বিশ্ব সংবাদ | The Daily Ittefaq

‘বিশেষ বন্ধনে’ ট্রাম্প-কিম

‘বিশেষ বন্ধনে’ ট্রাম্প-কিম
শিফারুল শেখ১৩ জুন, ২০১৮ ইং ০২:৫৭ মিঃ
‘বিশেষ বন্ধনে’ ট্রাম্প-কিম

বন্ধুত্বের বার্তা নিয়ে যৌথ ঘোষণায় স্বাক্ষর করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং উত্তর কোরিয়ার নেতা তথা চেয়ারম্যান কিম জং উন। মঙ্গলবার সিঙ্গাপুরের সান্তোসা দ্বীপের বিলাসবহুল ক্যাপেলা হোটেলে এক ঐতিহাসিক বৈঠকে মিলিত হন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও চেয়ারম্যান কিম। দীর্ঘ ৭০ বছর পর দেশ দু’টির ক্ষমতাসীন নেতাদের মধ্যে প্রথমবারের মতো করদর্মনের ঘটনা ঘটলো। ‘বিশেষ বন্ধনে’ আবদ্ধ হলেন ট্রাম্প ও কিম। কিম কোরীয় উপদ্বীপকে পরমাণু অস্ত্রমুক্ত করার অঙ্গীকার করেছেন। বিনিময়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প উত্তর কোরিয়াকে নিরাপত্তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে পরমাণু অস্ত্রমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে চলমান নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে বলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন।

 

ঐতিহাসিক বৈঠক

 

সিঙ্গাপুরের স্থানীয় সময় মঙ্গলবার ৯টায় (বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টা) সান্তোসা দ্বীপের ক্যাপেলা হোটেলের লাইব্রেরিতে বৈঠকে মিলিত হন ট্রাম্প ও কিম জং উন। মার্কিন প্রেসিডেন্টের দপ্তর হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও নেতা কিমের মধ্যে বৈঠকের স্থায়ীত্ব ছিল ৩৮ মিনিট। তাদের সঙ্গে কেবল দোভাষী উপস্থিত ছিলেন। এরপর তারা দুইজন নিজ দেশের প্রতিনিধি দলকে সঙ্গে নিয়ে বৈঠক করেন। দু’টি মিলিয়ে প্রায় ৫ ঘন্টা বৈঠক করেন ট্রাম্প ও কিম। বৈঠকের পর তারা সাংবাদিকদের সামনে যৌথ ঘোষণায় স্বাক্ষর করেন। ১৯৫০-৫৩ সাল পর্যন্ত চলা কোরীয় যুদ্ধের পর যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এরপর আর যুক্তরাষ্ট্র এবং উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতাসীন কোনো নেতা নিজেদের মধ্যে বৈঠক করেননি কিংবা করমর্দনও করেননি।

 

কোরীয় উপদ্বীপে শান্তির বার্তা

 

ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় আসার আগেই উত্তর কোরিয়াকে নানা ধরনের হুমকি দিয়ে আসছিলেন। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে উত্তর কোরিয়াও হুমকি দিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে পরমাণু হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছিলেন কিম জং উন। আর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প উত্তর কোরিয়াকে এমন শিক্ষা দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন যা সারাজীবন বিশ্ব স্মরণে রাখবে। কিন্তু গত বছরের শেষ দিক থেকে সেই দৃশ্য পাল্টাতে শুরু করে। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে-ইনের প্রচেষ্টায় উত্তর কোরিয়া দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত শীতকালীন অলিম্পিকে অংশ নেয়। এরপর দুই দেশের মধ্যে একের পর এক আলোচনা শুরু হয়। এমনকি এপ্রিলে মুন এবং কিম দুই কোরিয়ার সীমান্তবর্তী পানমুনজামে বৈঠকে মিলিত হন। সেই বৈঠকেই তারা কোরীয় উপদ্বীপকে পরমাণু অস্ত্রমুক্ত করার অঙ্গীকার করেন। হঠাৎ করে গত ২৪ মে গতকাল ১২ জুনের বৈঠক বাতিলের ঘোষণা দেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তবে কিম প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে একটি চিঠি পাঠান যেখানে বৈঠকে বসার অনুরোধ করেন বলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আইনজীবী জানিয়েছিলেন। রাজি হন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। অবশেষে সেই বহুল প্রতীক্ষিত বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো মঙ্গলবার। যুদ্ধাবস্থা থেকে কোরীয় উপদ্বীপে শান্তির বার্তা দেখা গেল। তবে সেটা কতটা স্থায়ী হবে তা নিয়ে সন্দেহ রয়েই গেছে। বৈঠকের পর দক্ষিণ কোরিয়া বলেছে, এর মধ্যে দিয়ে স্নায়ু যুদ্ধ যুগের শেষ সংঘাতের অবসান হলো। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে-ইন আশা প্রকাশ করেছেন যে এই বৈঠক ‘পূর্ণ পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ, শান্তি ও দুই কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে নতুন যুগের সৃষ্টি করবে।

 

যৌথ ঘোষণায় যা আছে

 

