বাণিজ্য | The Daily Ittefaq

একক পণ্য নির্ভরতা কমানো সময়ের দাবি

একক পণ্য নির্ভরতা কমানো সময়ের দাবি
রেজাউল হক কৌশিক২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং ০৯:১২ মিঃ
একক পণ্য নির্ভরতা কমানো সময়ের দাবি
 
বাংলাদেশের রপ্তানি খাত মূলত তৈরি পোশাক নির্ভর। দীর্ঘদিন ধরেই রপ্তানি বাণিজ্যে এ এক পণ্য নির্ভরতা বিদ্যমান রয়েছে। অন্যদিকে পোশাক খাতে রপ্তানি খারাপ হলে তার নেতিবাচক প্রভাবও পড়ে রপ্তানি খাতের উপর।
 
আরো একটু বিশ্লেষণ করলেই দেখা যায়, পোশাক খাতসহ হাতে গোনা মাত্র কয়েকটি পণ্যের উপরই নির্ভরশীল দেশের রপ্তানি বাণিজ্য। বাংলাদেশ থেকে ৭০০টিরও বেশি পণ্য রপ্তানি হয়। সংখ্যার দিক থেকে এটি বিশাল। তবে তৈরি পোশাক শিল্পের বাইরে হিমায়িত খাদ্য এবং পাট ও পাটজাত, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য থেকে রপ্তানি আয় কিছুটা বেশি থাকলেও অন্যান্য পণ্য থেকে রপ্তানি আয় খুবই কম। আর পণ্য রপ্তানির গন্তব্যও খুব অল্প। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (ইইউ), মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মত দেশেই মোট রপ্তানির ৮০ ভাগ যায়।
 
যদি রপ্তানি বাণিজ্যের এ ধারাতে পরিবর্তন না আনা যায়, তাহলে রপ্তানি বাণিজ্য টেকসই করা মুশকিল হয়ে দাঁড়াবে। বেশ কয়েক বছর যাবতই অর্থনীতিবীদ ও বাজার বিশ্লেষকরা এমন কথা বলে আসছেন। তবে প্রকৃতপক্ষে এ বাণিজ্যে  কোনো পরিবর্তন আসছে না। গত এক যুগে গুটিকয়েক পণ্যের উপরই নির্ভর করতে হচ্ছে। ফলে রপ্তানি বাণিজ্যে ঝুঁকি দেখা যাচ্ছে। কারণ, সীমিত পণ্য ও বাজার এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় উত্পাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় কমে    যাচ্ছে টার্মস অব ট্রেড (এক ইউনিট রফতানির পরিবর্তে কত ইউনিট আমদানি করা যায়)। রপ্তানির ক্ষেত্রে এক পণ্য নির্ভরতা বা এক্সপোর্ট কনসেনট্রেশন থেকে বের হওয়ার জন্য দীর্ঘদিন ধরে সরকারি ও বেসরকারি কোনো উদ্যোগই তেমন কার্যকর হচ্ছে না।
 
এক্সপোর্ট কনসেনট্রেশন যেসব দেশে বেশি, তাদের টার্মস অব ট্রেড খুব কমে যায়। আর যেসব দেশ রপ্তানি বহুমুখীকরণ করতে পেরেছে তাদের প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। একইসঙ্গে তাদের টার্মস অব ট্রেডও স্থিতিশীল হয়েছে। রপ্তানির সঙ্গে প্রবৃদ্ধির ইতিবাচক সম্পর্ক রয়েছে। রপ্তানি ভালো হলে বিনিয়োগ বাড়ে, নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে রপ্তানি বহুমুখীকরণের সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আর্থ-সামাজিক অবস্থার ইতিবাচক সম্পর্ক রয়েছে।    রপ্তানি বহুমুখীকরণ হলে টার্মস অব ট্রেড স্থিতিশীল থাকার পাশাপাশি রপ্তানি প্রবৃদ্ধিও বাড়ে।
 
