নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনায় বুধবার বিকেলে আদালতে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। এতে র্যাবের চাকরিচ্যুত তিন কর্মকর্তা ও র্যাবের ২১ জন, ভারতে গ্রেপ্তার হওয়া নূর হোসেনসহ ৩৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে এজাহারভুক্ত ছয় আসামিকে।
এই হত্যাকাণ্ডের ১১ মাস পর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ওসি মামুনুর রশিদ মন্ডল নারায়ণগঞ্জ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ওই চার্জশীট দাখিল করেন।
নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন খান জানান, সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট চাঁদনী রূপমের আদালত ১১ মে শুনানির দিন ধার্য্য করা হয়েছে।
আদালতে দাখিল করা দুটি মামলায় ১৬ পাতা করে চার্জশিটে সাত জনকে অপহরণ ও পরে হত্যার ঘটনায় ৩৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। স্বাক্ষী করা হয়েছে ১২৭ জনকে । মামলায় ১৬২ ধরনের আলামত উদ্ধার দেখানো হয়েছে। মামলায় এখন পর্যন্ত ৩২ জন গ্রেপ্তার রয়েছে।
অব্যাহতি প্রাপ্ত এজাহারভুক্ত ৬ আসামি হলো সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাজী ইয়াসিন মিয়া, ইকবাল, হাসমত আলী হাসু, থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক আমিনুল হক রাজু ও আনোয়ার। মামলায় এ ৫জনকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
মামলায় গ্রেপ্তারকৃত আরো ১১ জনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তারা হলো - নূর হোসেনের বডিগার্ড মহিবুল্লাহ, তানভীর, ইয়াসিন, আলমগীর, গাড়িচালক সোনা মিয়া, জুয়েল আহম্মেদ, মিজান, আবদুর রহিম, আরিফুজ্জামান, রফিকুল ইসলাম, মিজানুর রহমান।
মামলায় অভিযুক্ত ৩৫ জনের মধ্যে ১৩ জন পলাতক দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে নূর হোসেনের সহযোগি ও র্যাবের কয়েকজন সদস্যের নাম রয়েছে।
সাত খুনের পর দুটি মামলার মধ্যে সেলিনা ইসলাম বিউটির মামলায় কাউন্সিলর নূর হোসেনকে প্রধান আসামী করে ছয় জনকে আসামি করা হয়েছিল।
এই ছয় আসামির মধ্যে নূর হোসেনকে গত বছরের ১৪ জুন ভারতের কলকাতায় গ্রেপ্তার করা হলেও এজাহারভুক্ত অপর পাঁচ আসামি রয়েছে পলাতক । আর এ পাঁচ জনকেই অব্যাহতি দেওয়ায় বুধবার বিকেলে আদালতে উপস্থিত হয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন সেলিনা ইসলাম বিউটি। সাখাওয়াত হোসেন খান জানান, এজাহারভুক্ত আসামীদের অব্যাহতি দেওয়ায় তিনি অচিরেই আইনগত ব্যবস্থা নিবেন।
অন্যদিকে চন্দন সরকার ও গাড়ি চালক ইব্রাহিমকে অপহরণ ও হত্যা মামলার বাদী ছিলেন চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল। এ মামলায় আসামি অজ্ঞাত করা হয়েছিল।
২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লায় খান সাহেব ওসমান আলী জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের সামনে থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটির ২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র-২ নজরুল ইসলাম, তার বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, লিটন, নজরুলের গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম, আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার এবং তার ব্যক্তিগত গাড়িচালক ইব্রাহিম অপহৃত হন।
পরদিন ২৮ এপ্রিল ফতুল্লা মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন নজরুল ইসলামের স্ত্রী। কাউন্সিলর নূর হোসেনকে প্রধান করে মামলায় আসামি করা হয় ছয়জনকে।
৩০ এপ্রিল বিকেলে শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ছয়জন এবং ১ মে সকালে একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। নিহত সবারই হাত-পা বাঁধা ছিল। পেটে ছিল আঘাতের চিহ্ন। প্রতিটি লাশ ইটভর্তি দুটি করে বস্তা বেঁধে ডুবিয়ে দেওয়া হয়।
এ হত্যাকান্ডে র্যাব-১১ এর কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করেন নিহত প্যানেল মেয়র নজরুলের পরিবারের সদস্যরা। প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের শ্বশুর অভিযোগ করেন, ৬ কোটি টাকার বিনিময়ে র্যাবকে দিয়ে ওই সাতজনকে হত্যা করিয়েছেন নূর হোসেন।
এ অভিযোগের পর র্যাব-১১ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মাহমুদ, সাবেক অধিনায়ক মেজর আরিফ হোসেন ও লে. কমান্ডার এম এম রানাকে চাকরিচ্যুত করা হয় গত ৬ মে।
১৭ মে দিবাগত রাত দেড়টার দিকে ঢাকার সেনানিবাস এলাকা থেকে মিলিটারি পুলিশ ও ক্যান্টনমেন্ট থানা পুলিশ এবং নৌ বাহিনীর গোয়েন্দারা এমএম রানাকে আটক করে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের কাছে তুলে দেয়। পরে এ তিনজন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।
