সারাদেশ | The Daily Ittefaq

নওগাঁয় উজানের পানির নিচে ফসলের জমি

নওগাঁয় উজানের পানির নিচে ফসলের জমি
নওগাঁ প্রতিনিধি১৩ আগষ্ট, ২০১৭ ইং ২০:১৫ মিঃ
নওগাঁয় উজানের পানির নিচে ফসলের জমি
 
উজান থেকে নেমে আসা পানিতে এবং তিন দিন ধরে টানা বৃষ্টিতে নওগাঁর রাণীনগর, আত্রাই, মান্দা, পত্নীতলা, বদলগাছী, ধামইরহাট ও রাণীনগর উপজেলায় তলিয়ে গেছে প্রায় ৩০ হাজার বিঘা ফসলি জমি। এতে প্রায় পাঁচশ' পরিবার পানিবন্দী হয়ে গেছে। জেলার ছয়টি নদীতে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে ধামইরহাট উপজেলায় ১৪০ সেন্টিমিটার ও মান্দায় ১০০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে সবচেয়ে বেশি বিপৎসীমার পানি প্রবাহিত হচ্ছে। মান্দায় পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় তিন নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের অন্তত ৩০টি পয়েন্ট ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
 
মান্দা: শনিবার দুপুরে মান্দা উপজেলার নুরুল্লাবাদ এলাকায় দুটি স্থানে বাঁধ ভাঙার ঘটনাটি ঘটেছে। বর্তমানে অসহায় পরিবারগুলো বিশ্ববাঁধে আশ্রয় নিয়েছে। এপর্যন্ত কোন সরকারি সাহায্য বা ত্রাণ তাদের কাছে না পৌঁছায় মানবেতর জীবন যাপন করছেন।
 
গত কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টি ও ভারত থেকে নেমে এসে আত্রাই নদীতে পানি দ্রুত বেড়ে যায়। গত রাত থেকে পানির বৃদ্ধি হতে থাকে আত্রাই নদীতে। আত্রাই নদীর উপজেলার কশব ইউনিয়নের পাজরভাঙ্গা সমির শাহর বাড়ির নিকট বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়ি বাঁধ ভেঙে ২৭৫টি পরিবার পানির নিচে নিমজ্জিত হয়েছে। এ ছাড়া দক্ষিণ চকবালু হিন্দুপাড়া নামক স্থানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধ ভেঙে গেলে ৫০-৬০টি বাড়ি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে প্রায় পাঁচ শতাধিক বিঘা জমির আমন ধানসহ অন্যান্য ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
 
এ দিকে ফকির্নি নদীর বামতীর নুরুল্লাবাদ মণ্ডলপাড়া নামকস্থানে বেড়িবাঁধ উপচে পানি পার হচ্ছে। স্থানীয়রা বাঁধটি টিকিয়ে রাখতে কাজ করে যাচ্ছে। পানিবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে বাঁধটি টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। বাঁধটি ভেঙে গেলে নুরুল্লাবাদ, কশব ও বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হবে।
 
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম প্রামাণিক জানান, বন্যায় ফসলের ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যান নিরূপণে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা রেজাউল করিম জানান, জরুরি ভিত্তিতে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করছেন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা। তালিকা হাতে পেলেই ক্ষয়ক্ষতির সঠিক তথ্য জানা যাবে।
 
বদলগাছী: উপজেলার ৮ ইউনিয়নের নিন্মাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে করে প্রায় ১৮ হাজার বিঘা জমির রোপা আমন ধান ও সবজি তলিয়ে গেছে। সদর ইউপির কাদিবাড়ী, তেজাপার, জিধিরপুর ভাতশাইল, কোমারপুর, বিলাশবাড়ী ইউপির হলুদবিহার, বলরামপুর, দুধকুড়ী, কাশিমালা, ভগবানপুর, বারফালা, লক্ষ্মীপুর, হাজিপুর, জোলাপাড়া, আধাইপুর ইউপির কামালপুর, চকআলম, চকবনমালী, দেউলিয়া, কাষ্টডোব, বেগুনজোয়ার, বৈকন্ঠপুর, সত্যপাড়া, পাত্রড়াবাড়ীসহ বেশ কিছু মাঠের জমি তলিয়ে গেছে। ওই সব এলাকার কৃষকেরা তলিয়ে যাওয়া রোপা আমন ধান ও সবজি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন।
 
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে এ পর্যন্ত উপজেলার আট ইউনিয়নের ১৮ হাজার বিঘা জমির রোপা আমন ধান ও সবজি তলিয়ে হয়েছে।
 