এক্সপোর্ট কনসেনট্রেশন বেশি হলে কী হতে পারে তার উদাহরণ বাংলাদেশেই আছে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ৯০ শতাংশ আসত পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে। সেসময় এক্সপোর্ট কনসেনট্রেশনই ছিল বড় সমস্যা। তবে সেসময় আর বর্তমান সময়ের অনেক পরিবর্তন এসেছে। ওইসময়ে বাংলাদেশ থেকে প্রাথমিক পণ্য রপ্তানি হতো। এখন রপ্তানি হয় শিল্পপণ্য।
 
সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ আশানুরূপ না হওয়ায় এবং সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবে পণ্যের বহুমুখীকরণ হচ্ছে না। এতে রপ্তানি বাণিজ্যে পিছিয়ে পড়ছে দেশ। অন্যদিকে অর্থনীতির বড় এ খাতে কোনো ধরনের নেতিবাচক ঘটনা ঘটলে পুরো অর্থনীতিতে প্রভাব পড়ে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।   রপ্তানি বাণিজ্য টেকসই করতে হলে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সরকারি  সহায়তা আরো বাড়ানো দরকার। আর রপ্তানি পণ্য বহুমুখীকরণে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তাদেরই বেশি ভূমিকা পালন করতে হবে। রপ্তানিকারকরা একই ধরনের ব্যবসা না করে ভিন্ন ভিন্ন ব্যবসা করলে এটার সমাধান হবে। এক্ষেত্রে উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসায়ীরাও লাভবান হতে পারেন।
 
পণ্যের বহুমুখীকরণ না হলে এবং রপ্তানির গন্তব্য না বাড়লে অর্থনীতিতে বড় ধরনের দুর্যোগ আসতে পারে বলে আশঙ্কা করেছেন স্বয়ং বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। তিনি প্রায়ই বলেন, অর্থনীতির মূল শক্তি রপ্তানি হলেও বাংলাদেশ সীমিতসংখ্যক পণ্য রপ্তানি করছে। আর এসব পণ্যও রপ্তানি হচ্ছে হাতেগোনা কয়েকটি দেশে। এজন্য রপ্তানির পণ্যের বহুমুখীকরণ না করতে পারলে বা যেকোনো কারণে আমদানিকারক দেশগুলো আমাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে অর্থনীতি হুমকির মুখে পড়বে। তিনি বলেন, এজন্য পণ্যের ও বাজারের বহুমুখীকরণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে কাজও শুরু হয়েছে।
 
গত দেড় দশকের মধ্যে গেল অর্থবছরে (২০১৬-১৭) সবচেয়ে কম রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এ সময়ে আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র এক দশমিক ৩৫ শতাংশ। গত দেড় দশকে এত কম প্রবৃদ্ধি হয়নি। অন্যদিকে অর্থবছরের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২ বিলিয়ন ডলার কম রপ্তানি হয়েছে। এসব বিবেচনায় চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বেশ ভালো রপ্তানি হয়েছে। রপ্তানিকারকরা বলছেন, আবারো গতি ফিরছে রপ্তানি বাণিজ্যে। চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ১৪ শতাংশ রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। একইসঙ্গে এ সময়ে রপ্তানি আয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা ছিল তাও ছাড়িয়েছে। গত দুই মাসে মোট ৬৬২ কোটি ৮৬ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। রপ্তানির সার্বিক এ পরিসংখ্যান ও পোশাক খাতের রপ্তানির পরিসংখ্যান দেখলে বোঝা যায়, সরকার ও রপ্তানিকারক পণ্য বহুমুখীকরণের কথা বললেও তা মুখে মুখে থেকে গেছে। রপ্তানির জন্য নতুন বাজার তৈরির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। রপ্তানি বাণিজ্যকে টেকসই করতে হলে একপণ্য নির্ভরতা থেকে বের হয়ে আসার কোনো বিকল্প নেই। পণ্য বহুমুখীকরণের পাশাপাশি ভৌগোলিক বহুমুখীকরণও প্রয়োজন।
 
ইত্তেফাক/কেকে
এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
১৭ অক্টোবর, ২০১৭ ইং
ফজর৪:৪২
যোহর১১:৪৪
আসর৩:৫৩
মাগরিব৫:৩৪
এশা৬:৪৬
সূর্যোদয় - ৫:৫৭সূর্যাস্ত - ০৫:২৯