ফজলে ইলাহী স্বপন, কুড়িগ্রাম
আলী আহাম্মদ খন্দকার। কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার বিলুপ্ত ছিটমহল দাসিয়ারছড়ায় তার বসবাস। তিনি ছিটমহল থাকাকালীন পঞ্চায়েত নির্বাচন করেছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ ৬৮ বছর নাগরিকত্বহীন থাকায় কোনো উদ্দীপনা ছিল না। বর্তমানে বাংলাদেশের একজন গর্বিত নাগরিক, হাতে পেয়েছেন জাতীয় পরিচয়পত্র। এবারই প্রথম জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেবেন। এ নিয়ে তার কৌতুহল ও আনন্দের শেষ নেই। শুধু আলী আহম্মদ খন্দকারই নন, কুড়িগ্রামের হাজারো মানুষ এখন চায়ের কাপে ঝড় তুলছেন নির্বাচনী আলোচনায়।
আলোচনায় মুখর বিলুপ্ত ছিটবাসী
চায়ের দোকান ও ছোট ছোট হাট-বাজারে আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে চলছে আলোচনার ঝড়। প্রার্থীদের নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। তবে চায়ের কাপে চুমুকের ফাঁকে ফাঁকে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে চোখ বুলিয়ে নির্বাচনী সংবাদের নানা প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। যেন উত্সবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে দাসিয়ারছড়ার সর্বত্র।
আলী আহাম্মদ খন্দকার বলেন, গর্বের সাথে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ভোট দিয়েছি। এখন দেশের সর্বোচ্চ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দিয়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারছি। এর আনন্দটাই আলাদা, যা থেকে আমরা দীর্ঘদিন বঞ্চিত ছিলাম।
দেশের সর্ববৃৃহত্ বিলুপ্ত ছিটমহলে...
আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারাদেশের মতো ভোটের হাওয়া লেগেছে দীর্ঘ ৬৮ বছরের বঞ্চনা থেকে মুক্তির পর সদ্যবিলুপ্ত ছিটমহলগুলোতেও। তবে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার পর প্রথম সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে পারার আনন্দে আত্মহারা দেশের সর্ববৃহত্ ছিটমহল কুড়িগ্রামের দাসিয়ারছড়াসহ ১১১টি ছিটমহলের মানুষ। হাট-বাজার, চায়ের দোকান সর্বত্রই আলোচনায় উঠে আসছে ছিটমহলবাসীদের উন্নয়নের কথা।
২০১৫ সালের ৩১ আগস্ট মধ্যরাতে বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময়ের পর বাংলাদেশের নাগরিকত্ব লাভ করে কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও পঞ্চগড় জেলার ১১১টি ছিটমহলের ৩৭ হাজার ২৬৯ জন মানুষ। ছিটমহলগুলোতে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে প্রায় ২২ হাজার মানুষ। এর মধ্যে দেশের সর্ববৃৃহত্ কুড়িগ্রামের বিলুপ্ত ছিটমহল দাসিয়ারছড়ায় ভোটারের সংখ্যা ৩ হাজার ১৭২ জন।
হাতের মুঠোয় চাঁদ পাওয়া!
দাসিয়ারছড়ার সমন্বয়পাড়া গ্রামের সাবেক পঞ্চায়েত চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম বলেন, জীবনে এই প্রথম বাংলাদেশি নাগরিক হয়ে আসন্ন জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচনে ভোট দেবো, এ যেন হাতের মুঠোয় চাঁদ পাওয়ার মতো আনন্দ। দীর্ঘ ৬৮ বছর পার্শ্ববর্তী এলাকার লোকজনকে ভোট দিতে যাওয়া দেখলেও আমরা ভোট দিতে পারিনি। এবার সেই আশা পূরণে পরিবার-পরিজনদের সাথে নিয়ে অন্যান্যদের সাথে সমান অধিকার নিয়ে ভোট কেন্দ্র যাবো।
দাসিয়ারছড়ার কামালপুর গ্রামের তরুণ আমিনুল ইসলাম, শরীফ উদ্দিন, মনিরুজ্জামান বলেন, আমরা দীর্ঘদিন অন্ধকারে থাকার পর আলোর পথে ফিরে এসেছি। এটা শুধু সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়। নতুন ভোটার হওয়ার পর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জীবনের প্রথম ভোট দিয়ে দেশের সরকার নির্বাচন করতে পারবো বলে গর্ববোধ করছি।
মইনুল হক ও গোলাম মোস্তফা খাঁন বলেন, ৬৮ বছর আমাদের কোনো নাগরিত্ব বা নাগরিক অধিকার বলে কিছু ছিল না। ছিটমহল বিনিময়ের পর আমরা আজ স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক। এটি আমাদের গর্ব ও অহঙ্কার। যে সংসদের মাধ্যমে আমরা দীর্ঘ ৬৮ বছর পর মুক্তি পেয়েছি, সেই সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে পারছি এটা অনেক আনন্দের বিষয়। ছিটমহল বিনিময়ের পর থেকে সরকারের নানামুখি কর্মসূচির আওতায় দেশের উন্নয়নে মূলধারায় একীভুত হওয়া এসব মানুষের আশা নির্বাচিত নতুন সরকার তাদের এ উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখবে। নিজেদের ভাগ্য উন্নয়নের স্বার্থে সত্ ও যোগ্য প্রার্থীকেই ভোট দেওয়ার কথা জানান তারা।
পাঁচটি ভোট কেন্দ্রে..
দাসিয়ারছড়াসহ উপজেলার মোট ভোটার সংখ্যা ১ লক্ষ ২৬ হাজার ৪১১ জন। এর মধ্যে বিলুপ্ত ছিটমহল দাসিয়ারছড়ায় মোট ভোটার সংখ্যা ৩ হাজার ১৭২ জন। পুরুষ ভোটার ১ হাজার ৫৯০ জন ও মহিলা ভোটার ১ হাজার ৮২ জন। উপজেলায় মোট ভোট কেন্দ্র ৫০টি। তবে বিলুপ্ত ছিটমহল দাসিয়ারছড়াবাসীরা পাঁচটি ভোট কেন্দ্রে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। কেন্দ্রগুলো হলো ফুলবাড়ী সদর ইউনিয়নের পশ্চিম কুটি-চন্দ্রখানা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পূর্ব চন্দ্রখান উচ্চ বিদ্যালয়, চন্দ্রখানা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভাঙ্গামোড় ইউনিয়নের আটিয়াবাড়ী ১নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কাশিপুর ইউনিয়নের ছড়ারপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। কুড়িগ্রাম জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম রাকিব জানান, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সদ্যবিলুপ্ত ছিটমহলের ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।