ড. অচ্যুত সামন্ত। একজন ভারতী শিক্ষাবিদ। ১৯৯২ সালে ১২ জন শিক্ষার্থী নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন কলিঙ্গ ইনস্টিটিউট অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল টেকনোলজি (কেআইআইটি)। এটি এখন বিশ্বমানের পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৯৩ সালে তিনি চালু করেন কলিঙ্গ ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল সায়েন্সেস (কিস)। সবচেয়ে কম সময়ে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি পাওয়ার লিমকা বুক অব রেকর্ডসে নাম উঠেছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের। এখানে ৪০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীকে কেজি টু পিজি পড়ানো ও ১০০টিরও বেশি বিষয়ে ডিগ্রী দেয়া হচ্ছে। এ জন্য ২০১১ সালে টাইমস অব ইন্ডিয়া ড. সামন্তকে ‘আইকন অব ওডিশা’ নির্বাচন করে। ভারতের সবচেয়ে কম বয়সী উপাচার্যও তিনি।
একার উদ্যোগে স্কুল-কলেজ গড়ায় মন দিয়েছিলেন তিনি। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই তার প্রতিষ্ঠিত কলেজ পেয়ে গেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা। সে মর্যাদা পেতে হলে অনেক শর্ত পূরণ করতে হয়। হলো নিজস্ব ভবন। পরে তৈরি হতে লাগল মেডিক্যাল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং, বিজনেস ম্যানেজমেন্ট ইত্যাদি পাঠের জন্য পৃথক ব্যবস্থা। মাত্র দু’দশকের মধ্যে বিশাল প্রতিষ্ঠান। ওড়িশার রাজধানী ভুবনেশ্বরের অদূরে এক বিশাল ক্যাম্পাস। অচ্যুত সামন্ত কোনো প্রকার সরকারি সাহায্যের মুখাপেক্ষী হননি। বন্ধু-বান্ধব, শুভার্থী সাহায্য করেছেন। প্রধানত নির্ভর করেছেন ব্যাংক ঋণের ওপর। যথাসময়ে ঋণ শোধ দিয়ে তিনি ব্যাংকের বিশ্বাস অর্জন করেছেন। এরপর সেই অবিশ্বাস্য ঘটনা। উচ্চমানের শিক্ষা ব্যবস্থায় সার্থকতা অর্জনের পর অচ্যুত সামন্ত করলেন একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান।
কলিঙ্গ ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল সায়েন্সেস। সংক্ষেপে কিস। এখানে শুধু আদিবাসী সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ। বিশ হাজার ছাত্রের জন্য হোস্টেল। অচ্যুত সামন্ত আদিবাসী সম্প্রদায়ের দুর্বিষহ জীবনকে স্বাভাবিক করতে মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা, পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণকে। একই সঙ্গে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, কন্যাশিশু হত্যা বন্ধের ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয় কিসের মাধ্যমে। ‘কিস’ শুরু হয়েছিল মাত্র ১২৫ জন আদিবাসী ছেলে-মেয়েদের দিয়ে। স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিত্সা পাঁচটি মৌলিক অধিকারই এখানে একযোগে দেয়া হয়। পড়ালেখা করানো হয় কেজি (কিন্ডার গার্টেন) থেকে পিজি (পোস্ট গ্রাজুয়েশন)। এর সবকিছুই করা হয় বিনামূল্যে।
তার নতুন স্বপ্ন হলো এই বিশ হাজার সংখ্যাটাকে ২ লাখে উন্নীত করা আগামী ৬ বছরের ভেতরে। সারা বিশ্বে আর কোথাও একসঙ্গে বিশ হাজার আদিবাসী সন্তানদের খাওয়া, থাকা, লেখাপড়ার ব্যবস্থা, সব বিনা খরচে আর কোথাও নেই। এর জন্য যে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। তা আসে কোথা থেকে? ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিক্যাল কলেজ চালিয়ে যথেষ্ট উপার্জন হয় তো বটেই, সেই উপার্জন ব্যয় হয় আদিবাসী কল্যাণে।
অচ্যুত সামন্তকে এই জায়গায় নিয়ে এসেছে সেই সব আদিবাসী ছেলে-মেয়ে। যারা সুযোগ পেয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন, তাদের মেধার আবাদ করলে তারাও ফলাতে পারে ‘সোনা’। আদিবাসীদের আবাসস্থলে কয়লা থেকে নানা খনিজ পদার্থের খনি রয়েছে। পুঁজিবাদীদের নজর সেদিকে। কিন্তু আদিবাসীদের মস্তিষ্ক ঠিক মতো আবাদ করলে যে সোনা ফলতে পারে, সেটা বুঝতে পেরেছিলেন অচ্যুত সামন্ত।
