বাঙালি মেয়েদের গায়ের রং শ্যামবর্ণ হলেই নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস লেভেল শূন্য হয়ে যায়। প্রতিটা শ্যামা মেয়ে বেড়ে ওঠে নানান কথা শুনে। পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন এমনকি বন্ধুবান্ধবসহ আশপাশের মানুষদের থেকে নানান কথা শুনেই তার বেড়ে ওঠা। জীবনে জিততে জিততে হেরে যায় অনেক মেয়েই। সমাজের এই অন্ধত্বকে হার মানিয়ে নিজেকে প্রমাণ করেও দিয়েছেন অনেকেই।
তেমনই একজন সফল নারী ডা. রুবাইয়া আলি। জন্মের পরই বাবা-মায়ের সঙ্গে মাত্র তিন বছর বয়সে দেশ ছেড়ে চলে যান আবুধাবিতে। বেড়ে ওঠা সেখানেই। বাবা পেশায় চাকরিজীবী এবং মা ছিলেন শিক্ষক। আবুধাবিতে বাংলাদেশ ইসলামিয়া স্কুলে দিয়ে তার শিক্ষাজীবন শুরু। বাবা-মায়ের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবেন বলে ডাক্তারি পেশা বেছে নেন তিনি। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের আগেই বাবা ছেড়ে চলে যান নাফেরার দেশে। ১৯৮৯ সালে মায়ের সঙ্গে পুনরায় দেশে ফিরতে হয় তাকে। দেশে এসেই ৯ম শ্রেণিতে ভর্তি হন উদয়ন বিদ্যালয়ে। মাধ্যমিক পাশ করে উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হন ভিকারুন্নেসা কলেজে। বাবার স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে ভর্তি হন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে। সেখান থেকে এমবিবিএস পাশ করে ক্যারিয়ারের ফাঁকে নিজেকে সময় দিতে হবে এমন পেশা খুঁজতে নিজ পছন্দে বেছে নেন ডার্মাটোলজিতে পড়ার। নিজের পছন্দকে কাজে লাগানোর প্রচেষ্টায় বিএসএমএমইউ থেকে ট্রেনিং নিয়ে ডিপ্লোমা ডিগ্রি লাভ করেন চর্ম ও যৌন রোগের ওপর। পরে তিনি বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিয়েশনস অ্যান্ড সার্জনস থেকে তার এফসিপিএস সম্পন্ন করে যোগ দেন আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে তিনি অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর এবং বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালনের পর এ্যাপোলো হাসপাতালে ডার্মাটোলজি অ্যান্ড ভেনেরোলজি বিভাগে কনসালট্যান্ট হিসেবে দায়িত্বরত আছেন বলে জানান তিনি। এছাড়া ডার্মাটোলজির ওপর বিভিন্ন দেশে যেমন, ইরান, তুরস্ক, আমেরিকা, ভারতসহ নানান জায়গায় ট্রেনিং করেছেন বিভিন্ন সময়।
পছন্দের ক্যারিয়ার গড়ার পাশাপাশি পছন্দের মানুষও বেছে নেন তিনি। এমবিবিএস শেষেই সংসার শুরু করেন স্বামী ডা. শামসুল আহসান মাকসুদের সঙ্গে। স্বামী, সংসার এবং মাত্র পাঁচ মাসের মেয়েকে নিয়ে জীবনের কঠিন চ্যালেঞ্জকে পাড়ি দিয়ে স্বপ্নের পথে যাত্রা শুরু করেন বলে জানান তিনি। জীবনের এই সফলতায় পৌঁছাতে তার জীবনে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেন তার মা এবং স্বামী। তিনি বলেন, প্রতিটি নারীকেই সবার আগে নিজের জন্য বাঁচাতে হবে, নিজেকে সময় দিতে হবে এবং নিজের স্বপ্নের প্রতি আত্মবিশ্বাস বাড়াতে হবে। আমাদের দেশে মেয়েরা শ্যামবর্ণ হলে তাদের অনেক বাধায় পড়তে হয়; সমাজ ও পরিবারের কাছ থেকে নানান কথা শুনে বেড়ে উঠতে হয়। আমার জীবনেও এই বাধায় সম্মুখীন হয়েছি। তবে আমি কখনই এসব বাধাকে তোয়াক্কা করিনি। নিজের লক্ষ্যে অটুট ছিলাম। আমার গায়ের রংকে আমি কখনই পরিবর্তন করতে চাইনি। আমি সর্বদায় আমার গায়ের রং নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলাম। তবে এখনকার মেয়েরা ফেয়ার লুকের জন্য কত কিছুই না ব্যবহার করে। তারা তাদের ফেয়ার লুক নিয়ে হতাশায় ভোগে। আমার কাছে এমনও রোগী আসে, যাদের মুখে সামান্য পিম্পলসের কারণে কলেজে যাওয়া বন্ধ করে দেয়, নিজের কাজে অফিসে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। এসব মেয়েদের নিয়ে আমি কাজ করতে চাই; তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর জন্য কাউন্সেলিং করতে চাই। তিনি বলেন, আমি নারী দিবসে কখনো সামাজিক মাধ্যমে কিছু লিখি না কারণ, আমি বিশ্বাস করি নারীরা পুরুষের ঊর্ধ্বে। সুতরাং তাদের নিয়ে পুরুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতা চলে না। নারী-পুরুষ একে অপরের পরিপূরক। আর সর্বক্ষেত্রে সফলতার জন্য প্রয়োজন আত্মবিশ্বাস।