বদলগাছী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হাসান আলী জানান এখনো রোপা আমন ধান চাষাবাদ শেষ হয়নি এর মধ্যে অতিবর্ষণে প্রায় সাড়ে ১৬ শত হেক্টর জমির রোপা আমন তলিয়ে গেছে এবং ৫৮০ হেক্টর জমির আংশিক তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা হয়েছে। সবজি চাষে তলিয়ে গেছে প্রায় ২৫০ হেক্টর। তবে দু-এক দিনের মধ্যে পানি নেমে গেলে ক্ষতির আশংকা নেই।
 
আত্রাই: উপজেলায় মনিয়ারী, ভোঁপাড়া, বিশা, পাঁচুপুর ও শাহাগোলাসহ ৮ ইউনিয়নে ৮ হাজার হেক্টর জমিতে আমন চাষ  করা হয়েছে।  গত তিন দিনের অবিরাম বর্ষণে ও উজান থেকে নেমে আসা পানির তোড়ে হঠাৎ করে আত্রাই নদীর পানি আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। গতকাল রবিবার আত্রাই নদীর পানি বিপদসীমা উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। উপজেলার বিভিন্ন স্থানে নাজুক পরিস্থিতি রয়েছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের। এ জন্য কৃষকরাও রয়েছে চরম আতঙ্কে। এদিকে নদীর পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে উপজেলার উদনপৈ, জাতোপাড়া, মিরাপুর, ফুলবাড়ি, জাতআমরুল জিয়ানীপাড়াসহ প্রায় ২৫টি গ্রামের লোকজন পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
 
উদনপৈ গ্রামের ইউপি সদস্য জিল্লুর রহমান বলেন, নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে আমরা পানিবন্দী হয়ে পড়েছি। আমাদের সন্তানদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত কষ্টকর হয়ে পড়েছে।
 
ইউপি সদস্য আব্দুল মজিদ মল্লিক বলেন, ২০১৫ সালে উপজেলার ফুলবাড়িতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙ্গে গেলেও তা আজও সংস্কার করা হয়নি। পরপর দুই বছর প্রায় ৭০ লাখ টাকা বরাদ্ধ করে খরচ করা হলেও সম্পন্ন নিরাপদ ভাবে রাস্তাটি নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। এটি এখন এলাকাবাসীর জন্য মরণ ফাঁদ হয়েছে।
 
আত্রাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোখলেছুর রহমান বলেন, আত্রাইয়ের বন্যা পরিস্থিতি আমরা নিবিরভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। সকল জনপ্রতিনিধিদের সজাদ থাকতে বলা হয়েছে। কোন জায়গায় যেন বাঁধ ভেঙ্গে জনগণের জানমালের ক্ষতি না হয় এ জন্য আমরা সজাগ দৃষ্টি রাখছি।
 
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডেও নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন জানান, জেলার আত্রাই, তুলসী গঙ্গা, ছোট যমুনা, পূর্ণভবাসহ ছয়টি নদীতে ব্যাপক পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে ধামইরহাট উপজেলায় আত্রাই নদীর পানি বিপদ সীমার ১৪০ সেন্টিমিটার ও মান্দা একশ’ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো নজরে রাখা হয়েছে। আশা করেন দ্রুত পানি নেমে গেলে বাঁধের আর কোন ক্ষয়ক্ষতি হবে না।
 
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মনোজিত সরকার মল্লিক জানান, জেলার রাণীনগর, আত্রাই, মান্দা, পত্নীতলা, বদলগাছী, ধামইরহাট ও রাণীনগর উপজেলায় তলিয়ে গেছে প্রায় ৩০ হাজার বিঘা ফসলি জমি। এতে প্রায় পাঁচশ' পরিবার পানিবন্দী হয়ে গেছে। ভেসে গেছে প্রায় দেড়শ' পুকুর। এতে প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। পানি দ্রুত নেমে গেলে ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেয়া সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন এই কৃষিবিদ।
 
জেলা প্রশাসক ড. আমিনুর রহমান জানান, ইত্যে মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে যাতে বন্যা কবলিত খোঁজখবর রাখা হয়। এ ছাড়া দ্রুত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করার জন্যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সরকারের নির্দেশ রয়েছে বন্যা কবলিত কোন লোকের সমস্যা না হয়। এ সব লোকর মধ্যে দ্রুত ত্রাণ পাঠানো সম্ভব হবে।
 
ইত্তেফাক/জামান
এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
১৭ নভেম্বর, ২০১৭ ইং
ফজর৫:১৩
যোহর১১:৫৫
আসর৩:৩৯
মাগরিব৫:১৮
এশা৬:৩৬
সূর্যোদয় - ৬:৩৪সূর্যাস্ত - ০৫:১৩