সারাদেশ | The Daily Ittefaq

সবজি চারার রাজধানী বগুড়ার শাহনগর

সবজি চারার রাজধানী বগুড়ার শাহনগর
স্টাফ রিপোর্টার, বগুড়া০৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং ১৭:৫০ মিঃ
সবজি চারার রাজধানী বগুড়ার শাহনগর
সবজি চারার রাজধানী খ্যাত বগুড়ার শাহনগরে শতাধিক নার্সারি মালিক সবজির চারা উৎপাদন করে নিজেদের ভাগ্যোন্নয়ন করেছেন। প্রায় ২০ জেলার অর্ধ লক্ষাধিক কৃষক বগুড়া থেকে সবজির চারা নিয়ে চাষাবাদ করে থাকেন।
 
বগুড়ার শাজাহানপুরের কামারপাড়া গ্রামের হালিম নার্সারির স্বত্বাধিকারী আব্দুল আলীম ছোট বেলায় স্বপ্ন দেখেন পড়ালেখা করে উচ্চ ডিগ্রি নিয়ে কোন সরকারি চাকরি করবেন। তিনি ২০১৬ সালে বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজ থেকে রাষ্ট্র বিজ্ঞানে মাস্টার্স করলেও দেশের চাকরির বাজার মন্দার কারণে তার স্বপ্ন পূরণ হয়নি ঠিকই। তবে চাকরি জোগাড় করতে না পারলেও তা নিয়ে আফসোস করেন না আব্দুল আলীম। কারণ তিনি একজন গর্বিত নার্সারি মালিক হতে পেরেছেন। 
 
বিগত ২০০০ সালে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় আব্দুল আলীমের নেশা ছিল তার পারিবারিক জমিতে সবজির চারা উৎপাদন করা। ওই সময় তাদের বাড়ির পাশে নিজস্ব জমিতে চাষাবাদের জন্য প্রথমে ১ শতাংশ জমিতে সবজির চারা উৎপাদন দিয়ে শুরু করেন। পড়ালেখার পাশাপাশি তিনি অন্যের জমি নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে চারা উৎপাদন করতে থাকেন।  এভাবে পথ চলতে চলতে বর্তমানে তিনি প্রায় ২ বিঘা জমিতে চারা উৎপাদন করে একজন সফল সবজির চারা নার্সারি মালিক হয়ে তার সংসারে সচ্ছলতা এনেছেন।
 
এ পরিমাণ জমিতে সবজির চারা উৎপাদন করে সব খরচ বাদ দিয়ে প্রতি মৌসুমে তার দেড় থেকে দুই লাখ টাকা আয় হয়। এ ছাড়াও তিনি অন্যান্য ফসলও চাষাবাদ করে থাকেন।
 
আব্দুল আলিম ছাড়াও সবজির চারা উৎপাদন করে সফলতা পেয়েছেন শাহ নগরের খোরশেদ আলম নজরুল ইসলাম, ফারুক আহম্মেদ, মমিনুল ইসলামসহ শতাধিক সবজি নার্সারি মালিক। এসব নার্সারিতে মরিচ, ফুলকপি, বাধা কপি, টমেটো, বেগুন, পেপে, শালগম, পিয়াজ, বিভিন্ন শাক-সবজির চারা উৎপাদন করা হয়ে থাকে। বগুড়ার শাজাহানপুরের খোট্রাপাড়া ইউনিয়নের শাহ নগর, বড় পাথার, দরিকুল্লা, চুপিনগর, বোহাইল, চোপি নগর, কামার পাড়া, মোস্তাইলসহ প্রায় ১২টি গ্রামের ৪ শ’ বিঘার বেশি জমিতে সবজির চারা উৎপাদন হয়ে থাকে। 
 
বগুড়ার বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও গাইবান্ধা, রংপুর, দিনাজপুর, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও, নাটোর, পাবনা, মানিকগঞ্জ, জামালপুরসহ ২০টির অধিক জেলার কৃষকরা এসব সবজির চারা নিতে আসেন। বিশেষ করে চর অঞ্চলের কৃষকরাই বেশি চারা নেন। কারণ চর অঞ্চলে বর্ষা ও বন্যার পানি সরে যেতে বেশি সময় লাগে ফলে তারা সবজির চারা উৎপাদন করতে পারেন না। এসব কারণে চরাঞ্চলের কৃষকরা তৈরি চারার উপরই বেশি নির্ভর করে থাকে।
 
