সারাদেশ | The Daily Ittefaq

গাজীপুর সিটি নির্বাচনের প্রচারণায় ছন্দপতন

গাজীপুর সিটি নির্বাচনের প্রচারণায় ছন্দপতন
বিশ্বকাপ, ঈদ ও আদালতের স্থগিতাদেশের প্রভাব
শামছুদ্দীন আহমেদ২২ জুন, ২০১৮ ইং ০৩:০৮ মিঃ
গাজীপুর সিটি নির্বাচনের প্রচারণায় ছন্দপতন
আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে মাঝখানে প্রায় দেড় মাসের মতো নির্বাচনী কার্যক্রম বন্ধ থাকায় দৃশ্যমান ছন্দপতন ঘটেছে আর মাত্র তিনদিন পর অনুষ্ঠেয় গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রচারণায়। স্থগিত হবার আগে এই নির্বাচনকে ঘিরে প্রায় দেশজুড়ে জাতীয় রাজনীতিতে যে ধরনের উত্তেজনা দেখা দিয়েছিল বর্তমানে তা অনেকটাই নিরুত্তাপ। নির্বাচনে প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দল- ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রকাশ্য গুরুত্ব প্রদানেও কিছুটা ঘাটতি লক্ষ্যণীয়। যে কারণে দল দুটির কেন্দ্র থেকে নেতারাও আগের মতো এখন আর পালা করে গাজীপুরে ছুটছেন না।
 
আদালতের স্থগিতাদেশ উঠে যাওয়ার পর এবং নতুন ভোটগ্রহণের তারিখের আগে গত সোমবার থেকে নতুন করে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা ফের শুরু হলেও রোজার ঈদের ছুটিও প্রভাব ফেলেছে গাজীপুর সিটির ভোটে। অন্যদিকে চলমান বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনাও এই ভোটে বড় রকমের প্রভাব সৃষ্টি করেছে। ভোটের চেয়ে ভোটারদের বেশি আগ্রহ বিশ্বকাপের দিকে। আরও মোটা দাগে দেখলে যে বিষয়টি অনেকটা স্পষ্ট তা হচ্ছে- গত ১৫ মে অনুষ্ঠিত খুলনা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের ফলাফলের কারণেও গাজীপুরের ভোটের ক্ষেত্রে আগ্রহে এক ধরনের ভাটা পড়েছে বিএনপির। 
 
আদালতের স্থগিতাদেশ, ঈদ ও বিশ্বকাপ ফুটবলের কারণে প্রচারণায় ছন্দপতন ঘটলেও গাজীপুর সিটি করপোরেশন এলাকায় ভোটের প্রশমিত উত্তেজনা লক্ষ্যণীয়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ বিভিন্ন দলের মেয়র প্রার্থীরা প্রচার-প্রচারণায় ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন, দলীয় নেতা-কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে নিয়ে তারা অবিরাম ছুটছেন ভোটারদের দুয়ারে। পুরো করপোরেশন এলাকায় নতুন করে ঝোলানো হয়েছে পোস্টার। এখনও পোষ্টার লাগানোর কাজ চলছে। অলি-গলিতে চলছে মাইকিং। সর্বত্রই দিনভর খ্ল-খ্ল মিছিল চোখে পড়ছে। স্থানীয় অফিস-আদালত ও চায়ের দোকানে বিশ্বকাপের উত্তেজনার সঙ্গে সরব আলোচনার চলছে ভোট নিয়েও।
 
গত ১৫ মে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। নির্বাচনের প্রচারও জমে উঠেছিল বেশ। রাজধানীর উপকণ্ঠে হওয়ায় গাজীপুরের ভোটের উত্তেজনা তখন ছড়িয়ে পড়েছিল ঢাকাসহ প্রায় সারাদেশে। ৬ মে তিন মাসের জন্য সেই নির্বাচন স্থগিত করেন হাইকোর্ট। এরপর ১০ মে হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করেন সর্বোচ্চ আদালত, একইসঙ্গে ২৮ জুনের মধ্যে ভোটগ্রহণের সময়ও বেঁধে দেন। এরপর ১৩ মে নতুন করে ২৬ জুন ভোটের তারিখ ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ১৮ জুন থেকে নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর নির্দেশনা দেয়া হয়।
 
আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে দেড় মাসের কিছু কম সময় প্রচারণা বন্ধ থাকলেও একদম বসে থাকেননি আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম ও বিএনপির মেয়র প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার। ভিন্ন কৌশলে সীমিত পরিসরে তারা প্রচারণা চালিয়েছেন। বিশেষ করে রোজায় প্রায় প্রতিদিন সিটি করপোরেশন এলাকায় ইফতার পার্টির মাধ্যমে তারা অনানুষ্ঠানিক প্রচারণা চালিয়েছেন। ঈদেরদিন ও এরপরেও ভোটারদের সঙ্গে ঈদশুভেচ্ছা বিনিময়ের মাধ্যমে কার্যত ভোটের কাজ করেছেন।
 
আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কেন্দ্রীয় পর্যায়ে কথা বলে জানা গেছে, খুলনা সিটি করপোরেশনের ভোটের অভিজ্ঞতাকে নিজেদের আলোকে গাজীপুরে কাজে লাগাতে চায় দুই পক্ষই। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক যোগাযোগ ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, খুলনায় যেভাবে সুষ্ঠু ভোট হয়েছে-একইভাবে গাজীপুরেও অবাধ ভোট হবে; উন্নয়নের লক্ষ্যে ভোটাররা ‘নৌকা’ প্রতীককেই বেছে নেবে। অন্যদিকে, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, খুলনার মতো ষড়যন্ত্রের ভোট গাজীপুরে হতে দেয়া হবে না। সুষ্ঠু ভোট হলে ভোটাররা ‘ধানের শীষ’ প্রতীকেই ভোট দেবে। কারণ জনগণ তাদের ভোটাধিকার ফিরে পেতে চায়। বিএনপির মেয়র প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, খুলনা আর গাজীপুর এক নয়, খুলনার মতো গাজীপুরেও প্রহসনের চেষ্টা করা হলে গাজীপুরবাসী রুখে দাঁড়াবে।
 
এদিকে, ঈদের ছুটি কাটাতে গ্রামে যাওয়া শ্রমিকরা কাজে ফিরতে শুরু করেছেন। তবে অনেকেই এখনও গ্রামের বাড়িতে। ভোটের আগে শ্রমিকদের ফেরাতে মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা নিজেদের মতো করে তত্পরতা চালাচ্ছেন। প্রার্থী ও তাদের সহকারীরা শ্রমিক নেতা ও শিল্প-কারখানার মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন, যেন শ্রমিকরা দ্রুত কাজে ফিরে ভোটেরদিন ভোটকেন্দ্রে ভোট দিতে পারেন।
 
গাজীপুর সিটি নির্বাচনে মোট ভোটার ১১ লাখ ৩৭ হাজার ৭৩৬ জন। এরমধ্যে শ্রমিক রয়েছেন দুই লাখের কাছাকাছি। গাজীপুর ভোটের ফলাফলে শ্রমিকদের ভোট বড় ফ্যাক্টর হিসাবে কাজ করে বরাবরই। জানা গেছে, ঈদের ছুটি শেষে গাজীপুর শহরের বিভিন্ন কল-কারখানা খুলবে আগামীকাল শনিবার ও পরশু রবিবার। সিটি করপোরেশন এলাকায় পাঁচ শতাধিক পোশাক কারখানা রয়েছে। টঙ্গী ও কোনাবাড়ি এলাকায় বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) দুটি শিল্পনগরীও রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের হাল্কা-মাঝারি শিল্প-কারখানাও আছে সিটি এলাকায়।
 
