সারাদেশ | The Daily Ittefaq

স্কুলের বারান্দায় অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের ৮ বছর

স্কুলের বারান্দায় অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের ৮ বছর
স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী০৩ আগষ্ট, ২০১৮ ইং ২৩:৫৭ মিঃ
স্কুলের বারান্দায় অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের ৮ বছর

প্রায় ৮ বছর ধরে রাজশাহীর উপশহর স্যাটেলাইট টাউন হাইস্কুলের বারান্দায় রাত কাটাচ্ছেন স্কুলটির অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মাজাহার হোসেন। এ স্কুলেরই প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক ছিলেন তিনি। ৮৫ বছর বয়সে স্ত্রী, সন্তানদের সান্নিধ্যে থাকার সৌভাগ্য হচ্ছে না তাঁর।

জানা গেছে, ২৮ বছর শিক্ষকতা শেষে ১৯৯৮ সালের ৫ এপ্রিল মাজাহার হোসেন অবসরে যান। তখনো অবসর সহায়তা চালু না হওয়ায় তাকে শূন্য হাতেই ফিরতে হয়। ফলে অর্থ সংকটে বিপর্যয় নেমে আসে তার অবসর জীবনে। এছাড়া ছেলেরাও দায়িত্ব নেয়নি অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বাবার। বাধ্য হয়ে একাকী জীবন কাটাতে নেমে পড়েন তিনি। ২০১০ সালের শেষ দিকে এসে উঠেন নিজ স্যাটেলাইট টাউন হাইস্কুলের ল্যাবরেটরি কক্ষের বারান্দায়। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষায় স্বজনহীন কত রাত যে স্কুলেই কাটিয়েছেন, সে হিসাব রাখেননি তিনি।

গত বৃহস্পতিবার দুপুরে কথা হয় মাজাহার হোসেনের সঙ্গে। স্কুলের বারান্দার মেঝেতে পাতা বিছানায় বসে খাতায় কী যেন লিখছিলেন তিনি। নাম ধরে ডাকতেই মাথা উঁচু করে তাকান। কী লিখছেন? জিজ্ঞাসার জবাবে বলেন, রোজকার হিসেব। কবে কে কয় টাকা দিয়েছেন, কয় টাকা কোথায় খরচ হয়েছে, সে হিসেব তুলে রাখেন প্রতিদিন। সপ্তাহ শেষে টানেন জের। এভাবে দিন কাটছে তার।

নিজের মুখে বলেন, দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে থাকতেন নগরীর বিনোদপুর এলাকার বাসায়। ওই বাড়িতে বর্তমানে ছোট ছেলে আসাদুজ্জামান আপেল মাকে নিয়ে থাকলেও ঠাঁই হয়নি বাবার। আপেল নগরীর একটি বেসরকারি কলেজের গণিতের শিক্ষক।

বড় ছেলে আক্তারুজ্জামান মুকুল শুরুতে বাবার স্কুলে যোগদান করেছিলেন। কিছুদিনের মধ্যে চাকরি ছেড়ে কোচিং সেন্টার খোলেন। কয়েক বছর পর কোচিং সেন্টারও বন্ধ করে দেন। এখন কি করেন, সেটি জানেন না বাবা মাজাহার। তবে তিনি জানেন, নগরীর নিউমার্কেট এলাকার আলিসান ভবনের তৃতীয় তলায় পরিবার নিয়ে থাকেন মুকুল। বৃদ্ধ বাবা সিঁড়ি ভেঙে উঠতে পারেন না। ফলে বাধ্য হয়ে ছেলের বাড়ি ছাড়েন মাজাহার হোসেন।

তিনি বলেন, বড় ছেলে কেবল খাবার দিয়ে দায় সেরেছে। প্রতিদিন খাবারের জন্য নগরীর নিউমার্কেটের সামনে বসে থাকতে হয়। সেখানে খাবার পাঠিয়ে দেয় ছেলে। সেই খাবার নিয়ে হেঁটে ফেরেন স্কুলে। এর বাইরে বড় ছেলের আর কোনো দায়িত্ব নেই।

ছোট ছেলে কখনো খোঁজ নেন না। একমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়েছে খুলনায়। জামাইয়ের কাপরের ব্যবসা রয়েছে সেখানে। বছরে দু-একবার আসে মেয়ে। স্কুলে এসে দেখা করে যায়। যাবার সময় কিছু টাকা হাতে গুঁজে দিয়ে যায়।

তিনি আরও বলেন, আমার প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা অনেকেই প্রতিষ্ঠিত। তারা আমার এ অবস্থার খবর জেনেছেন। দীর্ঘদিন ধরেই তারা নানানভাবে সহায়তা করে আসছেন। কথায় কথায় সময় গড়িয়ে যায়। চোখের কোণে জল চিকচিক করে ওঠে এই শিক্ষকের।

তিনি বলেন, এক সময় ছেলে-মেয়েদের নিয়ে সুখেই সংসার করেছেন। সেই ছেলে-মেয়েরা এখন আলাদা। ২০ বছরের বেশি সময় ধরে স্ত্রীর সান্নিধ্য পাননি তিনি। ছোট ছেলে দায়িত্ব নিয়েছে মায়ের, বড় ছেলে নিয়েছে আমার।

২০১০ সালের দিকে পেটের অসুখে আক্রান্ত হন তিনি। এরপর থেকে ছেলের বহুতল বাসায় আর উঠতে পারেন না। ছেলেও বাবার জন্য বদল করেননি বাসা। বাধ্য হয়ে তাকেই পথে নামতে হয়েছে। প্রথম দিকে নিউমার্কেটের একটি দোকানের সামনে রাত কাটাতেন। পরে নিজ হাতে গড়া স্কুলেই উঠেছেন।

ইতোমধ্যে বয়সের কারণে ন্যুয়ে পড়া দেহে বাসা বেঁধেছে নানা রোগ। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে হার্নিয়ায় আক্রান্ত। চিকিৎসক অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দিয়েছেন। এজন্য প্রয়োজন ২০ হাজার টাকা। কিন্তু টাকার জোগাড় না হওয়ায় শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছেন রোগ। একসময় হোমিও চিকিৎসা শুরু করেন। কিন্তু প্রতিকার মেলেনি। জীবনের শেষ বেলায় এসে অসহায় আত্মসমর্পণ এই মানুষ গড়ার কারিগরের।

ইত্তেফাক/নূহু

এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
ফজর৪:৩২
যোহর১১:৫৩
আসর৪:১৬
মাগরিব৬:০১
এশা৭:১৩
সূর্যোদয় - ৫:৪৬সূর্যাস্ত - ০৫:৫৬