অর্থনীতি | The Daily Ittefaq

কোনো ব্যাংকের সুদের হার দশের নিচে নেই

কোনো ব্যাংকের সুদের হার দশের নিচে নেই
*২০ শতাংশের উপরে আছে বেশ কয়েকটি ব্যাংকের *শিল্প আয়ের বড় অংশ চলে যাচ্ছে সুদ পরিশোধে *সুদের হার কমাতে সরকারি আমানত বেসরকারি ব্যাংকে রাখার উদ্যোগ
রেজাউল হক কৌশিক০১ এপ্রিল, ২০১৮ ইং ০১:২১ মিঃ
কোনো ব্যাংকের সুদের হার দশের নিচে নেই

ধীরে ধীরে কমে আসছিল ব্যাংক ঋণের সুদের হার। প্রতিমাসেই অব্যাহতভাবে তা কমছিল। কিন্তু গত তিন মাসে পুরো উল্টোচিত্র। এখন প্রতিমাসেই বাড়ছে ব্যাংক ঋণের সুদ। এখন অবস্থা এমন পর্যায়ে এসেছে যে কোনো ব্যাংকেরই সুদের হার এক অঙ্কে (১০ শতাংশের নীচে) নেই। এক্ষেত্রে সরকারি, বেসরকারি সব ব্যাংকেরই একই অবস্থা। এমন অবস্থা চলতে থাকলে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে যাবেন না। কারণ, শিল্প উত্পাদন অব্যাহত রাখা বা নতুন বিনিয়োগের জন্য সুদের হার অন্যতম বড় বাধা।

সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং খাতে নগদ টাকার ব্যাপক সঙ্কট দেখা দিয়েছে। ফলে বেশি সুদ দিয়ে আমানত সংগ্রহ করতে ব্যাংকগুলো মরিয়া হয়ে গেছে। আর বেশি সুদে আমানত নেওয়ায় ঋণের সুদের হারও বেড়ে গেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাস (জুলাই-ডিসেম্বর) সময়ে প্রচুর পরিমাণে ঋণ বিতরণ হওয়ায় ব্যাংকের তহবিল সঙ্কট হয়েছে বলে ব্যাংকগুলোর দাবি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্যে দেখা গেছে, দেশে চালু থাকা ৫৭টি তফসিলি ব্যাংকের মধ্যে সবক’টিতেই এখন দুই অঙ্কের সুদ গুনছেন ব্যবসায়ীরা। এর মধ্যে শিল্প প্রতিষ্ঠানে দেওয়া ঋণের বিপরীতে ১৫ শতাংশেরও বেশি সুদ নিচ্ছে বেশ কয়েকটি ব্যাংক। গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়েই এমন অবস্থা ছিল বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের গত ফেব্রুয়ারি মাসের তথ্য নিয়ে সাজানো বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা গেছে। মার্চ মাসে এ হার আরো বেড়েছে বলেই ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় শিল্পসহ সার্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। আবার চলতি বছরের শেষে জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংক ঋণের সুদহার ঠিক করতে এবং ব্যাংকিং খাতে অর্থ সঙ্কট দূর করতে সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সমপ্রতি আওয়ামী লীগের যৌথসভায় ব্যাংকের ঋণের সুদ হার এক অঙ্কে কমিয়ে আনার তাগিদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর গত শুক্রবার রাতে ব্যাংকগুলোর চেয়ারম্যান ও এমডিদের সঙ্গে বৈঠক করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। সেখানে ব্যাংকের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার বিষয়ে কিছু পদক্ষেপের কথাও জানান তিনি। এখন থেকে সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানতের অর্ধেক বেসরকারি ব্যাংকে রাখতে পারবেন বলে তিনি জানান। অবশ্য এ বিষয়ে আজ রবিবারও আবার বৈঠকে বসবেন চেয়ারম্যান ও এমডিদের সঙ্গে অর্থমন্ত্রী।