আদালতের স্থতিগাদেশের আগে, অর্থাত্ গত ১৫ মে গাজীপুরের ভোটকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগসহ ১৪ দল এবং বিএনপিসহ ২০ দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকে বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ হয়ে দলীয় মেয়র প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিতে পালা করে গাজীপুরে গেছেন। তবে নতুন করে প্রচারণা শুরু হওয়ার পর সেই দৃশ্যে বড় ধরনের ছন্দপতন স্পষ্ট। অবশ্য মঙ্গলবার গাজীপুরে দলীয় মেয়র প্রার্থী হাসান সরকারের পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন ও শামা ওবায়েদ, কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুস সালাম আজদ প্রমুখ। আর একইদিন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী জাহাঙ্গীরের পক্ষে প্রচারণায় অংশ নেন গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আজমত উল্লা খান ও সহ-সভাপতি আফজাল হোসেন সরকার এবং যুবলীগের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি সেলিম আজাদ প্রমূখ। তবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিভিন্ন স্তরের নেতাদের ঢাকা থেকে গাজীপুরে ছোটার ঢল আগের মতো এবার দেখা যাচ্ছে না।
 
জাহঙ্গীর ও হাসানের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ আর উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি
 
এদিকে, ভোটের সময় যতোই ঘনিয়ে আসছে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী দুই মেয়র প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম ও হাসান উদ্দিন সরকার পাল্টাপাল্টি অভিযোগের প্রতিযোগিতায় মেতেছেন। একইসঙ্গে ভোটারদের মন পেতে দু’জনই দিচ্ছেন উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি।
 
গতকাল বৃহস্পতিবার নগরীর ২৩ নম্বর ওয়ার্ড শিমুলতলী এলাকায় পথসভায় জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘বিএনপি শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টারের খুনির ভাইকে মনোনয়ন দিয়েছে। বিএনপি খুনির পরিবারকে প্রশ্রয় দিয়েছে। এতেই প্রমাণ হয় বিএনপি সংঘর্ষ এবং খুনের রাজনীতি করে।’
 
আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী বলেন, ‘বিএনপি প্রার্থী পাঁচবার জনপ্রতিনিধি হয়েও এলাকার কোনও উন্নয়ন করতে পারেননি। নিজের পরিবারের ভাগ্যের পরিবর্তন করেছেন। আমি গাজীপুরবাসীকে কথা দিচ্ছি, নির্বাচিত হলে প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা নিয়ে জমি-দোকান স্থায়ীভাবে দরিদ্রদের নামে বরাদ্দের ব্যবস্থা করবো।’
 
অন্যদিকে, বিএনপির মেয়র প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার গতকাল আঞ্চলিক নির্বাচন ও রিটার্নিং কর্মকর্তা রকিব উদ্দিন মণ্ডলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। সাক্ষাতে তিনি রিটার্নিং কর্মকর্তাকে অভিযোগ করেন, সরকার স্থানীয় প্রশাসন দিয়ে তার দলের নেতাকর্মীকে হয়রানি ও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। ৭-৮ জন নেতাকর্মীকে বুধবার গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এতে তার প্রচার-প্রচারণা ব্যাহত হচ্ছে বলে জানান। এই অভিযোগ আমলে নিয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা জেলা প্রশাসন, স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ও প্রধান নির্বাচন কমিশনের কাছে তদন্তের জন্য জরুরিভাবে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সুপারিশ করেন। গতকাল বিভিন্ন পথসভায় হাসান সরকার বলেন, তিনি নির্বাচিত হতে পারলে গাজীপুর সিটি করপোরেশনকে সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত করবেন।
 
ইত্তেফাক/কেআই
এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
২৩ জুলাই, ২০১৮ ইং
ফজর৩:৫৯
যোহর১২:০৫
আসর৪:৪৪
মাগরিব৬:৪৯
এশা৮:১০
সূর্যোদয় - ৫:২৪সূর্যাস্ত - ০৬:৪৪