যে আগুন ছড়িয়ে গেল...
১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০১৬ ইং
যে আগুন ছড়িয়ে গেল...
আনোয়ার চৌধুরী

 

সময়টা বিশ শতকের কুড়ির দশকের শুরুতে। তত্কালীন আসাম প্রদেশের রাজধানী শিলং শহরে সুরম্য পার্লামেন্ট ভবনে শীতকালীন অধিবেশন চলছিল রোজকার মতো। প্রশ্নোত্তর পর্বে সদর সিলেট থেকে নির্বাচিত সদস্য আবদুল হামিদ চৌধুরী সোনা মিঞা একটি প্রশ্ন করে উত্তর জানতে চান। কিন্তু অধিবেশনের সভাপতি স্পীকার নীরব। তিনি কোনো উত্তর দিচ্ছেন না। সোনা মিঞা প্রশ্ন করেই যাচ্ছেন। তখন অন্য একজন সদস্য জানতে চান স্পীকার কেন সাড়া দিচ্ছেন না। মৌনতা ভেঙে স্পীকার জানালেন, সংসদ সদস্য বাংলা ভাষায় প্রশ্ন করায় তিনি উত্তর দিতে অপারগ। কারণ বাংলা আসাম প্রদেশের অফিসিয়াল ভাষা নয়। সাথে সাথেই সোনা মিঞা প্রতিবাদ জানান। তিনি বলেন, ১০৮ সদস্যের পার্লামেন্টে অধিকাংশই বাংলাভাষী। বাংলায় প্রশ্ন করার অধিকার তার রয়েছে। কিন্তু স্পীকার অনঢ়। সোনা মিঞার সাথে অন্যরাও সুর মিলান, যুক্তি দেখান। সোনা মিঞাও তার যুক্তিতে অটল। সংসদে অচলাবস্থা তৈরি হয়। সকল বাংলাভাষী বিধায়কগণ এক জোট হলে স্পীকার এক পর্যায়ে নতি শিকার করতে বাধ্য হন। আপোস রফা করেন। সিদ্ধান্ত হয় বিধায়কগণ বাংলায় প্রশ্ন করতে পারবেন। তবে স্পীকার কিংবা মন্ত্রীগণ উত্তর দেবেন ইংরেজি ভাষায়। আংশিক বিজয় অর্জিত হওয়ায় সোনা মিঞাসহ অন্যরা তা মেনে নেয়। আসামে বাংলা ভাষার অধিকার অর্জনের শুরুটা এভাবেই হয়।

তারপর অনেকদিন গত হয়। এরইমধ্যে বৃটিশরা বিদায় নেয়। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ভেঙে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। ভাঙে বাংলা ও আসামও। এমনকি বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথের সাধের ‘শ্রীভূমি’ সিলেটকেও ভেঙে দু-টুকরো করে জুড়ে দেওয়া হয় আসাম ও পূর্ববঙ্গের সাথে। ব্রিটিশ থেকে স্বাধীনতার পর পূর্ববঙ্গের বাঙালিরা পাকিস্তানিদের সাথে লড়াই করে বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে। শ্রীহট্টবাসী সোনা মিঞার স্বপ্ন সফল হয়। কিন্তু শ্রীহট্টের ঈশানকোনের প্রতিবেশী বরাক উপত্যকা বাংলাভাষী হয়েও সরকারিভাবে বাংলায় ভাব বিনিময় করতে পারে না। ছেলেমেয়েরা স্কুল কলেজে বাংলা ভাষায় অধ্যয়ন করতে পারে না। কারণ একটাই—বাংলা আসামের অফিসিয়াল ভাষা না। পরাধীন আমলে যে নীতি, স্বাধীনতার পরও একই নীতি। কিন্তু শতকরা ৯০% বাংলাভাষী অধ্যুষিত বরাক উপত্যকা তা মেনে নেবে কেন? শুরু হয় গুঞ্জন। দাবি উঠতে থাকে বাংলা ভাষাকে আসাম তথা বরাক অঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অফিস-আদালতের ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। ক্রমে ক্রমে জনমত গড়ে ওঠে। 

