মুশফিক ও মহাকাব্যিক এক জুটি

সাধারণত অত্যন্ত ধীরস্থির ও ঠাণ্ডা মেজাজের মানুষ। কিন্তু উদযাপনের ক্ষেত্রে সবসময় একটু বাঁধনছাড়া থাকেন। গতকাল সেই চেনা উদযাপনকেও ছাপিয়ে গেলেন। সেঞ্চুরি করে যেন বুনো এক উল্লাসে মাতলেন। মুষ্ঠিবদ্ধ হাত শূন্যে ছুড়ে দিলেন, লাফিয়ে উঠলেন শূন্যে, ব্যাট ফেলে দিয়ে চিত্কার করে উঠলেন। যেন কোনো কিছু একটা ঘোষণা করতে চাইলেন মুশফিকুর রহিম।

মুশফিকের এই বাড়তি উত্তেজনা জানতে চাইলে বেশ কিছু কারণ খুঁজে বের করা যায়। এতকাল ধরে টেস্ট ক্রিকেট খেলছেন; মিরপুরে এই প্রথম সেঞ্চুরি পেলেন। সেই সঙ্গে মিরপুরে মুশফিকের দুই হাজার রানও পূর্ণ হলো। কিন্তু এগুলোর কোনোটাই বাঁধনছাড়া করে ফেলার কথা নয়। আসল ব্যাপার হলো, অনেক তর্ক-বিতর্কের পর নিজের প্রিয় কিপিং গ্লাভস ফিরে পেয়েছেন এই টেস্টে এবং ব্যাটিং করছেন পছন্দের ৫ নম্বরে। আর সেখানে নেমেই আবার সেঞ্চুরি দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন, তার পছন্দটাই সেরা ব্যাপার।

মুশফিকের সেঞ্চুরি শুধু দিনের আলোচ্য হতে পারে না। এই দিনটা ছিল মুশফিক ও মুমিনুল হকের অনন্য এক জুটির গল্প। সাত সকালে ২৬ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে ফেলেছিল বাংলাদেশ। সিলেটের মতো আরও একটা ব্যাটিং লজ্জা তখন হাতছানি দিয়ে ডাকছিল বাংলাদেশকে। সেখান থেকেই বাংলাদেশকে টেনে বের করলেন মুশফিক ও মুমিনুল। শেষ বিকেলে মুমিনুল হক ১৬১ রান করে আউট হয়ে যাওয়ায় এই মহাকাব্যিক জুটি ভাঙলো ২৬৬ রানে। তার আগে বাংলাদেশের অনেকগুলো রেকর্ড হয়ে গেল।

বলাই বাহুল্য, চতুর্থ উইকেটে এটা বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ রানের জুটি। এর আগে চতুর্থ উইকেটে বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ রান ছিল ১৮০; শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে লিটন দাস ও মুমিনুল হক গড়েছিলেন জুটিটা এ বছরই জানুয়ারি মাসে।

রানের বিচারে এই জুটিটা বাংলাদেশের ইতিহাসের চতুর্থ সর্বোচ্চ জুটি। মাত্র ১ রান পিছিয়ে আছে জুটিটা আশরাফুল ও মুশফিকের ২০১৩ সালের গল টেস্টে করা ২৬৭ রানের জুটি থেকে। বাংলাদেশের ইতিহাসে যে কোনো উইকেটে সর্বোচ্চ রানের জুটি ছিল সাকিব ও মুশফিকের ৩৫৯। ওয়েলিংটনে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে অবিশ্বাস্য এই জুটি করেছিলেন তারা। এরপর দ্বিতীয় স্থানে আছে তামিম ও ইমরুল কায়েসের করা প্রথম উইকেট জুটির ৩১২ রান; পাকিস্তানের বিপক্ষে খুলনায় ছিল সেই অসাধারণ ম্যাচ বাঁচানো জুটি।

তবে জুটির এইসব রেকর্ড ঘাটতে গেলে একটা দারুণ ব্যাপার আপনার চোখে পড়বে—বাংলাদেশের পক্ষে সেরা দশটি জুটির মধ্যে ৫টিতেই অংশীদার হিসেবে আছেন মুশফিক। তৃতীয় ও চতুর্থ উইকেটের বাংলাদেশের সেরা রান এখন মুশফিক-মুমিনুল জুটির। পঞ্চম উইকেটে সাকিবের সঙ্গে আছেন মুশফিক। ষষ্ঠ উইকেটে আশরাফুলের সঙ্গে আছেন মুশফিক। আর অষ্টম উইকেটের সেরা রানটাও নাঈম ইসলামের সঙ্গে মুশফিকের।

বাংলাদেশের ক্রিকেটের এই অসাধারণ সেবক যে বছরের পর বছর ধরে ক্রিকেটে কী অবদান রাখছেন, তা এইসব রেকর্ডই বলে। গতকাল দিনটা শেষ করেছেন ১১১ রানে অপরাজিত থেকে। এই ইনিংস খেলেছেন ২৩১ বলে এবং ইনিংসে আছে তার ৯টি চার।

মুশফিক উইকেটরক্ষক ছেড়ে দিয়ে চারে খেললে ভালো করবেন, এমন বিশ্বাস করা লোকের সংখ্যা কম নয়। সেটাই হয়েছিল। মাঝে বেশ কিছুদিন তিনি চার নম্বরে খেলেছেন এবং কিপিং করেছেন লিটন দাস। কিন্তু এই সময়ে মুশফিক সেভাবে রান পাননি।

 সেঞ্চুরি পেলেন প্রায় দুই বছর পর। সর্বশেষ সেঞ্চুরি করেছিলেন ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে; ভারতের বিপক্ষে হায়দারাবাদে। এরপর থেকে রানে ছিলেন। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে এ বছর জানুয়ারিতে চট্টগ্রাম টেস্টে মাত্র ৮ রানের জন্য মিস করেছিলেন সেঞ্চুরি। অবশেষে সেই সেঞ্চুরিটা পেলেন প্রিয় জায়গা ফিরে পেয়ে।