ঢাকা সোমবার, ০১ জুন ২০২০, ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
২৮ °সে

‘সুপারহিরো’ নিউইয়র্কের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা

‘সুপারহিরো’ নিউইয়র্কের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা
নিউইয়র্কের এলমহামর্স্ট হাসপাতালের সামনে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মিদের জন্য ‘থ্যাংক ইউ’ ফলক। ছবি: সংগৃহীত

ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামের (পিপিই) অভাব ছিল শুরু থেকেই। ছিল না পর্যাপ্ত মাস্কও। কিন্তু সেসবের তোয়াক্কা করেননি নিউইয়র্কের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। মানবসেবার ব্রত নিয়ে নিউইয়র্কের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মিরা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের নজিরবিহীন সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। এ কারণে নিউইয়র্কবাসীর কাছে তারা এখন ‘সুপারহিরো’।

পিপিই ও মাস্কের তীব্র সঙ্কটের পরও নিউইয়র্কের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা যখন পেরে উঠছিলেন না, তখন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্য থেকে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা নিজ পরিবারকে রেখে ছুটে গেছেন নিউইয়র্কে। অনেকে নিজের খরচে থেকেছেন বিভিন্ন হোটেলে। অনেকে রাত কাটিয়েছেন হাসপাতালের মেঝেতে। ‘সুপার হিরো’ এসব চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। প্রায় প্রতিটি হাসপাতালের সামনে বড়ো বড়ো ফলক তৈরি করে লিখে রেখেছেন ‘তোমাদের ধন্যবাদ’।

করোনাভাইরাসের ভয়াল থাবায় লণ্ড-ভণ্ড বিশ্বের মহাশক্তিধর দেশ যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির বৃহত্তম শহর ও বিশ্বের রাজধানী হিসাবে পরিচিত নিউইয়র্ক হয়েছে মৃত্যুপূরী। সিএনএন-এর তথ্য অনুযায়ী এ পর্যন্ত, গতকাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ১১ লাখ ৩৩ হাজার ৬৯ জন এবং তাদের মধ্যে মারা গেছেন ৬৬ হাজার ৩৮৫জন। একইসময়ে নিউইয়র্ক রাজ্যে আক্রান্ত হয়েছেন ৩ লাখ ১২ হাজার ৯৭৭ জন এবং মারা গেছেন ২৪ হাজার ১৯৮জন। সরকারি কোনো হিসাব না থাকলেও বিভিন্ন সূত্র ধারণা করে বলছে, নিউইয়র্কে এ পর্যন্ত দুই শতাধিক বাংলাদেশি করোনায় মারা গেছেন।

বাংলাদেশি চিকিৎসক ফেরদৌস খন্দকার

নিউইয়র্কের গভর্নর ও সিটি মেয়র অফিস বলছে, করোনাভাইরাস পুরো বিশ্বকে এক নতুন বাস্তবতার মুখে ফেলে দিয়েছে। বিশ্বের কোনো দেশই নতুন এই সংকটের জন্য প্রস্তুত ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নিউইয়র্ক সিটি এখন করোনাভাইরাসের এপিসেন্টার। তাদের প্রস্তুতি থাকলেও চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি ছিল। বিশেষ করে হাসপাতালগুলোতে ব্যক্তিগত চিকিৎসা সরঞ্জাম, মাস্ক এবং ভেন্টিলটরের তীব্র সঙ্কট ছিল। ফলে হাসপাতালে রোগীর চাপের কারণে তীব্র ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। এত সঙ্কটের পরও চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা রোগীদের চিকিৎসা দিতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করেননি। বরং তারা ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকা মাস্ক ও চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ে রোগীদের সেবা দিয়ে গেছেন। রোগীর চাপ যখন সামলে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্য থেকে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা নিউইয়র্কের বিভিন্ন হাসপাতালে যোগ দিয়ে রোগীর সেবা দিচ্ছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের (সিডিসি) তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত প্রায় ৯ হাজার চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। মারা গেছেন কমপক্ষে ২৭ জন চিকিৎসক। কিন্তু থেমে নেই স্বাস্থ্যসেবা। চিকিৎসা সরঞ্জামের সঙ্কট থাকলেও কারো কোনো অভিযোগ নেই সরকার ও প্রশাসনের প্রতি। দেশটির চিকিৎসকেরা বলছেন, সেবার লক্ষ্য নিয়েই তারা এ পেশায় এসেছেন। সেবা দেওয়াই তাদের প্রধান কর্তব্য। দেশের এই চরম ক্রান্তিকালে মানুষের সেবা দিতে পারাটা জীবনের অনেক বড়ো অর্জন।