ষাটের দশকের শুরুতে নিখিল আসাম সাহিত্য সভা এবং আসাম জাতীয় মহাসভা নামে দু’টি সংগঠন অসমীয়া ভাষাকে আসামের একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য আসাম সরকারের নিকট দাবি জানায়। তারা এ ব্যাপারে ব্যাপক প্রচারণা চালায়। শুধু তাই নয়, তারা বাঙালি ও বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে আপত্তিজনক বক্তব্য রাখে। ১৯৬০ সালের এপ্রিল মাসে আসাম প্রদেশ কংগ্রেস কমিটি অসমীয়া ভাষাকে আসামের একমাত্র অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য সরকারের নিকট দাবি জানায়। আসামে তখন বিমলা প্রাসাদ চালিহার নেতৃত্বে কংগ্রেস সরকার ক্ষমতায়। সঙ্গত কারণেই আসাম সরকার তাদের প্রস্তাব  লুফে নেয়। কিন্তু এরইমধ্যে অসমীয়া ও বাঙালিদের মধ্যে দাঙ্গা-হাঙ্গামা শুরু হয়ে যায়। প্রাথমিক সূত্রপাত ঘটে গোয়াহাটিতে ছাত্র মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে। পুলিশের গুলিতে রঞ্জিত বরপুজারী নামে এক অসমীয়া ছাত্র মারা যায়। ফলে অসমীয়ারা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। তারা কুখ্যাত ‘বঙ্গাল খেদা’ আন্দোলন শুরু করে। বৃটিশ আমল থেকে অসমীয়ারা বাংলাভাষীদের ঘৃণাভরে ডাকতো ‘বঙ্গাল’। বাঙালিদের প্রতি তারা ছিল বেশ মারমুখি। সরকারি প্রশাসনও অনেকটা তাদের পক্ষে ছিল। অনুকূল পরিবেশ পেয়ে তারা বাংলাভাষীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। শুরু হয় লুটতরাজ, অগ্নি সংযোগ ও খুন খারাপি। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত দাঙ্গা চলে পুরোদমে। দাঙ্গার শিকার ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় বসবাসকারী বাঙালিরা মারত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। অসমীয়ারা জোরপূর্বক গোয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয়, ডিব্রগড় মেডিকেল কলেজ ও আসাম মেডিকেল কলেজ থেকে বাঙালি ছাত্রদের বের করে দেয়। প্রায় ৫০ হাজার বাংলাভাষী পালিয়ে পাশ্ববর্তী রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় গ্রহণ করে। আরও ৯০ হাজার বাংলাভাষী বরাক উপত্যকা ও পাশ্ববর্তী এলাকায় আশ্রয় নেয়। রাজ্যজুড়ে দেখা দেয় হূদয় বিদারক মানবিক বিপর্যয়। বিক্ষোভে ফেটে পড়ে গোটা বরাক অঞ্চল। এক পর্যায়ে কেন্দ্রিয় সরকারের হস্তক্ষেপে দাঙ্গা প্রশমিত হয়। দাঙ্গার ব্যাপকতায় প্রাদেশিক সরকারের ভিত কেেঁপ ওঠে। টনক নড়ে কেন্দ্রিয় সরকারেরও। বাধ্য হয়ে বিচারপতি গোপাল মালহোত্রার নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করে। কমিশন রির্পোট থেকে জানা যায়, অসমীয়াদের আক্রমণে বাঙালি অধ্যুষিত ২৫টি গ্রামের ৯ জন বাঙালি নিহত হয়, আহত হয় শতাধিক, ধ্বংস হয়  ৫৮টি বাড়ি ও  ৪০১৯টি গৃহ। অজিত প্রাসাদ জৈন-এর নেতৃত্বে একটি সংসদীয় কমিটি আসামের দাঙ্গা বিধ্বস্ত এলাকা পরিদর্শন করে। অতঃপর কেন্দ্রিয় সরকার গোবিন্দ বল্লভ পন্থের নেতৃত্বে একটি ডেলিগেট প্রেরণ করে। তারা প্রাদেশিক সরকারের মন্ত্রীবর্গ, উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা, আসাম প্রদেশ কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দ, শিলচর বার অ্যাসোসিয়েশন, কাছাড় জেলা কংগ্রেস কমিটিসহ নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ও সংগঠনের সাথে বিস্তারিত আলোচনা করে। দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্থদের জন্য গঠিত হয় রিলিফ কমিটি।  