গতকালের যৌথ ঘোষণায় চারটি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। প্রথমত : যুক্তরাষ্ট্র ও গণপ্রজাতন্ত্রী কোরিয়া বা ডিপিআরকে নতুনভাবে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্থাপনে উদ্যোগী হবে, যাতে দুই দেশের মানুষের দীর্ঘমেয়াদী শান্তি ও উন্নতির বিষয়টি প্রতিফলিত হবে। দ্বিতীয়ত : কোরীয় উপদ্বীপে স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ শাসনব্যবস্থা অব্যাহত রাখতে যৌথভাবে কাজ করবে যুক্তরাষ্ট্র ও ডিপিআরকে। তৃতীয়ত : ২৭শে এপ্রিল ২০১৮ সালের পানমুনজাম বিবৃতি অনুযায়ী কোরীয় উপদ্বীপকে সম্পূর্ণ পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের অঙ্গীকার রক্ষা করবে ডিপিআরকে। চতুর্থত : যুক্তরাষ্ট্র ও ডিপিআরকে যুদ্ধবন্দীদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ভূমিকা রাখবে এবং এরই মধ্যে যেসব যুদ্ধবন্দী চিহ্নিত হয়েছে তাদের প্রত্যাবসন প্রক্রিয়া অতিস্বত্তর শুরু হবে।

 

নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত থাকবে

 

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমরা যখন পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের বিষয়ে সম্পূর্ণ নিশ্চিত হতে পারবো তখনই উত্তর কোরিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে। আমি আসলে এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে চাই। তবে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত না হয়ে এই পদক্ষেপ নিতে চাই না। ট্রাম্প বলেছেন, পরমাণু অস্ত্রমুক্ত হলে উত্তর কোরিয়াকে যথাযথ নিরাপত্তা দেওয়া হবে। তিনি জানিয়েছেন, মানবাধিকার বিষয়ে কিমের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলোচনা হয়েছে।

 

যুক্তরাষ্ট্র মহড়া বন্ধ করবে

 

ট্রাম্প জানিয়েছেন, স্বাক্ষরিত বিবৃতির শর্ত অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র এখনই সেনাবাহিনী সরিয়ে নেবে না। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে নিয়মিতভাবে আয়োজন করা যৌথ সামরিক মহড়া বন্ধ করবে তারা। এসব সামরিক মহড়া নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে আসছিল উত্তর কোরিয়া।

 

মার্কিন সেনাদের প্রত্যাবাসন

 

উত্তর কোরিয়ায় যুদ্ধবন্দী মার্কিন সেনাসদস্যদের দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘আজকে (মঙ্গলবার) এ বিষয়ে আমি জিজ্ঞেস করেছি এবং আশানুরূপ উত্তর পেয়েছি’।

 

আশাবাদী বিশ্ব

 

চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা শিনহুয়া নিউজ এজেন্সি কিম-ট্রাম্প বৈঠক সম্পর্কে বিবৃতি প্রকাশ করেছে। তারা বলেছে, এই বৈঠক কোরীয় উপদ্বীপের পারমাণবিক অস্ত্র ইস্যুর একটি রাজনৈতিক সমাধানের আশা তৈরি করেছে। তবে তারা আরো বলেছে, এই বৈঠক যে দুই দেশের বহুদিনের বৈরিতা ও অবিশ্বাসের মানসিকতা মুছে ফেলে সৌহার্দ্যের পথে নিয়ে যাবে তেমনটা কেউ আশা করছে না। পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত উপদ্বীপ গঠন এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করে উন্নয়নের পথে যাত্রার জন্য প্রয়োজন জ্ঞান ও ধৈর্য্য। এরকম ক্ষেত্রে প্রথম পদক্ষেপটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও কঠিন। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেছেন, এখন উত্তর কোরিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞাগুলো শিথিল করা যেতে পারে। একে স্বাগত জানিয়েছে রাশিয়াও। তবে ইরান বলেছে, এমনও হতে পারে যে ট্রাম্প দেশে ফিরে যাবার আগেই সমঝোতা বাতিল করে দিতে পারেন।

 

ব্যাপক পরিবর্তন দেখবে বিশ্ব

 

অনুবাদকের মাধ্যমে কিম বলেন, আমরা অতীতকে পেছনে ফেলে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। পৃথিবী গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখতে পাবে। মধ্যাহ্নভোজনের পর ক্যাপেলার বিলাসবহুল হোটেলের বাগানে একসাথে হাঁটতে দেখা যায় কিম ও ট্রাম্পকে। এরপরই তারা যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন।

 

উত্তর কোরিয়ানরা বৈঠক সম্পর্কে কী জানে?

 

উত্তর কোরিয়ানরা জানে যে দুই নেতার মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে তারা শুধু সেটুকুই জানতে পারে যতটা তাদের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম প্রচার করে। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স নামের একটি সংগঠনের তৈরি করা তালিকায় বিশ্বে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচকে সবচেয়ে নিচে অবস্থান উত্তর কোরিয়ার।  সেদেশের সব খবর রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের মাধ্যমে প্রচারিত হয়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কোনো খবর পড়া বা দেখা বা শোনার অপরাধে উত্তর কোরিয়ার নাগরিকদের কারাদন্ড হতে পারে। গতকাল উত্তর কোরিয়ার গণমাধ্যম নীরব ভূমিকা পালন করে।

 

বৈঠকে কারা ছিলেন

 

আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পিও এবং সেনাপ্রধান জন কেলি। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টনও ছিলেন বৈঠকে, যার মন্তব্যের কারণে প্রায় পন্ড হতে বসেছিল বৈঠক। উত্তর কোরিয়ার পক্ষে ছিলেন কিম জং উনসহ তার ডানহাত কিম ইয়ং-চোল। পররাষ্ট্রমন্ত্রী রি ইয়ং হো। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী রি সু-ইয়ংসহ আরো কয়েকজন। - বিবিসি, রয়টার্স ও সিএনএন

এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
ফজর৪:৩৩
যোহর১১:৫২
আসর৪:১৩
মাগরিব৫:৫৭
এশা৭:১০
সূর্যোদয় - ৫:৪৭সূর্যাস্ত - ০৫:৫২