প্রবাসী নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা কোথায়

প্রবাসী নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা কোথায়
প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী পুরুষদের পাশাপাশি প্রবাসী নারীরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। ১৯৯১ সালে ১৭৯ জন নারী শ্রমিক বিদেশে পাঠানোর মধ্যদিয়ে প্রবাসে নারী শ্রমিকদের যাত্রা শুরু হয়েছিল। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১৬৩টি দেশে প্রায় ১ কোটি ২৭ লাখ ৪৪ হাজার ৫৭৭ জন প্রবাসী রয়েছেন, যার মধ্যে ৮ লাখ ৪৩২ জন নারী কর্মী। বিপুল জনসংখ্যার এই দেশের শ্রমবাজারে প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখের বেশি নারী ও পুরুষ কর্মী যুক্ত হচ্ছে কিন্তু এই তুলনায় কর্মসংস্থানের হার একেবারেই কম। যার ফলে আমাদের বাধ্য হয়ে একরকম শ্রম অভিবাসনের দিকে চিন্তা করতে হয়।

প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে আমাদের সামনে আসে যে নারী শ্রমিকদের অনেকেই বিরতিহীন দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে হয়। সঠিক বেতন সময়মতো পরিশোধ না করা, দীর্ঘ সময় খেতে না দেওয়া ছাড়াও নিরাপত্তাহীনতা, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং ধর্ষণের শিকার হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিদেশ ফেরত ৩৫ শতাংশ নারীই শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের স্বীকার আর ৪৪ শতাংশ নারীকে তাদের পাওনা বেতন পরিশোধ করা হয় নাই। মহামারির বছর ২০২০ সালে বিদেশ থেকে ফেরত এসেছে ৪ লাখ ২৫ হাজার ৬৯৭ জন কর্মী এর মধ্যে ৫০ হাজার ৬১৯ জন নারী। এদের মধ্যে বেশির ভাগ নারী কোনো না কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার। যার ফলে এসব নারী শ্রমিক দেশে ফিয়ে এসেও পারিবারিক ও সামাজিকভাবেও হেয় প্রতিপন্ন এবং অমানবিক আচরণের স্বীকার হচ্ছেন।

মরিশাসে কাজে গিয়ে ধর্ষণের শিকার

সম্প্রতি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ-এর ‘দেশে ফিয়ে আসা অভিবাসী নারী শ্রমিকদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে আসে, বিদেশফেরত নারী শ্রমিকের ৫৫ শতাংশ শারীরিক ভাবে ও ২৯ শতাংশের মানসিক অসুস্থতা রয়েছে এবং ৮৭ শতাংশ দেশে এসেও মানসিক অসুস্থতার চিকিত্সা পাননি।

এছাড়া ৭৫ শতাংশের কোনো সঞ্চয় নেই, ৭৩ শতাংশ তাদের পরিবারের চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছেন এবং ৩৮ শতাংশ নারীকে সমাজে নিম্ন শ্রেণির চরিত্রহীন নারী বলে গণ্য করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যে গৃহকর্মী হিসেবে গেলেও অনেক নারীই ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। ধর্ষণের শিকার সেসব নারীর কেউ কেউ আবার সন্তানও জন্ম দিচ্ছেন। এমন আরো অনেক নারী আছেন, যারা ধর্ষণের শিকার হয়ে সন্তান জন্ম দিয়েও পায়নি সন্তানের পিতার স্বীকৃতি। আইন আদালতে গিয়েও কোনো সুরাহা পাননি তারা।

বিয়ের প্রলোভনে বিধবাকে ধর্ষণ, বিচার না পেয়ে আত্মহত্যা

গত পাঁচ বছরে প্রবাস থেকে ৪৮৭ নারী কর্মীর মরদেহ দেশে এসেছে। এর মধ্যে আত্মহত্যা করেন ৮৬ জন, স্ট্রোকে মারা গেছেন ১৬৭ জন এবং দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ৭১ জন। লাশ হয়ে ফেরা ছাড়াও শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনসহ প্রতারণার শিকার হয়ে অনেক নারীই দেশে ফিরে আসেন বলে জানায় বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক ও মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন। এর পরও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের নারীরা যাচ্ছেন নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের আশায়। পরিবারকে স্বচ্ছতা দেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সে বাড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। কিন্তু তাদের অনেকের মুখের হাসি মিলিয়ে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলো পড়েছে অথই সাগরে।

সিলেটে ৯ বছরের শিশুকে ধর্ষণ, ধর্ষক আটক 

মধ্যপ্রাচ্যে বা বিশ্বের অন্যান্য দেশে নারী শ্রমিক পাঠানোর আগে তাদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। সরকারকে নারী শ্রমিকদের সব প্রকার নিরাপত্তা প্রদান করতে হবে। গৃহকর্মী পেশার পরিবর্তে যদি কেয়ার গিভার, গার্মেন্টস বা অন্য পেশায় পাঠানো যায় তাহলে নারী শ্রমিকদের জন্য ভালো হয়। প্রবাসে নারী শ্রমিক কোনো নির্যাতন বা হয়রানির শিকার হলে তৎক্ষনাৎ তাদের সহায়তা প্রদানের ব্যবস্থা চালু রাখতে হবে। প্রবাসে তাদের অধিকার নিশ্চিত করতে আমাদের দেশের দূতাবাস ও সরকারকে কাজ করতে হবে। বিদেশের মাটিতে যেমন নারী শ্রমিকদের প্রত্যাশিত জীবন নিশ্চিত কাজ করতে হবে তেমনি দেশে ফিরে আসার পরও তাদের স্বাভাবিক জীবন নিশ্চিতে পুনর্বাসনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। বিশ্ব বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শ্রমিকদের কারিগরি প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান সুযোগ বৃদ্ধি ও অভিবাসী কর্মীদের সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোসহ সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলোকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/কেকে

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x