এহেন অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে ১৯৬০ সালের অক্টোবর মাসে অসমীয়া মূখ্যমন্ত্রী বিমলা প্রাসাদ চেলিহা অসমীয়া ভাষাকে আসামের একমাত্র অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পার্লামেন্টে একটি বিল উত্থাপন করে।  যেন আগুনে ঘৃতাহুতি। বিক্ষোভ দেখা দেয় বরাকসহ গোটা আসামের বাংলাভাষীদের মধ্যে। পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে করিমগঞ্জ থেকে নির্বাচিত এমএলএ রণেন্দ্র মোহন দাস বলেন, এই বিলের মাধ্যমে এক তৃতীয়াংশের ভাষা দুই তৃতীয়াংশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বাংলাভাষী বিধায়কদের আপত্তি স্বত্ত্বেও সংখ্যা গরিষ্ঠতার সুবাদে পাশ হয়ে যায় Assam (official) Language Act (ALA), 1960।  বিতর্কিত আইনটি বহু ভাষাভাষী অধ্যুষিত বৈচিত্র্যময় আসামে বিভেদের সূচনা করে। নন-আসামীরা এটিকে কালো আইন হিসেবে চিহ্নিত করে। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের তুলনায় ছাত্র-শিক্ষক, শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতের মানুষই অধিক হারে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। ১৯৬১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি কাছাড়, হাইলাকান্দি ও করিমগঞ্জবাসী মিলে গড়ে তোলে ‘কাছাড় গণসংগ্রাম পরিষদ’। নেতৃত্ব দেন কাছাড় তথা শিলচরে অভিভাসী সিলেটি সম্প্রদায়। ১৪ এপ্রিল বরাক উপত্যকার তিন মহকুমায় পালিত হয় ‘সংকল্প দিবস’। ভাষার বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার লক্ষ্যে ২৪ এপ্রিল থেকে  শুরু হয় পক্ষকালব্যাপী লং মার্চ বা পদযাত্রা। সত্যাগ্রহীরা তিন মহকুমার ২০০ মাইল পথ অতিক্রম করে ২ মে শিলচর শহরে পদযাত্রা সমাপ্ত করে। পদযাত্রার  পর গণসংগ্রাম পরিষদের সভাপতি রথীন্দ্রনাথ সেন ঘোষণা দেন, ১৩ মে-এর মধ্যে বাংলা ভাষাকে আসামের অন্যতম অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। অন্যথায় ১৯ মে পূর্ণ দিবস হরতাল পালিত হবে। পরিষদ অবশ্য অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠির ভাষার স্বীকৃতি প্রদানের জন্যও আহ্বান জানায়।

আসাম সরকার ১২ মে শিলচর শহরে আসাম রাইফেলস, মাদ্রাজ রেজিমেন্ট ও সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ মোতায়েন করে। তারা রাস্তায় রাস্তায় টহল দিয়ে জনমনে ভীতির সঞ্চার করে। ১৮ মে পুলিশ আন্দোলনের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে ৩জন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে। তারা হলেন—নলিনীকান্ত দাস, রথীন্দ্রনাথ সেন ও বিধুভূষণ চৌধুরী। বিধু চৌধুরী ছিলেন বাংলা সাপ্তাহিক যুগশক্তি-এর সম্পাদক। তার দুই ছেলেও সক্রিয়ভাবে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে।

