!’

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১৩ আগষ্ট, ২০১৮ ইং
ফজর৪:১৩
যোহর১২:০৪
আসর৪:৩৯
মাগরিব৬:৩৭
এশা৭:৫৪
সূর্যোদয় - ৫:৩৩সূর্যাস্ত - ০৬:৩২
পড়ুন