সাদিকুল নিয়োগী পন্নী
‘ভাই ডাবের দাম কত?’ ‘চল্লিশ বাথ।’ ‘আমরা বিদেশি মানুষ। কিছু কম রাখেন।’
‘দুঃখিত। আর কম পারা যাবে না।’
বিক্রেতার উত্তরে কিছুটা হতাশ হয়ে হাসান আমার কাছে জানতে চাইল, ‘চল্লিশ বাথে কত টাকা হয়?’
আমি ইন্টারনেটের ঘেটে জানিয়ে দিলাম, ‘একশ দশ টাকার চেয়ে বেশি।’
‘একটা সাধারণ ডাবের দাম এত বেশি! আমাদের দেশে চল্লিশ পঞ্চাশ টাকায় কত সুন্দর সুন্দর কচি ডাব পাওয়া যায়।’
‘বিদেশে এত হিসাবনিকাশ চলে না। মন চাইছে খেয়ে নে।’
‘তুই খাবি না? আমি একা একা খেলে কেমন দেখায়!’
‘ঠিক আছে আমার জন্য বল।’
‘ভাই, দুইটা ভালো দেখে আমাদের দেন।’ হাসান বলল।
বিক্রেতা দুটো বড় সাইজের ডাব কেটে আমাদের দিলেন। থাইল্যান্ডের এই ডাবের পানির স্বাদ কিছুটা ভিন্ন। মনে হলো দাম বেশি নিলেও খারাপ না।
দুই.
‘আশপাশে কোথাও টয়লেট আছে নাকি?’ হাসান জানতে চাইল আমার কাছে।
‘এই তো দেখা যাচ্ছে, চল। আমারও প্রস্রাবের বেগ পেয়েছে।’
টয়লেটের সামনের লেখা দেখে আমাদের মাথা ঘুরে যাওয়ার অবস্থা। প্রতিজনের জন্য চল্লিশ বাথ।
হাসান বলল, ‘কোন দেশে আসলাম রে ভাই। যোজন বিয়োজনে সমান খরচ। দেখি দামাদামি করে একটু কমানো যায় কি না।’
‘ভাই কিছু কম রাখা যায় না। দুজন ত্রিশ বাথ দেব।’
কাউন্টার লোক বিরক্তি নিয়ে বললেন, ‘বাথরুম করতে এসে দামাদামি। আপনাদের মতো লোক তো দেখিনি।’
‘ঠিক আছে ভাই। ও বুঝতে পারেনি। নেন চল্লিশ বাথ।’ এই বলে আমি বাথরুমে ঢুুকে গেলাম।
বাথরুম থেকে ফিরে এসে দেখি হাসান দিব্যি দাঁড়িয়ে আছে। সে আমাকে দেখে তেলে বেগুনে জ্বলে আগুন।
‘টাকা বেশি হয়ে গেছে তোর। এত টাকা দিয়ে প্রস্রাব করার কোনো মানে হয়?’
হাসানের কথায় উত্তরে আমি বললাম, ‘যে দেশের যে নিয়ম। কম টাকায় খুঁজতে গিয়ে শেষে কাপড় নষ্ট হবে।’
‘একটু পর আমরা সাগর ভ্রমণে যাব। সেখানে তো সুযোগ থাকছেই।’
‘ভাই, সবকিছু চেপে রাখতে পারলেও আমি এই জিনিসটা চেপে রাখতে পারি না। তুই বরং সাগরেই ফ্রি সেরে নিস।’
তিন.
‘এখানের পানিতে কোনো স্রোত নেই। ত্রিশ মিনিটের যাত্রা বিরতিতে আপনারা এখানে গোসল এবং সাঁতার কাটতে পারবেন।’
গাইডের এই কথা শুনে হাসান দ্রুত রেডি হয়ে গেল পানিতে নামার জন্য।
আমি বললাম, ‘আমার তো কোনো শার্ট-প্যান্ট নেই। এই জামাকাপড়ে পানিতে নামব কিভাবে?’
‘সব জায়গায় তুই ঝামেলা করিস। মেয়েদের চেয়ে তোর লজ্জা বেশি নাকি?’
আমি তাকিয়ে দেখি ভিনদেশি মেয়েরা সবাই বিকিনি পরে পানিতে আনন্দে লাফিয়ে পড়ছে।
আমি কিছুটা সাহস পেলাম। প্যান্ট-শার্টের আবরণ থেকে নিজেকে মুক্ত করলাম। তারপর শুধু স্যান্ডো গেঞ্জি এবং আন্ডারওয়ার পরে আমিও পানিতে নেমে পড়লাম।
‘চল, একটু দূরে সাঁতরে যাই।’ হাসান বলল।
‘শুনেছি সমুদ্রে নানা রকমের মাছ থাকে। এই স্বল্প ড্রেসে বেশি বাহাদুরি দেখাতে গেলে অঙ্গহানি হতে পারে। দেখা গেল মাছ পেটের ক্ষুধা মিটাতে কিসে না কিসে কামড় বসিয়ে দেয়।’
হাসান বলল, ‘এত ভয় পেলে চলবে। আর বিশেষ জিনিসের প্রতি একটু সর্তক থাকবি। তাহলে কোনো কিছু হারাতে হবে না।’
‘ঠিক আছে তাহলে চল।’
দুজন সাঁতরে একটু দূর যাওয়ার পর হাসান থেমে গেল।
‘কিরে থামলি কেন?’ আমি জানতে চাইলাম।
হাসান হাসতে হাসতে বলল, ‘আহা কী আনন্দ এই নীল সাগরে!’
‘কিরে হঠাত্ করে এমন গান মাথায় এলো কেন?’
‘আছে বন্ধু আছে। চল্লিশ বাথ বেঁচে গেল। কাজ সেরে নিয়েছি। আহা... কী আনন্দ...!’
‘তুই এত সুন্দর নীল পানিতে এই কাজ করতে পারলি?’
‘পুকুর, নদ-নদীতে কত করেছি। কক্সবাজার, সেন্টমার্টিনেও মিস করিনি। আর শোন সুযোগ পেলে এই কাজ সবাই করে। কেউ বলে, কেউ বলে না।’
‘তাই বলে আন্দামান সমুদ্রে?’
‘এত জ্ঞানের কথা বলতে আসিস না আমাকে। চল্লিশ বাথ খামখেয়ালি কথা না। আমি নোয়াখালির হাসান। টাকা ছাড়া কেমনে কী করতে হয়, তা আমার জানা আছে।’ g