পৃথিবী যেন আমার নিচে!

প্রাচী দোশি

 

স্কাই ডাইভিংয়ের জন্য দুবাই বিখ্যাত, বেশিরভাগ মানুষ এটাই জানে। কিন্তু আমি সেটা করেছি নিউজিল্যান্ডে। গত বছরের ডিসেম্বরে সুযোগটা হয়েছিল আমার। তখন নিউজিল্যান্ডের আকাশ বেশ পরিষ্কার থাকে, চারপাশের ভিউও অসাধারণ দেখায়। সে কারণে দেশটিতে ডাইভিংয়ের জন্য এটা উপযুক্ত সময় এটি। যাওয়ার প্রায় দু-মাস আগেই স্কাই ডাইভের টিকেট বুকিং করেছিলাম।

আমি খুব ভয়ে ভয়েই সময়মতো পৌঁছে গেলাম এনজোন স্কাইডাইভ কুইন্সটাউইন। বেশ ভয় পাওয়ার কারণও আছে, আমার হাইফোবিয়া। তবুও হাসি মুখেই পৌঁছালাম সেখানে। সেখানকার কর্মকর্তারা জানালো, পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর স্কাই ডাইভ প্লেস নাকি নিউজিল্যান্ড! পাহাড়, লেক ও অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য একসঙ্গেই দেখা যায়। আসলেই তো, একসঙ্গে এতকিছু! অথচ দুবাইতে শুধু বিখ্যাত পাম দ্বীপ কিংবা মরুভূমি দেখা যায়।

যাই হোক, অফিসে প্রবেশ করা মাত্রই আমাকে কয়েকটা পেপার দিয়ে বললো, সাইন করতে। যেখানে উল্লেখ ছিল যদি আমার কোনো দুর্ঘটনা ঘটে (আহত/ মৃত্যু) তাহলে কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়। কাগজপত্রের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে আমারা চলে গেলাম স্পটে। যেতে যেতে আমি কিছুটা নার্ভাস হয়ে পড়ছিলাম। আমার হূদপিণ্ড ধুকপুক করছিল, হাতের তালু ক্রমাগত ঘামছিল। তবুও আমি মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, আমার শরীর যেন এই ধকল নিতে পারে।

ডাইভিং পয়েন্টের পাশে মনোরম লেক আর সবুজ ওকের বাগান দেখার পর বেশ ভালোই লাগছিল। শুধু এই জন্য আমার ভয়কে দূরে রেখে ডাইভের আগে নিজের কতগুলো ছবি তুললাম, যেন নিজেকে চাঙ্গা রাখতে পারি। আমি হাসিখুশিভাবে ছবি তুলতে লাগলাম এবং ভাবতে লাগলাম এটাই বুঝি আমার জীবনের শেষদিন।

অবশেষে ডাইভয়ের জন্য প্রস্তুতি নিলাম। আমার ইন্সট্রাক্টর বললো, জাম্পসুট এবং জুতা পড়ে নিতে। হঠাত্ করে পেটের মধ্যে অদ্ভুত মোচড়ানো অনুভব করলাম। ডাইভিং সুট পরে নেওয়ার পর ইন্সট্রাক্টর আমাকে ডাইভ সম্পর্কে বিশদ বিবরণ দিতে লাগলো। আমি কোন পজিশনে থাকবো, ৩ থেকে গণনা শুরু হলে কিভাবে লাফ দেবো প্লেন থেকে এসব আমাকে বুঝিয়ে দিলো। সে এমনভাবে কথা বলতে লাগলো যেন আমার কোনো বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছি।

আবশেষে প্লেনে উঠলাম। আমরা ৮ জনসহ একজন পাইলট ছিলেন। সবার চোখ-মুখ দেখেই কতটা উচ্ছ্বাস তা টের পাচ্ছিলাম। যখন প্লেন ওড়া শুরু করলো তখন সবকিছু অবাস্তব মনে হচ্ছিল। আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম, নিচের সবকিছু ছোট হয়ে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। আমার ১২,০০০ ফিট উচ্চতা থেকে লাফ দেওয়ার কথা থাকলেও কোনো এক সমস্যার জন্য আমাকে ১৬,০০০ ফিট উচ্চতা থেকে লাফ দিতে হয়। তখন আমি একাধারে উচ্ছ্বসিত এবং আতঙ্কিত। যখন লাফ দেওয়ার মুহূর্ত এলো তখন আমি ভাবছিলাম আমার ইন্সট্রাক্টর কে বলবো, আমি লাফ দেবো না, আমি প্লেনেই থাকি, পাইলটের সঙ্গে নেমে যাবো। কিন্তু আবার নিজেকে বোঝালাম, কিছুতেই পিছুহটা যাবে না।

যখন প্লেনের দরজা খুললো, লাফ দেওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে আমার সবকিছু কেমন যেন অবশ হয়ে যাচ্ছিল। যখন আমরা লাফ দেবো তখন মনে হচ্ছিল, আমার পা কাজ করছে না। হূিপণ্ড যেন পাগলা ঘোড়ার মতো লাফাচ্ছে। যখন লাফ দিলাম তখন সকল ভয় উচ্ছ্বাসে পরিণত হলো। আমার মনে হচ্ছিল না আমি নিচে পড়ে যাচ্ছি, বুঝতেও পারছিলাম না ঠিক কত গতিতে আমরা নিচে পড়ছি। ভয়ের মুহূর্ত শেষ করে যখন আশেপাশে তাকালাম তখন শুধু সুন্দর লেক আর পাহাড়! মনে হচ্ছিল গোটা পৃথিবী আমার নিচে।

আমরা ৬০ সেকেণ্ডের মতো মুক্তভাবে উড়ছিলাম, কিন্তু মনে হচ্ছিল যেন ১০ সেকেণ্ড। অবশেষে সময় এলো আমি অনুভব করলাম, আমি শ্বাস নিতে পারছি না, বিষ্ময়ে চিত্কার করতেও ভুলে গেছি। এখন পর্যন্ত এটাই আমার সবচেয়ে সুন্দর অভিজ্ঞতা। যখন ইন্সট্রাক্টর প্যারাসুটটি খুললো, অনেক ঝাঁকি অনুভব করলাম, সেইসঙ্গে স্বস্তিও। মাটিতে নামার পর আমার মুখ থেকে একটাই কথা বের হলো, ওয়াও! পৃথিবী এতটা সুন্দর!