সারাদেশ | The Daily Ittefaq

হাওরাঞ্চলে ধান গেল মাছ গেল এবার মরছে হাঁস

হাওরাঞ্চলে ধান গেল মাছ গেল এবার মরছে হাঁস
ইত্তেফাক ডেস্ক২১ এপ্রিল, ২০১৭ ইং ১১:১৬ মিঃ
হাওরাঞ্চলে ধান গেল মাছ গেল এবার মরছে হাঁস
 
হাওরাঞ্চলে ধান গেল, মাছ গেল—এবার মরছে খামারিদের হাজার হাজার হাঁস ও পাখি। মরে ভেসে ওঠা মাছ খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খামারিদের হাঁস ও বিভিন্ন প্রজাতির পাখি মারা যাচ্ছে। এ ছাড়া সার্বিকভাবে সুনামগঞ্জ, সিলেট ও নেত্রকোনার হাওর এলাকায় ধান, মাছ, হাঁস, পাঁখি পচে চারদিকে পূতিগন্ধময় পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। বন্যার পানি কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে দুর্গন্ধ। হাওর-নদীর পানি কালো হয়ে গেছে। তবে আশার কথা বৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হবে।
 
জগন্নাথপুর (সুনামগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, হাওর-নদী-জলাশয়ে মরে যাওয়া মাছ খেয়ে খামারিদের হাজার হাজার হাঁস ও বিভিন্ন প্রজাতির পাখি মারা যাচ্ছে। পচা মাছ খেয়ে এ পর্যন্ত উপজেলার পাইলগাঁও ইউনিয়নের পালপুরা বন হাওরের খামারি কাশেম মিয়ার খামারের চার হাজার হাঁসসহ উপজেলার বিভিন্ন হাওরে পাঁচ হাজারের বেশি হাঁস মারা গেছে। খামারি কাশেম মিয়া চোখের সামনে হাঁসগুলোর মৃত্যুতে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। এনজিও থেকে উত্তোলনকৃত ঋণের টাকায় হাঁস কিনে ডিম বিক্রি করে সংসার চালানোর আশা করেছিলেন তিনি। হাঁসপালনকারী অন্যান্য হাওরবাসীরও একই অবস্থা।এদিকে পচা ফসল, মরা মাছ, মরা হাঁস ও পাখির মরদেহের দুর্গন্ধে হাওর ও নদীর পারে বসবাসকারী মানুষ পড়েছেন চরম দুর্ভোগে। হাওর ও নদীর সাদা পানি কালো হয়ে গেছে। মানুষ নদী ও হাওরের পানি ব্যবহার করতে পারছেন না। যাবতীয় কাজ সারতে হচ্ছে নলকূপের পানি দিয়ে।
 
মোহনগঞ্জ (নেত্রকোনা) সংবাদদাতা জানান, মোহনগঞ্জের ডিঙ্গাপোতা হাওরের পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়ায় মরে ভেসে ওঠা মাছের মধ্যে ইলিশের সংখ্যা বেশি। বন্যার পানি কমে যাওয়ায় হাওরের পানির রং কালো হয়ে গেছে। তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।
 
ধর্মপাশা (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, অকাল বন্যায় সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের          কৃষকের কাঁচা ও আধাপাকা বোরো ধান তলিয়ে যাওয়ার পর হাওর পারের অনেক কৃষকই বর্ষা মৌসুমে হাওরে জাল দিয়ে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু গত দুদিন ধরে পানিতে তলিয়ে যাওয়া ফসল পচে সবগুলো হাওর থেকে পচা দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে এবং পানিতে থাকা বিভিন্ন প্রজাতির ছোট-বড় মাছসহ জলজ প্রাণীও মরে ভেসে উঠছে।
 
মত্স্য গবেষকদের মতে ওইসব হাওরে তলিয়ে যাওয়া ধান পচে পানিতে অক্সিজেনের লেভেল ১ পিপিএমের নিচে নেমে গেছে। আর অ্যামোনিয়ার মাত্রা বেড়ে শূন্য দশমিক পাঁচে উঠেছে। এ কারণেই হাওরে মাছ মারা যাচ্ছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
 
ধর্মপাশা উপজেলার বিভিন্ন হাওরে তলিয়ে যাওয়া ধান গাছ পচে মাছ মরে ভেসে ওঠার খবর পেয়ে সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার ধারাম ও কাইঞ্জা হাওরে গত বুধবার সরোজমিনে উপস্থিত হয়ে ওই দুটি হাওরের পানি পরীক্ষা করেছেন বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউট ময়মনসিংহের প্রধান কার্যালয়ের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সিরাজুম মনির ও বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. মশিউর রহমান। ওই দুজন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বলেন, হাওরে কাঁচা ধান গাছ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় তা পচে অ্যামোনিয়া নামের এক ধরনের বিষাক্ত গ্যাস তৈরি হয়েছে। এর ফলে পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা তুলনামূলকভাবে কমে গেছে। ফলে মাছ মরে পানিতে ভেসে উঠছে। হাওরের পানিতে মাছের স্বাভাবিক বিচরণের জন্য প্রতি লিটার পানিতে ৫ থেকে ৬ মিলিগ্রাম দ্রবীভূত অক্সিজেন থাকার কথা। অথচ ওই দুটি হাওরের পানি পরীক্ষা করে প্রতি লিটার পানিতে শূন্য দশমিক ৫ মিলিগ্রাম থেকে ১ মিলিগ্রাম পর্যন্ত দ্রবীভূত অক্সিজেন পাওয়া গেছে। গত বুধবার দিনের বেশিরভাগ সময় বৃষ্টি হয়েছে। এভাবে আরো বৃষ্টি হলে পানিতে মাছ বসবাসের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি হবে বলে আমরা ধারণা করছি। নমুনাসহ পানি পরীক্ষার প্রতিবেদনটি মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় পাঠানো হবে।
 
ওসমানীনগর (সিলেট) সংবাদদাতা জানান, বালাগঞ্জ-ওসমানীনগরে বোরো ফসল পানিতে তলিয়ে যাওয়ার পর এবার হাওরগুলোতে প্রতিদিনই ভেসে উঠছে মরা মাছ। এমন পরিস্থিতিতে হতবাক হয়ে পড়েছেন দুই উপজেলার মাছ চাষি ও কৃষকরা। সবকিছু পচে হাওরের পানি কালো হয়ে গেছে। এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার বালাগঞ্জ উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে আয়োজিত সংক্ষিপ্ত আলোচনায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া এমপি বীর বিক্রম বলেছেন, অকাল বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের সরকারিভাবে যথাযথ সহায়তা প্রদান করা হবে। এ ক্ষেত্রে চিন্তার কোনো কারণ নেই, আপনারা যা চাইবেন তা পাবেন। তিনি পরবর্তী বোরো ফসল কাটার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত ১০ টাকা কেজিতে চাল দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন। মন্ত্রী আরো বলেন, সিলেট বিভাগসহ আরো দুই-একটি জেলায় অকাল বন্যায় ফসলের ক্ষতি হয়েছে। তবে সারা দেশে আশাতীত ফসল উত্পাদন হয়েছে। এরফলে সরকারের পক্ষে এ দুর্যোগ কাটিয়ে উঠা কোনো ব্যাপারই না। আপনারা আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর ভরসা রাখুন, এই সরকারের আমলে কোনো মানুষ না খেয়ে মরবে না।
 
এদিকে ওসমানীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান বলেছেন, বন্যার পানিতে ভেসে উঠা এসব মাছ না খাওয়ার ব্যাপারে জনসাধারণকে সচেতন করে তুলতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে উপজেলা জুড়ে মাইকিং করা হয়েছে।
 
সিলেট অফিস জানায়, বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়া ধান পচে মাছ মারা যাওয়ার পর এখন হাঁস মারা যাচ্ছে সিলেটের বৃহত্ হাকালুকি হাওরে। স্থানীয়রা বলছেন, দূষিত মরা মাছ খেয়ে পোষা হাঁস মারা পড়ছে। এতে হাসের খামারিদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় হাকালুকি হাওরের পাশের অনেক মানুষের জীবিকা হাওরে হাঁস পালনের ওপর নির্ভরশীল। হাওরে বিচরণ করা এমন শত শত হাঁস মরে হাওরে ভেসে উঠছে।
 
কুলাউড়া উপজেলা প্রাণিসম্পাদ কর্মকর্তা ডা. সাইফুদ্দিন জানান, হাঁসের মড়ক প্রতিরোধে ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। হাওরে পশু চিকিত্সক টিম কাজ শুরু করেছে। পাশাপাশি হাওরের পানিতে হাঁস না ছাড়ার জন্য খামারিদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্স বিভাগের প্রধান ড. নাসরিন সুলতানা হাঁস ও মাছের মৃত্যুর জন্য বিষক্রিয়াকেই দায়ী করেছেন। তার মতে ধান পচে এটা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, মরা মাছ বা হাঁস খেলে মানুষের বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের ক্ষতি হতে পারে।
 
কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের সভাপতি ড. মো. শাহাবউদ্দিন বলেন, পচা মাছ থেকে বের হওয়া অ্যামোনিয়ায় হাওরের পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হয়ে পড়েছে। মরা মাছ বা পাখি কেউ যেন কোনো অবস্থাতেই খেতে না পারে সেদিকে নজর রাখা দরকার। ফেঞ্চুগঞ্জের মাইজবাগ এলাকার বাসিন্দারা জানান, পানিতে সবখানে মরা হাঁস ভাসছে। একজন খামারির দেড়শ হাঁস মারা গেছে বলে এলাকাবাসী জানান।
 
এদিকে হাকালুকিতে মাছ মড়ক বন্ধে মত্স্য অফিসের উদ্যোগে চুন ও ওষুধ ছিটানোর কাজ অব্যাহত রাখা হয়েছে। হাওরবাসী জানান, গত শনিবার রাতে কালবৈশাখীর পর বাতাসের সঙ্গে অসহনীয় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে।
এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
২১ অক্টোবর, ২০১৭ ইং
ফজর৪:৪৩
যোহর১১:৪৪
আসর৩:৫০
মাগরিব৫:৩১
এশা৬:৪৩
সূর্যোদয় - ৫:৫৮সূর্যাস্ত - ০৫:২৬