এসব নার্সারি মালিকদের সমন্বয়ে শতাধিক মালিকদের নিয়ে শাহনগরে গড়ে তোলা হয়েছে নার্সারি মালিক সমিতি। এ সমিতির সদস্য সংখ্যা শতাধিক। এসব নার্সারিতে প্রতি মৌসুমে দেশের প্রায় ২০টি জেলা থেকে সবজির চারা নিতে বগুড়ার শাহনগরে প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক কৃষকের আগমন ঘটে। জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল হওয়ায় এখানে সবজির চারা নিতে এসে বিভিন্ন সমস্যায় পড়তে হয় কৃষকদের। বিশেষ করে দূর দূরান্ত থেকে আসা কৃষকদের থাকা খাওয়ার সমস্যা প্রকটভাবে হয়। আর এ সমস্যা দূর করতে সমিতির সদস্যরা একটি নিয়ম করেছেন। তা হলো, যে নার্সারি থেকে কৃষকরা সবজির চারা নিতে এসে সমস্যার সম্মুখীন হবেন সেই নার্সারি মালিক ওই কৃষকের থাকা বা খাবার ব্যবস্থা করে থাকেন। এ ছাড়াও চারা নিয়ে যাওয়ার জন্য যমুনা নদীর ঘাট পর্যন্ত এবং মহাসড়ক পর্যন্ত সবজির চারা নিতে আসা কৃষকদের পরিবহনে সহযোগিতা করে থাকেন নার্সারি মালিকরা। 
 
কাজীপুর উপজেলার নাটুয়ার পাড়া চরের কৃষক জহুরুল ইসলাম বলেন, বগুড়ার শাহনগর থেকে সবজির চারা নিয়ে আমরা খুবই উপকৃত হয়ে থাকি। কারণ চরের পানি সরে যেতে সময় বেশি লাগার কারণে চরের কৃষকরা চারা তৈরির সময় পায় না। তাই তারা তৈরিকৃত চারা নিয়ে এসেই জমিতে আবাদ করতে পারে। 
 
রংপুরের গঙ্গাচরা থানার ফারাজী জয়দেব গ্রামের কৃষক মো. ফজর আলী জানান, বগুড়ার শাহ নগর থেকে সবজির চারার মূল্য অনেক কম দাম পড়ে এবং ফলনও ভাল হয়। বিশেষ করে এ অঞ্চলের শত শত কৃষক মরিচসহ বিভিন্ন সবজির চারা নিয়ে এসে উপকৃত হয়ে থাকে। 
 
ঠাকুরগাঁওয়ের সাসলা পিয়ালা গ্রামের কৃষক মমিনুল ইসলাম বলেন, বগুড়ার সবজির চারা উন্নতমানের। আমরা প্রতিবছরই সেখান থেকে চারা নিয়ে এসে চাষাবাদ করে থাকি। 
 
সারিয়াকান্দি উপজেলার চর টেংরাকুড়া গ্রামের কৃষক কালু মিয়া বলেন, তিনি এবার বগুড়ার শাহ নগর থেকে সবজির চারা নিয়ে এসে ৪ বিঘা জমিতে ফসলের আবাদ করেছি। আমাদের এসব চরাঞ্চলের শত শত কৃষক শাহ নগর থেকে সবজির চারা নিয়ে এসে আবাদ করে থাকেন। চরের মানুষের যাতায়াতের একমাত্র নৌপথ হওয়ায় শাহ নগর থেকে যমুনার ঘাট পর্যন্ত সিএনজিতে এসে নৌকায় করে আমরা চারা নিয়ে আসি।
 
শাহ নগর নার্সারি মালিক সমিতির সভাপতি মো. আমজাদ হোসেন বলেন, সবজির চারা উৎপাদনে শিল্প নগরী হিসেবে গড়ে উঠেছে এ অঞ্চল। অনেক কৃষককে এখন আর চারা উৎপাদনে সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হয় না। তারা শুধু জমি প্রস্তুত করেই সবজির চারা লাগাতে পারেন। এতে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই তারা সবজি উৎপাদন করে থাকেন। আগে বীজ পেতে খুব সমস্যা হতো। এখন সে সমস্যা নেই বললেই চলে। কারণ দেশি,বিদেশি অনেক বীজ কোম্পানির প্রতিনিধিরা এখানে এসে আমাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করে তারা বীজ সরবরাহ করে থাকে। তাছাড়া কৃষি বিভাগও সব সময় আমাদেরকে সহযোগিতা করে থাকে। 
 
ইত্তেফাক/জেডএইচ
এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
ফজর৪:৩৩
যোহর১১:৫২
আসর৪:১৩
মাগরিব৫:৫৭
এশা৭:১০
সূর্যোদয় - ৫:৪৭সূর্যাস্ত - ০৫:৫২