সারাদেশ | The Daily Ittefaq

তওবা পড়িয়ে ১০১ দোররা, প্রাণ গেল গৃহবধূর

তওবা পড়িয়ে ১০১ দোররা, প্রাণ গেল গৃহবধূর
ঠাকুরগাঁওয়ে গ্রাম্য শালিসে মধ্যযুগীয় নির্যাতন, গ্রেফতার ১
ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি২৯ ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং ১২:০৯ মিঃ
তওবা পড়িয়ে ১০১ দোররা, প্রাণ গেল গৃহবধূর
 
ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলায় যৌতুক না পেয়ে এক গৃহবধূকে গ্রাম্য সালিশে পরকীয়ার অপবাদ দিয়ে ১০১টি দোররা মেরে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। গত ২০ ডিসেম্বর উপজেলার বালিয়াপুকুর গ্রামে এ মধ্যযুগীয় ঘটনা ঘটলেও সম্প্রতি ঘটনাটি প্রকাশ পায়। নিহত মৌসুমী আক্তার (২৩) উপজেলার আমগাঁও ইউনিয়নের খামার এলাকার মৃত হবিবর রহমানের মেয়ে।
 
এ ব্যাপারে নিহতের বোন ফিরোজা বেগম বাদী হয়ে সাতজনের নাম উল্লেখ করে গত ২১ ডিসেম্বর বিকেলে হরিপুর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। গত বুধবার সালিশকারীদের অন্যতম কাজি আবুল কালামকে গ্রেফতার করে পুলিশ। বাকিদেরও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। এ ঘটনায় থানায় অপমৃত্যুর মামলা হলেও বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার ফারহাত আহমেদ।
 
ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালে গত ২৩ ডিসেম্বর মৌসুমীর লাশের ময়নাতদন্ত হয়েছে। হাসপাতালের একটি সূত্র জানায়, মৌসুমীর শরীরে দোররার আঘাতের একাধিক চিহ্ন ছিল। এ ব্যাপারে হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. সুব্রত কুমার সেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ঘটনায় একটি মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।
 
নিহতের স্বজন ও স্থানীয় লোকজন জানান, ৯ মাস আগে হরিপুরের চৌরঙ্গী বাজার বালিয়াপুকুর গ্রামের মৃত সাদেকের বড় ছেলে জাহাঙ্গীরের সঙ্গে মৌসুমীর বিয়ে হয়। বিয়ের সময় জাহাঙ্গীরকে যৌতুক হিসেবে নগদ ৩০ হাজার টাকা ও অন্যান্য সামগ্রী দেওয়া হয়। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই জাহাঙ্গীর যৌতুক হিসেবে মৌসুমীর পরিবারের কাছ থেকে আরো এক লাখ টাকা দাবি করে। এ জন্য জাহাঙ্গীর প্রায়ই মৌসুমীকে মারপিট করে বাপের বাড়িতে পাঠিয়ে দিত।
 
মৌসুমীর বড় ভাই জিন্নাত বলেন, এক লাখ টাকা যৌতুক দাবিতে গত ১৬ ডিসেম্বর মৌসুমীকে মারপিট করে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয় জাহাঙ্গীর। সর্বশেষ ২০ ডিসেম্বর কৌশলে মৌসুমীকে তার বাসায় ফিরিয়ে নিয়ে যায় এবং মিথ্যা অপবাদ দিয়ে সালিশ বসায়। সালিশে গ্রামের কাজি আবুল কালাম, আব্দুল কাদের, সাবেক ইউপি সদস্য জামালসহ আরো অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
 
সালিশের এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, রাত ১১টায় জাহাঙ্গীরের বাসায় গ্রাম্য সালিশ বসিয়ে কাজি আবুল কালামের নির্দেশে 'ইসলামী শরিয়ত মোতাবেক' মৌসুমীকে তওবা পড়ানো হয়। এরপর ১০১ দোররা মারা হয়। তখন মৌসুমীর চিৎকারে তিনি ও আশপাশের অনেকে ছুটে আসেন ওই বাড়িতে। কিন্তু গ্রাম্য মাতব্বরদের বিরুদ্ধে কেউ কোনো প্রতিবাদ করার সাহস পায়নি। তিনি আরো জানান, অমানবিক নির্যাতন সইতে না পেরে মৌসুমী বেশ কয়েকবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু জ্ঞান ফিরলে তাকে আবার দোররা মারা হয়। এরপর অসুস্থ অবস্থায় অনেকটা বিনাচিকিৎসায় পরদিন ২১ ডিসেম্বর মৌসুমী ওই বাড়িতেই মারা যান।
 
নিহতের দুলাভাই আবেদ আলী বলেন, ঘটনা ধামাচাপা দিতে মৌসুমীর পরিবারকে জানানো হয় যে, সে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। অথচ যেদিন মৌসুমীর মৃত্যু হয় সেদিন স্থানীয় এক সারের ডিলারের দোকানে বৈঠক করে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। টাকা দিয়ে পুলিশকে ম্যানেজ করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
 
মৌসুমীর বড় বোন হাসিনা বেগম ও ফিরোজা বেগম জানান, মৌসুমীর মৃত্যুর ঘটনায় তার স্বামী জাহাঙ্গীর ও দেবর হাসিবুল এবং কাজি আবুল কালাম, আব্দুল কাদের, সাবেক ইউপি সদস্য জামাল, মো. তরিকুল ও মৌসুমীর চাচি মোছা ফরকুন বেগমের নাম উল্লেখ করে ২১ ডিসেম্বর বিকালে তিনি থানায় একটি হত্যা মামলার এজাহার দেন। কিন্তু পুলিশ তা অপমৃত্যু মামলা হিসেবে নিয়েছে।
 
ইত্তেফাক/জামান
এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
ফজর৪:৩৪
যোহর১১:৫১
আসর৪:১১
মাগরিব৫:৫৪
এশা৭:০৭
সূর্যোদয় - ৫:৪৮সূর্যাস্ত - ০৫:৪৯