ব্যাংক ঋণে উচ্চ সুদহার বিষয়ে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের প্রেসিডেন্ট সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, সুদের হার বাড়লে উত্পাদন খরচও বেড়ে যায়। আর উত্পাদন খরচ বাড়লে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে। তখন দেশের বিনিয়োগও কমে যাবে। ব্যবসায়ীদের পক্ষ  থেকে দীর্ঘদিনের দাবি ছিল সুদের হার এক অংকে অর্থাত্ ১০ এর নিচে নিয়ে আসা। তা এসেছিলও কিন্তু হঠাত্ আবার বাড়তে শুরু করায় ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়েছেন। শিগগিরই সুদহার কমিয়ে ১০ -এর নিচে নিয়ে আসা দরকার বলে মনে করেন এ ব্যবসায়ী।

সুদের হার মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি উদ্বিগ্ন বাংলাদেশ ব্যাংকও। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ফজলে কবির বলেন, ব্যাংক ঋণের সুদ হার বেড়ে যাওয়া ব্যবসার জন্য নেতিবাচক। এমনকি দেশের জন্যও তা খারাপ। একারণে অন্ততপক্ষে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের সুদহার না বাড়ানোর জন্য অনুরোধ জানান তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা গেছে, সরকারি মালিকানার আটটি ব্যাংকের মধ্যে জনতা ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক থেকে ব্যবসায়ীরা দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি দুই ধরনের ঋণেই সুদ গুনছেন ১৩ শতাংশ হারে। একইহারে ব্যবসায়ীদের সুদ গুনতে হচ্ছে শিল্পের মেয়াদি, চলতি ও এসএমই ঋণের ক্ষেত্রেও। সোনালী ব্যাংক ও রূপালী ব্যাংক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সুদ নিচ্ছে ১১ শতাংশ হারে। অগ্রণী ব্যাংক ও বাংলাদেশ ডেভলপমেন্ট ব্যাংক (বিডিবিএল) সুদ নিচ্ছে ১১ থেকে ১২ শতাংশ হারে।

শিল্প ঋণের ক্ষেত্রে সরকারি ব্যাংকের চেয়ে বেশি হারে সুদ আরোপ করছে বেসরকারি ব্যাংকগুলো। ২০ শতাংশেরও বেশি হারে সুদ আরোপ করছে কোনও কোনও ব্যাংক। ওই প্রতিবেদন আরও দেখা গেছে, যেসব ব্যবসায়ী ব্র্যাক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন তাদের কারও কারও সুদ গুনতে হচ্ছে ২২ শতাংশ পর্যন্ত। বেসরকারি অন্যান্য অধিকাংশ ব্যাংক এসএমই বা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে সুদ নিচ্ছে ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ হারে। বড় উদ্যোক্তাদেরও দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি দুই ধরনের ঋণই গুনতে হচ্ছে সর্বোচ্চ ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ হারে।

ব্যাংকগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে ঋণের সুদহার বাড়াতে থাকে ব্যাংকগুলো। সুদহার বাড়তে বাড়তে জানুয়ারিতেই দেশের সব ব্যাংকের সুদের হার দুই অঙ্কে চলে গেছে। অবশ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়েছে, শিল্পের জন্য এককভাবে সব ব্যাংক ব্যবসায়ীদের দুই অঙ্কের সুদে ঋণ দিলেও গড় হিসাবে কয়েকটি ব্যাংক সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে দেখাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি বেড়ে যাওয়ায় ঋণে সুদের হারও বেড়ে গেছে। ২০১৭ সালের দ্বিতীয়ার্ধ থেকেই ব্যাপক হারে বেড়েছে ঋণ বিতরণ। গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। নভেম্বরে ছিল ১৯ দশমিক ০৬ শতাংশ। এর আগে অক্টোবরে ১৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ, সেপ্টেম্বরে ১৯ দশমিক ৪০ শতাংশ, আগস্টে ১৯ দশমিক ৮৪ ও জুলাইয়ে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ। জুনে ঋণ বৃদ্ধির হার ছিল ১৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ। এ কারণে অধিকাংশ ব্যাংক পড়ে যায় তারল্য সংকটে। পাশাপাশি আমদানি দায় মেটাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে ডলার কিনতে হয়েছে ব্যাংকগুলোকে।

ইত্তেফাক/নূহু

এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
ফজর৪:৩৩
যোহর১১:৫২
আসর৪:১৩
মাগরিব৫:৫৭
এশা৭:১০
সূর্যোদয় - ৫:৪৭সূর্যাস্ত - ০৫:৫২