১৯ মে দিনটি আসামের বাংলাভাষী মানুষের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে। বাংলাদেশের যেমন ২১ ফেব্রুয়ারি তেমনি বরাক উপত্যকার ১৯ মে। পূর্ব ঘোষণা মোতাবেক ওইদিন ভোর থেকেই স্বতঃস্ফুর্ত হরতাল শুরু হয়ে যায় সমগ্র বরাক ভ্যালিতে। করিমগঞ্জ, শিলচর ও হাইলাকান্দি সর্বত্রই পিকেটিং সরকারি অফিস আদালতের সামনে। শিলচরে রেল স্টেশন এলাকায় ভোর হতেই সত্যাগ্রহীরা জড়ো হয়। শিলচর থেকে ভোর ৫টা ৪০ মিনিটে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনে একজন যাত্রীও ছিল না। একটি টিকেটও বিক্রি করতে পারেনি স্টেশন মাস্টার। চলেনি বাস, ট্রাক, মোটর কিংবা অন্য কোনো যানবাহন। দুপুর পর্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবেই কর্মসূচি পালিত হয়। দুপুরের পর স্টেশন এলাকায় আসাম রাইফেলস-এর ফোর্স হাজির হয়। বেলা ২টা ৩০মিনিটে কাটিগড়া থেকে গ্রেফতার করা ৯ জন সত্যাগ্রহীকে নিয়ে একটি ট্রাক রেল স্টেশনের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। স্টেশনে থাকা পিকেটারগণ তখন এগিয়ে গিয়ে গ্রেফতারকৃতদের মুক্ত করে। তখন তারা বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। তখন কে বা কারা ট্রাকটিতে অগ্নি সংযোগ করে। ট্রাকের চালক ও এস্কর্টের দায়িত্বে থাকা পুলিশ ভয়ে পালিয়ে যায়। দমকল বাহিনী দ্রুত উপস্থিত হয়ে আগুন নেভাতে সচেষ্ট হয়। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে বেলা ২টা ৩৫ মিনিটে প্যারা-মিলিটারি ফোর্স ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে রেল স্টেশন ঘেরাও করে পিকেটারদের বেদম প্রহার করতে থাকে। নিক্ষেপ করতে থাকে টিয়ার শেল।  অল্প কয়েক মিনিটের মধ্যেই তারা জনতাকে লক্ষ্য করে ১৭ রাউন্ড গুলি বর্ষণ করে। এতে ১২ জন বিক্ষোভকারী বুলেট বিদ্ধ হয়। আহত হয় আরও শতাধিক। বিপ্লবী উল্লাসকর দত্ত, কংগ্রেস নেতা সতীন্দ্র মোহন দেব, লোকসভার সদস্য জ্যোত্স্না চন্দ প্রমুখ রাজনীতিবিদের চেষ্টায় আহতদের প্রাথমিক চিকিত্সা প্রদান, অ্যাম্বুলেন্স সংগ্রহ ও হাসপাতালে প্রেরণ সম্পন্ন হয়। ওইদিনই ৯ জন হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করে। গোটা রেল স্টেশন ও হাসপাতাল রক্তে ভেসে যায়। আহতদের আর্তচিত্কারে শিলচরের আকাশ ভারী হয়ে ওঠে। পরের দিন রেল স্টেশনের পাশের জলাভূমি থেকে আরও দু’জন সত্যাগ্রহীর লাশ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পরপরই শিলচরের তত্কালীন মহকুমা প্রশাসক হেমন্ত মজুমদারের নির্দেশে সমগ্র শহরে পুলিশ কারফিউ জারী করা হয়। কিন্তু কে শোনে কারফিউ। উত্তেজিত জনতা কারফিউ ভেঙে সিভিল হাসপাতালে জড়ো হয়। গোটা শহর বিক্ষুদ্ধ লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। পরের দিন হাজার হাজার শোকার্ত মানুষ মিছিলসহকারে শহীদদের শব নিয়ে শিলচর শ্মশান ঘাটে যায় এবং শেষকৃত্য সম্পন্ন করে। পরে পাওয়া দু’জনের লাশও একইভাবে পরের দিন যথাযোগ্য মর্যাদায় দাহ করা হয়। নিহতদের মধ্যে ছিলেন ষোল বছরের ছাত্রী কমলা ভট্টাচার্য, যিনি মাতৃভাষার দাবিতে প্রথম আত্ম-উত্সর্গকারী নারী। শহীদের তালিকায় আরও ছিলেন উনিশ বছরের ছাত্র

