মনীষী

ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের জন্মদিনে

আবু সালেহ মোহাম্মদ সায়েম

 

ভাষাসংগ্রামী ও মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত একাধারে আইনজীবী, সমাজকর্মী ও রাজনীতিবিদ। ১৮৮৬ সালের ২ নভেম্বর (১২৯৩ বঙ্গাব্দের ১৬ কার্তিক) ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের উত্তরে রামরাইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা জগবন্ধু দত্ত ছিলেন মুনসেফ কোর্টের সেরেস্তাদার। ১৯০৪ সালে নবীনগর হাই স্কুল থেকে প্রবেশিকা, কলকাতা রিপন কলেজ থেকে ১৯০৮ সালে  বিএ এবং ১৯১০ সালে বিএল পরীক্ষা পাস করেন। ১৯০৬ সালে ছাত্রজীবনে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত তত্কালীন কুমিল্লা মহকুমার মুরাদনগর থানার পূর্বধইর গ্রামের কৃষ্ণকমল দাসমুন্সীর কন্যা সুরবালা দাসকে বিয়ে করেন। কৃষ্ণকমল দাসমুন্সী ছিলেন আইনজীবী। বিয়ের সময় ধীরেন্দ্রনাথের বয়স ছিল ২১ এবং সুরবালার ১৪। দীর্ঘ ৪৩ বছর দাম্পত্যজীবনের অবসান ঘটে ১২ আগস্ট, ১৯৪৯-এ সুরবালার মৃত্যুতে। তাঁদের সাত মেয়ে ও দুই ছেলে।

পেশাগত জীবনের শুরুতে বছরখানেক কুমিল্লার মুরাদনগর বাঙ্গুরা উমালোচন হাই স্কুলের সহকারী প্রধানশিক্ষক ছিলেন। ১৯১১ সালে কুমিল্লা জেলা বারে যোগদান করেন। মহাত্মা গান্ধীর আদর্শ অনুসরণে তিনি ‘মুক্তি সংঘ’ নামে একটি সমাজকল্যাণমূলক সংস্থা গঠন করেছিলেন। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে যোগ দেন। ১৯১৯ সালে ময়মনসিংহ শহরে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। চিত্তরঞ্জন দাশের আহ্বানে তিন মাসের জন্য আইন ব্যবসা স্থগিত রাখেন এবং অসহযোগ আন্দোলনে অংশ নেন। ১৯৩৭ সালে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন সংশোধন এবং বঙ্গীয় কৃষিঋণ গ্রহীতা ও বঙ্গীয় মহাজনী আইন পাসের সঙ্গে ছিলেন সংশ্লিষ্ট। ১৯৪২ সালে ভারত ছাড় আন্দোলনে যোগ দেন। ব্রিটিশবিরোধী কার্যকলাপের জন্য তিনি বেশ কয়েকবার গ্রেফতার হয়ে বিভিন্ন কারাগারে কখনো বিনাশ্রম আবার কখনো সশ্রম দণ্ড ভোগ করেন। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে তিনি কংগ্রেস দলের পক্ষে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। পাকিস্তানের সংবিধান রচনার জন্য ঐ বছর ডিসেম্বরে পূর্ববঙ্গ থেকে তিনি পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৪৭ সালের পর একজন অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিক হিসেবে পাকিস্তানের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৪৮ সালের ২৫ আগস্ট পাকিস্তান গণপরিষদে তিনি অধিবেশনের সকল কার্যবিবরণী ইংরেজি ও উর্দুর পাশাপাশি বাংলাও অন্তর্ভুক্ত রাখার দাবি উত্থাপন করেন। ১৯৫৬ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত আতাউর রহমান খানের মন্ত্রিসভায় পূর্ব পাকিস্তানের স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণ বিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি হওয়ার পর ১৯৬০ সালে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ওপর ‘এবডো’ (Elective Bodies Disqualification Order) প্রয়োগ করা হয়। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় তাঁকে গৃহবন্দি করা হয় এবং এর ফলে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হন। ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ রাতে পুত্র দিলীপকুমার দত্তসহ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে গ্রেফতার করা হয় এবং তাঁদেরকে ময়নামতি সেনানিবাসে নিয়ে হত্যা করা হয়। তাঁর স্মরণে কুমিল্লা শহরে তাঁর বাসভবনের সামনের রাস্তাটির নামকরণ করা হয়েছে ‘ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত সড়ক’। ২০১৭ সালের ১৮ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে তাঁর নামে প্রতিষ্ঠা করা হয়           ই-লাইব্রেরি। শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্মরণে ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যলয়ে ঐ বছরই ছাত্রদের জন্য নির্মিত আবাসিক হলের নাম রাখা হয় ‘শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হল’। কুমিল্লা স্টেডিয়ামের নামকরণ করা হয়েছে ‘ভাষাসৈনিক শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্টেডিয়াম’।ধীধ