থ্রি, টু, ওয়ান, বাঞ্জি!

তাহমিদ আহমেদ

 

বাঞ্জি জাম্পিং, শব্দটা শুনলেই শিহরণ জাগে। অনেক উঁচু থেকে লাফ দিতে হয় বলে এটা বেশ ভীতিকর। আবার অনেকের কাছে এটাই যেন স্বপ্ন! খুব বেশি সাহসী না হলে এই চ্যালেঞ্জে অংশ নেওয়া বেশ মুশকিল। ইউটিউব, ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় অসংখ্য ট্রাভেলারের বাঞ্জি জাম্পিং ভিডিও দেখে আমারও ইচ্ছে হলো লাফ দেওয়ার।

ইন্টারনেটে প্রচুর ঘাঁটাঘাঁটি করে জানতে পারলাম, নেপালই সবচেয়ে ভালো হবে। এরপরই নেপাল যাওয়ার এয়ার টিকেট করে ফেললাম। সফরসঙ্গী আরো ৪ জন। সন্ধ্যা ৬টায় হোটেলে উঠেই দুপুরের খাবার না খেয়ে প্রথমে বাঞ্জি অফিসে, কারণ উদ্দেশ্য বাঞ্জি জাম্পিং! লাস্ট মুহূর্তে গিয়ে রেজিস্ট্রেশন করি। কর্মকর্তারা বললেন, পরের দিন ভোর ৬টায় সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় মৃত্যুর উদ্দেশ্য যাত্রা শুরু হবে আপনার!

হোটেল থেকে ঠিক ৬টায় গাড়ি এলো। সাড়ে তিন ঘণ্টায় পৌঁছে গেলাম গন্তব্যে। চোখের সামেইন দ্য লাস্ট রিসোর্ট। মনে মনে ভাবলাম, এটাই কী আমার দ্য লাস্ট ডে?। আমার ওজন ৫৮ কেজি হওয়ায় গ্রুপ এ-তে দিলো আমাকে। তারপর একটা পত্র দিলো, যেটাতে লেখা আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়, আমি নিজে দায়ী! সিরিয়াল অনুযায়ী একে একে সবাই লাফ দিতে থাকলো। অবশেষে আমার পালা চলে এলো, সেই মুহূর্তের সাক্ষী হতে চলেছি।

ইলাস্টিক দড়ির একপ্রান্ত গোড়ালিতে বেঁধে অন্যপ্রান্ত উঁচু শক্ত কিছুর সঙ্গে লাগিয়ে দেওয়া হলো। একটু একটু করে এগুচ্ছি আর মনের মধ্য কী যেন হচ্ছে। সেইসঙ্গে পেছন থেকে ইন্সট্রাক্টরের কণ্ঠে ভয়ঙ্কর শব্দগুলো বেজে উঠল! থ্রি, টু, ওয়ান, বাঞ্জি! তখনো আমার লাফ দেওয়ার সাহস হয়নি। ইন্সট্রাক্টর ধাক্কা দেওয়ার পরই লাফ দিলাম। বেশ ভয় লাগছিল, কিন্তু কিছু বোঝার আগেই টের পেলাম শূন্যে ভাসছি। কী যে দারুণ সেই মুহূর্ত, আর কী দারুণ অনুভূতি! মনে হচ্ছিল যেন পাখি হয়ে ডানা মেলেছি আকাশে। কয়েক সেকেণ্ডের ব্যাপার, কিন্তু অদ্ভুত এক আনন্দের মধ্যে কেটেছে প্রতিটা মুহূর্ত। ৩ সেকেণ্ড বাতাসে ভেসে নিচে পড়তে শুরু করলাম! এরপর পুরোটা ৩-৪ মিনিটের আয়োজন! ঘড়ির পেন্ডুলামের মতো ঝুললাম এ মাথা থেকে ও মাথা। প্রতিটি সেকেণ্ড অসম্ভব উপভোগ করেছি।

থামেলে দ্য লাস্ট রিসোর্টের নিজস্ব অফিস রয়েছে। সার্কভুক্ত দেশের জন্য ৮২০০ নেপালি রুপি, সঙ্গে আলাদা ২০০০ রুপি ভিডিও এবং ছবির জন্য নেবে। বুকিং দিলে তারিখ হিসেবে আপনাকে ভোর ৬টায় ওদের রাইড এসে নিয়ে যাবে। যেতে লাগবে প্রায় ৩ ঘণ্টা। তবে রাস্তার সৌন্দর্যের জন্য বিরক্ত হবেন না বলতে পারি। মাঝে নাস্তার জন্য বিরতি পাবেন, যা নিজ খরচে করে নিতে হবে। রিসোর্টে যাওয়ার পর প্রথমেই পড়বে সেই ঝুলন্ত ব্রিজ, যা থেকে আপনি লাফ দেবেন। বোটেখুসি নদীর ওপর প্রায় ১৬০ মিটার বা ৫০ তলা উচ্চতা থেকে লাফ!

নেপালে আরো একবার বাঞ্জি জাম্পিংয়ের সুযোগ পেয়েছিলাম। সেটা পোখরায়। যারা পোখরা যান তারা খুব সহজেই যেকোনো ট্রাভেল এজেন্সি থেকে বাঞ্জি জাম্পিংয়ের জন্য এদের কাছে যেতে পারেন। পোখরার কেন্দ্রে এদের অফিস আছে। খরচ পড়বে নেপালি ৬৮০০ রুপি। ভিডিও, ছবির জন্য আলাদা ২০০০ রুপি। বুকিং দিলে ওদের টাইম মোতাবেক অফিস থেকে আপনাকে ওদের রাইড পিক করে নেবে। বাঞ্জি গ্রাউন্ডে যেতে সময় লাগবে ২০ মিনিটের মতো। এটা কিন্তু নেপালের একমাত্র টাওয়ার বাঞ্জি। উচ্চতা প্রায় ৭০ মিটার বা ২২ তলা। লাফ দেওয়ার আগে একটা প্রাথমিক ক্লাস হবে, যা আপনাকে আপনার জাম্প দেওয়ার আগে মানসিক প্রস্তুতি নিতে সাহায্য করবে। টাওয়ারের প্রান্তে দাঁড়িয়ে শুধু লাফ দেবেন। সময় লাগবে ৩ সেকেণ্ড। তারপর বাকিটা ইতিহাস হয়ে থাকবে।

দুই জায়গাতে বাঞ্জি করার পর বুঝলাম, লাস্ট রিসোর্টের অভিজ্ঞতা সারাজীবন মনে থাকবে।