ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২১ মার্চ ২০১৯, ৭ চৈত্র ১৪২৫
২৩ °সে

পাঠাগার আছে পাঠক নেই

পাঠাগার আছে পাঠক নেই
নাটোরের ভিক্টোরিয়া পাবলিক লাইব্রেরি। ছবিঃ ইত্তেফাক।

পাঠক সংকটে এখন প্রাণহীন অবস্থা নাটোরের ভিক্টোরিয়া পাবলিক লাইব্রেরির। অথচ দেশের অন্যতম প্রাচীন একটি পাঠাগার এটি। এক সময় বই পড়ার অভ্যাস তৈরি করেছে, অত্র এলাকার মানুষকে জ্ঞানের আলোর সন্ধান দিয়েছে এই পাঠাগারটি।

জানা যায়, নাটোরের মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ রায়ের আমন্ত্রণে ১৮৯৮ সালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এসেছিলেন নাটোরে। তার পরামর্শে ১৯০১ সালে সাহিত্যিক ও শিক্ষানুরাগী মহারাজা জগদিন্দ্র নাথ রায় প্রতিষ্ঠা করেন ভিক্টোরিয়া পাবলিক লাইব্রেরি। প্রতিষ্ঠাকাল থেকে লাইব্রেরিটি হয়ে ওঠে শিক্ষিত, সচেতন গণমানুষের প্রিয় অঙ্গণ। রাজা, জমিদার, শিক্ষিত মানুষের সহযোগিতায় গড়ে ওঠে পাঠাগারটি।

সে সময় অক্ষয়কুমার মৈত্র ও রায় বাহাদুর জলধর সেন পালন করেন বই নির্বাচনের দায়িত্ব। স্যার যদুনাথ সরকার, প্রমথ বিশির মত বরেণ্য ব্যক্তিদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে পাঠাগার আঙিনা। ত্রিশের দশকে প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ কাজী আবুল মসউদ ও লেখক গোবিন্দ সাহার মতো ব্যক্তিদের গতিশীল নেতৃত্বে পাঠাগারটি সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। নিয়মিত আয়োজন হতে থাকে পূর্ণিমা তিথিতে বিশেষ সাহিত্য সভার। বিভিন্ন সময়ে সাহিত্য সভায় অতিথি হয়ে আসেন কথা সাহিত্যিক তারাশংকর বন্দোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় এবং যুগান্তর সম্পাদক বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়, আনন্দবাজার সম্পাদক চপলা কান্ত ভট্টাচার্য প্রমুখ। ৪৭-এর ভারত বিভক্তির পর ষাটের দশকে পাঠাগারটি পুনরায় প্রাণ ফিরে পায়। ৭১-এ মহান মুক্তিযুদ্ধে ধ্বংসের শিকার হয় এই পাঠাগারটি।

আশির দশকে এসডিও এ. এইচ. এস. সাদেকুল হকের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং কথা সাহিত্যিক শফী উদ্দিন সরদারের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে প্রাণ ফিরে আসে পাঠাগারটির। আর ১৯৮৬ সালে জেলা প্রশাসক জালাল উদ্দিন আহামেদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় বিদ্যমান নতুন ভবনের নির্মান কাজের মধ্য দিয়ে পাঠাগারটির নতুন যাত্রা শুরু হয়। পাঁচ শতাংশ জমির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বর্তমান ভবনের তৃতীয় তলা জুড়ে মিলনায়তন নির্মানের কাজ এখন শেষের পথে।

পাঠক সমাগমে ভরপুর নব্বইয়ের দশক ছিল পাঠাগারটির সোনালী সময়। বিভিন্ন দিবস উদযাপন, সাহিত্য আসর আয়োজন, দেয়াল পত্রিকার প্রকাশনা ছিলো চোখে পড়ার মত। ১৯৯৬ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত একক ভাবে আয়োজন করা হয় একুশের বই মেলার।

কালের পরিক্রমায় বর্তমানে পাঠাগারটিতে এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকা, বাংলাপিডিয়া, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সহ ১২ হাজার বই রয়েছে। জেলা প্রশাসনের সঙ্গে যৌথভাবে একুশের বই মেলা আয়োজন ছাড়া ও শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস, স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস, বিজয় দিবস উদযাপন ছাড়া ও অনিয়মিত আয়োজনে রয়েছে সাহিত্য আসর।

প্রতি বছরের ডিসেম্বরে আলোচনা-সমালোচনায় মুখর হয়ে ওঠে বার্ষিক সাধারণ সভাটি। গত বার্ষিক সাধারণ সভায় পাঠাগারটির শ্রীবৃদ্ধি করতে অনেক প্রস্তাব আসে পাঠকদের মধ্য থেকে। এরমধ্যে ই-বুক চালু ও শিক্ষার্থীদের জন্যে বইপড়া প্রতিযোগিতা আয়োজন উল্লেখযোগ্য।

এসব প্রস্তাবনার ব্যাপারে পাঠাগারটির সাধারণ সম্পাদক মোঃ আলতাফ হোসেন বলেন, 'প্রয়োজনীয় কম্পিউটার সংগ্রহ করা গেলে ই-বুক এর পরিকল্পনা করা যেতে পারে। এর আগে বই পড়া প্রতিযোগিতা আয়োজন, স্বল্প দৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র প্রদর্শনসহ নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেও পাঠক বৃদ্ধি করা যায়নি।'

পাঠাগারটির পাঠক রেজিস্টারে দেখা যায়, প্রতিদিন গড়ে সাতজন পাঠকের উপস্থিতি। একই দাবি লাইব্রেরীয়ান অসীম অধিকারীর।

নিয়মিত পাঠক কবি গনেশ পাল বলেন, ‘পড়ার নেশা থেকেই আসা।' পাঠক না আসা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'শিক্ষার্থীরা এখন রয়েছে পাঠ্য বইয়ের চাপে, রয়েছে কোচিংয়ের চাপ, ওদের আর সময় নেই।’ পাঠক মুহাম্মদ রবিউল হক বইয়ের সংগ্রহ আরো বৃদ্ধির পরামর্শ দেন।

নাটোরের সজ্জন ও পাঠাগারটির আজীবন সদস্য মুজিবুল হক নবী পাঠকদের নিয়মিত এখানে না আসা প্রসঙ্গে বলেন, ‘ব্যস্ততা, ব্যক্তিগত সংগ্রহশালা এবং ইন্টারনেট ব্রাউজিংয়ের কারণে লাইব্রেরিতে পাঠক থাকছে না।'

আরও পড়ুনঃ ছয় মাসে আসবাবপত্র রফতানি বেড়েছে ৪০ শতাংশ

পাঠাগারটির আজীবন সদস্য, গবেষক ও উপসচিব মোঃ মখলেছুর রহমান বলেন, ‘ই-বুক চালু, সাম্প্রতিক প্রকাশনা সংযোজনের মাধ্যমে সংগ্রহ বৃদ্ধিসহ গবেষণাধর্মী বইয়ের ওপর গুরুত্ব প্রদান করে পাঠাগারটিকে যুগোপযোগী করতে পারলে অবশ্যই এটি জমজমাট হবে।’

ইত্তেফাক/অনি/নূহু

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২১ মার্চ, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন