নাঈম উল ইসলাম
বান্দরবান ভ্রমণের সকালে থানচি বাজারের পাড়ার সরু গলিগুলো দিয়ে হেঁটে যাই, তবে বেশি ভেতরে না। সেখান থেকে ভেসে আসে মারমাদের গান। মারমা বোঝা গেল এ কারণে যে, ঠিক একই গান এবার পার্বত্য মেলাতেও চলেছে। মেলায় তাদের বোতল কিংবা কলসি নাচে বাজছিল এই গান।
বাজারের পেছনেই বয়ে চলেছে শঙ্খ নদ। ছোট হলেও কোনো জিনিসের সম্ভবত অভাব নেই এখানে। রাত ৮টার দিকেই বাজারের দোকানগুলোর ঝাঁপি নামতে থাকে আর ৯টা নাগাদ সমস্ত বাজারে নিশুতি নীরবতা নেমে আসে। পরদিন ভোর হতেই শুরু হয় এই বাজার। পাড়ার গলি ঘুরে বাজারে আসি। সিমেন্টে ঢালাই সড়কের ওপর বস্তা বা চট বিছিয়ে দু-পাশে জিনিসের পসরা সাজিয়ে পাহাড়িরা বসে থাকে। মূলত তারাই এই বাজারের প্রধান বিক্রেতা। আর তাদের মধ্যে নারীদেরই প্রাধান্য। বাজারের চারপাশে পাহাড়ি মুখ আর তাদের অচেনা কথাবার্তা।
কলার থোড়, বাঁশকোড়ল, কাঁচাকলা, ওলকচু এ রকম কিছু সবজি চোখে পড়ে, যা সমতলে বিরল। লাল রঙের সবজি, পেঁয়াজ পাতার মতো ডাটা, কুমড়োর মতো হলুদ ফুল এ রকম আরো অনেক অচেনা জিনিসও দেখি। ফলের মধ্যে আছে তেঁতুল, চালতা, আখ, কলা প্রভৃতি। হাঁটতে হাঁটতে জিনিসগুলোর মধ্যে একটা বেতের বাক্সে রাখা আখের দিকে দৃষ্টি আটকে যায়। কারণ আখগুলোর রঙ কালচে মাটির মতো। এগিয়ে যাই সেখানে। নিচে বিছানো আরো অনেকরকম ফল আর সবজি। সেখানে বিক্রেতাদের মধ্যে ব্যতিক্রম হিসেবে দণ্ডায়মান একজন প্রৌঢ়। তাকে আখ দেখিয়ে জিজ্ঞেস করি, কত করে এগুলো?
—একটা দশ টাকা।
আখগুলো যখন দেখছি তখন পাশ থেকে একটি কিশোরী কণ্ঠ সুরেলা বাংলায় বলে ওঠে, নিয়ে যান। খুব ভালো হবে।
প্রৌঢ়ের পাশেই দাঁড়ানো এই মেয়েটির সঙ্গে কথা এগোয়। সে জানায়, হলুদ রঙের ফুলের মতো সবজির নাম থাঁওয়াপো। তেঁতুলের হলো থাঁলাগো। চালতাকে বলে ছেইজি। নামোদ্ধার পর্ব শেষে থাঁওয়াপো প্রসঙ্গে জানতে চাই, এর কোনো বাংলা নাম আছে? অন্যত্র খোঁজা যেত তাহলে! মেয়েটি বলে, আমি জানি না!
বিষয়টা অবাক করে। কত শত বছর ধরেই না তারা এই সবজিকে থাঁওয়াপো নামে ডেকে আসছে! আজ অবধি সেই নাম এখনো তাদের মুখে মুখে। তাই তাদের ভৌগলিক নিবাসের সীমানা এদেশে হলেও সবজিটার বাংলা নাম না জানলে তো ক্ষতি নেই!
আমরা পছন্দ করে কয়েকটি আখ নিই। লোকটি আমাদের ভালো আখ বাছাই করে দেন। কিছু কেনাকাটার পর আমাদের কথাবার্তা আরো সহজ হয়ে আসে।
—এই আখ নিশ্চয়ই আপনাদের বাগানের?
—হুম, ওইখানে আমাদের বাগান। তিনি অদূরে হাত নিশানা করে বলেন।
পাশের মেয়েটিকে দেখিয়ে তিনি আরো বলেন, তার কন্যা। আমরা কন্যার সঙ্গে আবার কথা বলি। সদ্য কেনা আখ তাকে দেখিয়ে বলি।
—আমরা তো আখ নিলাম, আচ্ছা তোমাদের ভাষায় একে কী বলে?
—ক্রেঙ।
কয়েকবার উচ্চারণ করে নামটা আত্মস্থ করার চেষ্টা করি। ক্রেঙ, ক্রেঙ, ক্রেঙ। একটু আগে শেখা অন্য নামগুলো আরেকবার ঝালিয়ে নিই। যেসব অচেনা সবজি দেখি, সেগুলোর রান্না পদ্ধতি নিয়েও কৌতূহল। থাঁওয়াপো রান্না সম্পর্কে বলে, এটা ভাজা করে খেলে মজা হয়। পেঁয়াজের মতো দেখতে একটা সবজির ব্যবহার সম্পর্কে সে বলে, এটা তরকারিতে দেয়, ঝাল হয়। আর সুন্দর গন্ধ হয়।
ক্ষণিকের এই মিথস্ক্রিয়া ছেড়ে আমরা বিদায় নিই। কারণ থানচি সেতু থেকে চান্দের গাড়ি ধরে শহরে যাওয়ার তাড়া। থানচি বাজার চক্কর দিয়ে পাহাড় থেকে যখন সমতলে ফিরে আসি তখনো হাতে পাহাড়ি অনুষঙ্গ হয়ে জ্বলজ্বল করতে থাকে খেই মা পরুইদের বাগানের সেই মেটেরঙা আখ।
বাসাবো, ঢাকা