নিউইয়র্কের হাসপাতালগুলোকে যখন চিকিৎসা সরঞ্জামের সঙ্কট, তখন নগরীর সাধারণ মানুষ ঘরে তৈরি করা মাস্ক ও পিপিই হাসপাতালে সরবরাহ করেছেন। নিউইয়র্কের মুক্তধারার কর্ণধার বিশ্বজিৎ সাহার মেয়ে বহতা সাহা সহস্রাধিক স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য প্রটেকটিভ শিল্ড তৈরি করে বিভিন্ন হাসপাতালে সরবরাহ করেছেন। নিউইয়র্কের অদূরে ফিলাডেলফিয়ার সাবেক ডেপুটি মেয়র ড. নীনা আহমেদের মেয়ে মেডিকেলের ছাত্রী জয়া আহমেদ ৪০জন স্বেচ্ছাসেবী সংগ্রহ করে শত শত মাস্ক ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সংগ্রহ করে বিভিন্ন হাসপাতালে সরবরাহ করেছেন। বহতা ও জয়ার মত অসংখ্য মানুষ বিভিন্নভাবে স্বাস্থ্যকর্মিদের পাশে দাঁড়িয়েছেন।

নিউইয়র্কের সুপরিচিত বাংলাদেশি চিকিৎসক ফেরদৌস খন্দকার মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন। শুধু চিকিৎসা সেবা নয়, নানাভাবে বাংলাদেশি কমিউনিটির পাশে দাঁড়িয়েছেন। অসহায় মানুষকে খাদ্য সহায়তা দিচ্ছেন। নিউইয়র্কে তিনি সবার কাছে ‘সুপারহিরো’ হয়ে উঠেছেন।

ডা. ফেরদৌস খন্দকার জানান, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৮ ঘণ্টাই তিনি মানুষের সেবা দিচ্ছেন। করোনা আক্রান্ত রোগীর সেবা দিতে গিয়ে একটি পিপিই ৫-৬ দিন এবং একটি মাস্ক একাধিক বার ব্যবহার করছেন। তিনি বলেন, আমি ঘরে ঘরে গিয়ে রোগী দেখছি। আমার নিজের ঝুঁকি আছে। কিন্তু এটা জেনেও আমি মানুষের সেবা দিচ্ছি এটাই আমার কাজ। তিনি বলেন, মানুষকে হাসপাতাল বিমুখ করে বাসায় রেখে চিকিৎসা দিতে পারলে হাসপাতালের ওপর রোগীর চাপ বাড়বে না। আমি এ কাজটিকেই গুরুত্ব দিচ্ছি।

ডা. ফেরদৌস খন্দকার বলেন, নিউইয়র্কে পিপিইর ভয়াবহ সঙ্কট। আমাকে একটি পিপিই দেওয়া হচ্ছে। ৪-৫ দিন পরে আরেকটি চাইলে দেওয়া হচ্ছে না। পিপিই থেকে মৃত মানুষের গন্ধ আসছে বলার পর তারা পরিবর্তন করে দিচ্ছে। এরকম পরিস্থিতিতে নিউইয়র্কের চিকিৎসকদের কাজ করতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, বিভিন্ন রাজ্য থেকে শত শত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিউইয়র্কে এসেছেন নিজ খরচে। এমনকী নিউইয়র্কে তারা নিজের খরচে থাকছেনও। তারা চাইলে পারতেন বাসায় ঘুমিয়ে থাকতে। কিন্তু মানবিক কারণে এসব চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। তিনি বলেন, কেউ যদি এতটুকু মানবিকতা যদি নিজের স্কিলে যোগ না করেন, সারা জীবন তিনি যে প্রাপ্তি পাবেন তা এক করতে পারবেন না।

এদিকে প্রায় দুই মাস পর নিউইয়র্কে চিকিৎসা সরঞ্জাম স্বাভাবিক হয়েছে। হাসপাতালের চাহিদা পূরণ করে এক লাখ মাস্ক নিউইয়র্ক শহরের বাসিন্দাদের মাছে সরবরাহের উদ্যোগী নিয়েছেন মেয়র বিল ডি ব্ল্যাজিও। পর্যায়ক্রমে এগুলোর নগরীর বিভিন্ন এলাকায় বিতরণ করা হবে। মেয়র বলেছেন, নিউইয়র্কবাসীর স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য এসব মাস্ক খুব গুরুত্বপূর্ণ।

ইত্তেফাক/আরকেজি

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
০১ জুন, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন