বাণিজ্য | The Daily Ittefaq

রপ্তানি ও রেমিট্যান্স কমায় অর্থনীতিতে চাপ

রপ্তানি ও রেমিট্যান্স কমায় অর্থনীতিতে চাপ
রেজাউল হক কৌশিক১৫ জুলাই, ২০১৭ ইং ১২:১২ মিঃ
রপ্তানি ও রেমিট্যান্স কমায় অর্থনীতিতে চাপ
 
শেষ হলো ২০১৬-১৭ অর্থবছর। বছর জুড়েই রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল স্থিতিশীল। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হয়, দেশের অভ্যন্তরে তেমন বৈরী পরিবেশ ছিল না। তারপরও দেখা যাচ্ছে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি বা প্রধান প্রধান সূচকগুলোর প্রবৃদ্ধিতে নিম্নগতি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নেতিবাচক। সাম্প্রতিক সময়ের সূচকে এমন মন্থরগতি সবাইকে ভাবিয়ে তুলছে। কিভাবে এ অবস্থা থেকে বের হওয়া যায় সে বিষয়েও চলছে জোর তৎপরতা।
 
এ অবস্থায় দেশের অর্থনীতির স্বার্থে রপ্তানি ও রেমিট্যান্স বাড়ানোর বিকল্প নেই। আর এ দুটি বাড়লে অন্যান্য ক্ষেত্রও ইতিবাচক হবে। অর্থনীতি হয়ে উঠবে প্রাণবন্ত। রপ্তানি আয় দেশের অর্থনীতির মূল হাতিয়ারগুলোর মধ্যে অন্যতম। তবে এ রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি অনেক কমে গেছে। সদ্য শেষ হওয়া অর্থবছরে রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র এক দশমিক ৬৯ শতাংশ। যা গত দেড় দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। এ সময়ে দেশ থেকে তিন হাজার ৪৮৩ কোটি ৫০ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২১৬ কোটি ডলার কম।
 
দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উত্স রেমিট্যান্স। সর্বশেষ হিসাবে দেখা গেছে, গত অর্থবছরে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স প্রবাহ সাড়ে ১৪ শতাংশ কমেছে। এ অর্থবছরে প্রবাসীরা এক হাজার ২৭৬ কোটি ৯৪ লাখ ডলার পাঠিয়েছেন। যা গত পাঁচ অর্থবছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। রপ্তানি আয়ে ধীরগতি ও প্রবাসী আয় ব্যাপকহারে কমে যাওয়ায় চলতি হিসাবে বড় ঘাটতি দেখা দিয়েছে। গত অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে চলতি হিসাবে ২১০ কোটি ৩০ লাখ ডলার ঘাটতি হয়েছে। অর্থবছরের ১০ মাসের হিসাবে ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১৭৬ কোটি ডলারের মতো। অথচ ২০১৫-১৬ অর্থবছরের ১১ মাসে চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত ছিল ৩১৯ কোটি ৩০ লাখ ডলার।  এ সময়ে সেবাখাতেও ঘাটতি বেড়েছে। অন্যদিকে ব্যাপকহারে বাড়ছে বাণিজ্য ঘাটতি। অর্থবছরের প্রথম ১১ মাস শেষে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯১৯ কোটি ৮০ লাখ ডলার। যা ২০১৫-১৬ অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৬৪৫ কোটি ১০ লাখ ডলার। সে হিসেবে একবছরের ব্যবধানে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ২৭৪ কোটি ৭০ লাখ ডলার বা  ৪২ দশমিক ৫৮ শতাংশ।
 
গত একযুগে দেশের রপ্তানি বাণিজ্য বেড়েছে কয়েকগুণ। তবে রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ ভাগই এসেছে তৈরি পোশাক শিল্পকে ভর করে। আর এ সময়ে গুটিকয়েক দেশের বৃত্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে এ খাত। রপ্তানির এ ধারা রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য বড় ঝুঁকি। সীমিত পণ্য ও বাজার এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় উত্পাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় কমে যাচ্ছে টার্মস অব ট্রেড (এক ইউনিট রপ্তানির পরিবর্তে কত ইউনিট আমদানি করা যায়)। রপ্তানির ক্ষেত্রে এক পণ্য নির্ভরতা বা এক্সপোর্ট কনসেনট্রেশন থেকে বের হতে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি ও বেসরকারি অনেক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে সেসব উদ্যোগের অনেক কিছুই আলোর মুখ দেখেনি।
 
রপ্তানির সঙ্গে প্রবৃদ্ধির ইতিবাচক সম্পর্ক রয়েছে। রপ্তানি ভালো হলে বিনিয়োগ বাড়ে, নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে রপ্তানি বহুমুখীকরণের সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আর্থ-সামাজিক অবস্থার ইতিবাচক সম্পর্ক রয়েছে। রপ্তানি বহুমুখীকরণ হলে টার্মস অব ট্রেড স্থিতিশীল থাকার পাশাপাশি রপ্তানি প্রবৃদ্ধিও বাড়ে। সত্তরের দশকের দিকেও বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ৯০ শতাংশ আসতো পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে। সেখানেও এক্সপোর্ট কনসেনট্রেশনই ছিল বড় সমস্যা। তবে তখন আর এখনকার মধ্যে পার্থক্য হলো, সে সময়ে রপ্তানি খাত ছিল প্রাথমিক পণ্যনির্ভর। এখন শিল্পপণ্য নির্ভর। পণ্যের বহুমুখীকরণ করতে না পারলে তাতে অনেক ঝুঁকি থাকে। এ একটি পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের নেতিবাচক ঘটনা ঘটলে পুরো অর্থনীতিতে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। পণ্যের বহুমুখীকরণ না করতে পারলে বা যেকোনো কারণে আমদানিকারক দেশগুলো আমাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে অর্থনীতি হুমকির মুখে পড়বে।
 
এদিকে রেমিট্যান্স কমে যাওয়া বিষয়ে বিদায়ী ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রথম থেকেই উদ্বেগের মধ্যে ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ। আর প্রবাসীদের কষ্টার্জিত টাকা ব্যাংকিং চ্যানেলে আনতে নানান উদ্যোগও নিয়েছে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু উদ্যোগ তেমন কাজে আসেনি। প্রতিনিয়ত কমেছে রেমিট্যান্সের পরিমাণ।
 
যেসব কারণে রেমিট্যান্স কমেছে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল বিশ্বব্যাপী তেলের দাম কমে যাওয়া। এতে প্রবাসীদের উপার্জন কম হয়েছে। অন্যদিকে পশ্চিমা বিশ্বের নানা সঙ্কটে ইউরো ও পাউন্ডের দামও অনেক কমে গিয়েছে। এতে প্রবাসীরা যা উপার্জন করেছে তা ভাঙানোর পরে অনেক কমে গেছে। আর এ দুই কারণে একটু বাড়তি লাভের আশায় ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ না পাঠিয়ে হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাঠিয়েছেন তারা। ফলে তা হিসাবে আসেনি। অর্থনীতির স্বার্থে রেমিট্যান্স বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় গবেষণা ও সময়োপযোগী উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
 
ইত্তেফাক/আনিসুর
এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
২১ নভেম্বর, ২০১৭ ইং
ফজর৪:৫৮
যোহর১১:৪৫
আসর৩:৩৬
মাগরিব৫:১৫
এশা৬:৩১
সূর্যোদয় - ৬:১৭সূর্যাস্ত - ০৫:১০