 

 

শচীন্দ্র পাল, কাঠমিস্ত্রি চণ্ডীচরণ ও বীরেন্দ্র সুত্রধর, চায়ের দোকানের কর্মী কুমুদ দাস, বেসরকারি সংস্থার কর্মচারী সত্যেন্দ্র দেব, ব্যবসায়ী সুকোমল পুরকায়স্থ, সুনীল সরকার ও তরনী দেবনাথ, রেল কর্মচারী কানাইলাল নিয়োগী এবং আত্মীয় বাড়িতে বেড়াতে আসা হিতেশ বিশ্বাস প্রমুখ ভাষাপ্রেমী। জীবন দানকারীদের তালিকা বিশ্লেষণ করলেই স্পষ্ট হয় যে, আন্দোলনে সকল শ্রেণি-পেশার লোকজন অংশগ্রহণ করেছিল। এটি কোনো বিশেষ গোষ্ঠির দাবি ছিল না, দাবিটি ছিল সার্বজনীন।

এই ভয়াবহ ও নরকীয় হত্যাযজ্ঞের ফলে আসামে বাংলাসহ অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিস্বত্তার ভাষার প্রশ্নটি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে ও আন্দোলন আরও গতি পায় । আন্দোলনটি সাধারণ জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। বরাক অঞ্চলের নন-অসমীয়ারাও আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়।  লেখক, শিল্পী, সাহিত্যিক, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ দাবির সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে। শুধু বরাক কিংবা আসাম অঞ্চল নয়, সারাদেশেই নিন্দার ঝড় ওঠে। আসাম সরকার বাধ্য হয়ে গোয়াহাটি হাইকোর্টের তত্কালীন প্রধান বিচারপতি জি. মেহরোত্রার নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে। কিন্তু আসাম সরকার কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিশনের ওপর পুরোপুরি আস্থা রাখতে না পারায় কাছার গণসংগ্রাম পরিষদ-এর আহ্বানে এনসি চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশনও গঠিত হয়। উক্ত কমিশনে সদস্য  ছিলেন পশ্চিবঙ্গের প্রথিতযশা আইনজীবী সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়, অজিত কুমার দত্ত, স্নেহাংশু আচার্য, রণদেব চৌধুরীর মতো বিখ্যাত নাগরিকগণ। শুধু তাই নয়, নিহতদের শোকাতুর পরিবারবর্গের সঙ্গে দেখা করতে আসেন প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষ, ড. ত্রিগুনা সেন (কলকাতায় অভিবাসী সিলেটি) ও ত্রিদিব চৌধুরীর মতো উচ্চ পর্যায়ের রাজনীতিবিদগণ। বরাক উপত্যকা থেকে একটি প্রতিনিধি দল প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন এবং ঘটনা বিস্তারিতভাবে অবহিত করেন। পণ্ডিত নেহরু সমুদয় বিষয় অবহিত হয়ে সহানুভূতি প্রকাশ করেন ও সমস্যা সমাধানের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীকে দায়িত্ব প্রদান করেন।

