রোববার, ২৭ নভেম্বর ২০২২, ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

জমি দখল করতে ভুয়া কাবিননামা, হদিস নেই কাজী অফিসের

আপডেট : ২১ নভেম্বর ২০২২, ২৩:৩০

ভুয়া স্ত্রী সাজিয়ে যৌতুকের মামলা দিয়ে জমি দখল করতে তুরাগের রাজাবাড়ী এলাকার একজন ব্যবসায়ীকে হয়রানি অভিযোগ পাওয়া গেছে। একটি প্রভাবশালী ব্যবসায়ী শাহজালালের জমি দখলের জন্য দীর্ঘদিন ধরে পায়তারা চালিয়ে আসছে। তবে যে বিয়ে ও কাবিননামার বলে যৌতুকের মামলা হয়েছিলো সেই কাজী অফিসেরই এখন কোনো হদিস নেই। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সিআইডি তদন্ত কর্মকর্তা (এস আই) আইয়ুব।

মামলার বিবরণে জানা যায়, গত ১২ সালে ১৪ মে দুই লাখ টাকা দেনমোহর ধার্য করে ব্যবসায়ী মো. শাহজালাল মিয়ার সঙ্গে মামলার বাদি রোকসানার (২২)-এর বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই রোকসানা বেগমের কাছে ২নং বিবাদীর সহায়তায় ১নং বিবাদী বিভিন্ন সময় যৌতুক বাবদ দুই লাখ টাকা দাবি করে আসছিলো। রোকসানা যৌতুকের দুই লাখ টাকা দিতে না পারায় তার উপর বিভিন্ন সময় শারীরিক ও মানুষিক নির্যাতন করতো মো. শাহজালাল মিয়া। একপর্যায় নির্যাতনে অসহ্য হয়ে ২০২০ সালে ১০ সেপ্টেম্বরে ঢাকার বিজ্ঞ মুখ্য মহানগর হাকিম এর আদালতে মামলাটি দায়ের করেন রোকসানা বেগম।

মামলাটিতে ওই বছরের ৩ নভেম্বর আদালত  গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করলে তুরাগ থানা পুলিশ আসামিদের আটক করে আদালতে সোপর্দ করে। দুইদিন কারাবাসের পর আসামিরা শাহজালাল ও তার প্রতিবেশী জামিনে মুক্তি পান। এরপর বেশ কিছুদিন মামলাটি চললেও বাদী বা সাক্ষী কেউ আদালতে যাননি। এমনকি মামলায় উল্লেখিত ঠিকানায় গিয়েও উক্ত মামলার বাদী বা সাক্ষীদের কোন হদিস না মেলায় আদালত গতবছরের ৩ নভেম্বর আসামিদের খালাস দেন।

এদিকে শাহজালালের কথিত স্ত্রী দাবি করা রোকসানার দেওয়া মোবাইল নম্বরে কল করা হলে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি বাসায় গৃহপরিচারিকার কাজ করা মনি আক্তার সেটি রিসিভ করেন। তিনি জানান, তার বাড়ী নেত্রকোণা জেলার কমলাকান্দায়। তিনি জীবনে কখনো নবাবগঞ্জ যাননি। দুই মাস আগে তার মা তাকে কমলাকান্দা বাজার থেকে এই মোবাইল সিমটি কিনে দেন। শাহজালাল নামে তিনি কাউকে চেনেন না। এর আগে একজন পুলিশের লোকও তাকে ফোন কল করেছিলেন  বলেও তিনি প্রতিবেদককে জানান।   

শাহজালালের নিকহনামায় যে কাজী ইয়াকুব আলি মুন্সী কাজী অফিসের ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে খোঁজ নিয়ে জানা যায় এমন কোনো কাজী অফিস সাভারের ওই এলাকায় নেই। 

ভুক্তভোগী শাহজালালের দাবি, পৈত্রিক সম্পত্তি জোরপূর্বক দখলের উদ্দেশ্যে এমন মিথ্যা ও মানহানিকর মামলা সাজিয়েছে একটি ভূমি দস্যু চক্র। ইতোপূর্বেও আমার পৈত্রিক সম্পদ দখলের জন্য চক্রটি আমার বাবার নামে থাকা জমি নিজেদের নামে নামজারি করে।  পরে মিসকেসের মাধ্যমে ওই নামজারী সংশোধন করা হয়। এরপর প্রতিশোধ নিতে নতুন করে আবারও জমি দখলের পায়তারা শুরু করেছে চক্রটি। এবার কৌশল পাল্টে ভুয়া স্ত্রী সাজিয়ে যৌতুকের মতো জঘণ্য সামাজিক অপরাধের মামলা দিয়ে আমাকে ও আমার প্রতিবেশী একজন বড় ভাইকে ইয়াকুব আলী কবিরকে জেলে পাঠায় ওই ভূমিদস্যুরা। 

তিনি আরও বলেন, যাকে আমার স্ত্রী সাজানো হয়েছে তাকে আমি কখনো দেখিনি এমনকী তার নামও কোনো দিন শুনিনি। তারপরও যৌতুকের মামলা দিয় আমাকে জেলে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু যে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে যৌতুকের মামলা নিষ্পত্তি করা হয় অর্থাৎ ৯০দিন আদালত সময় দেন, আমার ক্ষেত্রে সে ধরনের কোনো প্রক্রিয়াই অনুসরণ করা হয়নি। পরে আদালতে বিষয়টি উপস্থাপন করা হলে দুইদিনের মধ্যে আদালত আমার জামিন মঞ্জুর করেন। ২০২০ সালে দায়ের করা ওই মামলায় একাধিকবার আদালত বাদীকে উপস্থিত হতে তলব করলেও তারা কখনোই উপস্থিত হননি। এমনকি বাদীরপক্ষের কোন আইনজীবীও কোর্টে হাজিরা দেননি। পরে আদালত গত বছরের ৩ নভেম্বর যৌতুকের মামলাটি খারিজ করে দেন।

হায়রানিমূলক ওই মামলার পরে মো. শাহজালাল বাদী হয়ে উক্ত মিথ্যা মামলার বাদীসহ মোট পাঁচজনের বিরুদ্ধে গত চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকা চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আরেকটি মামলা দায়ের করেন। আদালত মামলাটি শুনানি শেষে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সি আই ডি)-কে তদন্তের নির্দেশ দেন। বর্তমানে মামলাটি চলমান রয়েছে। 

শাহজালালের আইনজীবী ফারুক আহমেদ প্রতিবেদককে জানান, সম্পূর্ণ মিথ্যা ও জাল কাগজপত্র দিয়ে মামলাটি করা হয়েছিলো। আদালতে শাহজালাল ন্যায় বিচার পেয়েছেন। এই ধরনের জাল ডকুমেন্ট দিয়ে হয়রানির জন্য মিথ্যা যৌতুকের মামলারকারী নারীসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছি। আশা করছি, আদালতে আমার ক্লায়েন্ট ন্যায় বিচার পাবেন।

সিআইডি তদন্ত কর্মকর্তা (এস আই) আইয়ুব বলেন, আমি দুই মাস হলো মামলাটি হাতে পেয়েছি। কথিত স্ত্রী দাবি করা রোকসানার খোজ এখনো পাওয়া যায়নি। তবে আমরা তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছি। খুব শিগগিরই আমরা এর সমাধান নিয়ে আসবো।

ইত্তেফাক