পণ্ডিত নেহরু মন্ত্রীসভার সিনিয়র সদস্য লাল বাহাদুর শাস্ত্রী আসামে এসে সকলের সাথে আলোচনা করে একটি  সমাধানে পৌঁছার জন্য সচেষ্ট হন। শাস্ত্রী  মূখ্যমন্ত্রী চালিহাসহ আসাম প্রাদেশিক সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, অসমীয়া ও বাংলাভাষী বুদ্ধিজীবীসহ সকলেরর সাথেই আলাপ-আলোচনা করে বেশকিছু সুপারিশসহ একটি প্রতিবেদন দাখিল করেন এবং তিনি একটি আপোস ফর্মূলায় উপনীত হওয়ার চেষ্টা করেন। তার অন্যতম সুপারিশ ছিল আসাম বিধান সভা কর্তৃক পাশকৃত ভাষা আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা।  দ্বিতীয়ত, রাজ্য পর্যায়ে অসমীয়ার সাথে ইংরেজি ভাষাকে আসামের কমন  অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে রাখা। তৃতীয়ত, সংখ্যালঘু জাতিস্বত্তার ভাষাকে সংরক্ষণের জন্য শক্তিশালী বিধান অন্তর্ভূক্ত করা। চতুর্থত, ভাষার প্রশ্নটি স্থানীয় সরকারের হাতে ছেড়ে দেওয়া। স্থানীয় সরকার দুই তৃতীয়াংশ ভাষা আইনে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামত নিয়ে নিজ এলাকার অফিসিয়াল ভাষা কোনটি হবে তা নির্ধারন করবে। কিন্তু নিখিল আসাম সাহিত্য সভা কোনো অবস্থাতেই নিজেদের দাবি থেকে সরে আসতে চায়নি। তারা অসমীয়াকেই আসামের সরকারি ভাষা হিসেবে অক্ষুন্ন রাখার পক্ষপাতি। বাংলা ভাষাকে স্থান দিতে মোটেও তারা প্রস্তুত ছিল না। তারা শাস্ত্রীর নিকট তাদের দাবির স্বপক্ষে স্মারকলিপি প্রদান করে। অন্যদিকে, বাংলা ভাষার বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা না থাকায় আসামের  বাঙালিরাও পুরোপুরি সন্তোষ্ট হতে পারেনি। পরে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে আসাম সরকার বাধ্য হয় ভাষা সংক্রান্ত আইনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে। সংশোধিত আইনে বিধান  করা হয় আসামের বরাক অঞ্চলের ৩টি মহকুমা (পরে জেলা) শিলচর, হাইলাকান্দি ও করিমগঞ্জে অফিসিয়াল ভাষা হবে বাংলা। অবশেষে দীর্ঘ সংগ্রাম ও বহু মানুষের আত্মত্যাগের ফলে বাংলা ভাষার বিজয় সূচিত হলো।  অনেক মানুষের আত্মত্যাগের মাধ্যমে বাংলা ভাষার দাবি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ভাষা শহীদদের স্মরণে শিলচর শহরে স্থাপন করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন শহীদ মিনার। ২০১১ সালে ছোটেলাল শেঠ ইনস্টিটিউটে স্থাপন করা হয়েছে ভাষা শহীদ কমলা ভট্টাচার্যের ব্রোঞ্জ মূর্তি।  প্রতিবছর ১৯ মে পালন করা হয় ভাষা শহীদ দিবস। ১৯ মে’র স্মরণে অনেক শোক গাঁথা রচিত হয়েছে। প্রকাশিত হয়েছে অনেক গল্প, কবিতা, উপন্যাস ও প্রবন্ধ। সুরমা উপত্যকার একজন হিসেবে বরাক অঞ্চলের বীর শহীদদের শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি। ওদের আত্মত্যাগের সাথে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির শহীদদের বহুলাংশে মিল খুঁজে পাই।

 

 লেখক : উপসচিব, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ ইং
ফজর৫:১৩
যোহর১২:১৩
আসর৪:২০
মাগরিব৫:৫৯
এশা৭:১২
সূর্যোদয় - ৬:২৯সূর্যাস্ত - ০৫:৫৪
পড়ুন