মুক্তিযুদ্ধের চেতনা

পৃথিবীর মানচিত্রে যুদ্ধ করে, রক্ত দিয়ে স্বাধীন করেছে এমন দেশের সংখ্যা খুব বেশি নয়। বাংলাদেশ তেমন একটি দেশ, যার জন্য মানুষ রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। আবার একটি দেশে স্বাধীনতার সংগ্রাম যেমন বারবার আসে না, ঠিক তেমনি দেশের সব মানুষও ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও স্বাধীনতার সংগ্রামে অংশ নিতে পারে না বা সম্ভব হয় না। যারা অংশগ্রহণ করতে পারে, তারা এক কথায় সৌভাগ্যবান। এমন সৌভাগ্যবানদের মধ্যে একজন ছিলেন মরহুম ইসমাইল হোসেন। আলহামদুলিল্লাহ, আমিও তাদের দলের একজন। কথা হলো, বাংলাদেশের বর্তমান আর্থসামাজিক অবস্থার জন্য ইসমাইল হোসেনের মতো কৃতী সন্তানকে চলে যেতে হলো তার কর্মের যথাযথ সম্মান না পেয়েই।

পাকিস্তানের অংশ হিসেবে বাংলাদেশের মানুষ, পাকিস্তান আমলে যার নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিকসহ নানাভাবে নির্যাতিত ছিল। পাকিস্তানি শাষকগোষ্ঠী এদেশের মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নিয়ে মানুষের দাবি উত্থাপনের পথ বন্ধের জন্য গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রেখেছিল। সময়ের পরিবর্তনে এই অঞ্চলের মানুষ একপর্যায়ে রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করে। আর তার জন্যই বলা যায় বা বলা উচিত, স্বাধীনতা সংগ্রামের আসল উদ্দেশ্য ছিল অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। সেই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশের সব সরকার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। অর্থনৈতিক মুক্তি ও গণতন্ত্র পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ সরকারের নানাবিধ পদক্ষেপের পরও বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বাংলাদেশের প্রায় ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় অর্ধেক মানুষ এখনো দারিদ্র্যসীমার কাছাকাছি। সম্প্রতি এক সংবাদে প্রকাশ পেয়েছে যে একজন সম্মানিত মুক্তিযোদ্ধাকে মারা যাওয়ার পর বাংলাদেশ সরকারের প্রদত্ত রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদান সম্ভব হয়নি (দৈনিক ইত্তেফাক, ২৫/১০/২০১৯)। মুক্তিযোদ্ধার অভিযোগ ছিল স্থানীয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে। যে প্রশাসন তার মতো একজন মুক্তিযোদ্ধার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক অবস্থা ভালোভাবেই জানার কথা। যে মুক্তিযোদ্ধা তার জীবন দিতে চেয়েছিলেন দেশের স্বাধীনতার জন্য। কিন্তু তার এক ছেলে উপজেলা পর্যায়ে ড্রাইভারের পদে ‘নো ওয়ার্ক নো পে’ ভিত্তিতে কর্মরত ছিল। সংবাদে আরো প্রকাশ পেয়েছে যে মুক্তিযোদ্ধার বক্তব্য ছিল ‘এসিল্যান্ড, ইউএনও, এডিসি, ডিসি তার ছেলেকে চাকরিচ্যুত ও বাস্তুচ্যুত করে পেটে লাথি মেরেছে।’ কথা আসলেই যুক্তিসংগত। জীবদ্দশায় খাবারের নিশ্চয়তা না থাকলে মারা যাওয়ার পর সর্বোচ্চ সম্মানও মূল্যহীন অনেকের কাছে। ঐ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান পিতার কথা রেখে বৈষয়িক পাওয়াকে গুরুত্ব না দিয়ে বাবার ইচ্ছাকে সম্মান করে রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদানে বাধা দেয়।

সরকার এখন মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি মাসে ১২ হাজার টাকা দিচ্ছে, সঙ্গে উত্সব বোনাসও আছে। সরকারের এই পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে প্রসংসার দাবি রাখে। কিন্তু একজন মুক্তিযোদ্ধা যদি কর্মক্ষম না হন এবং তার যদি একটি সংসার থাকে, তাহলে ১২ হাজার টাকা যথেষ্ট নয়। এমন অবস্থায় সন্তানের মঙ্গলের জন্য সরকারের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ওপর নির্ভর করতেই হয়, বিশেষ করে সমাজের এমন উপার্জনশীল ব্যক্তিদের। সরকারের শিক্ষাব্যবস্থার আওতায় লেখাপড়া করে যদি যোগ্য মানুষ হতে না পারে আমাদের সন্তানেরা, তাহলে একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তানের কপালে ‘নো ওয়ার্ক নো পে’ ভিত্তিতে ড্রাইভারের পদ ছাড়া আর কিই বা জুটতে পারে?

১৯৭১ সালে যেসব মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধে গিয়েছিলেন তাদের চিন্তায় ছিল না সন্তানের মঙ্গলের কথা, তখন তাদের চিন্তা-চেতনায় ছিল দেশের কথা, যে দেশ তার সন্তান-সন্ততিকে উপহার দেবে একটি সুন্দর ভবিষ্যত্। শিক্ষা-দীক্ষায় এমন হবে, যেন বিশ্বের মানুষ সম্মান করবে। একপর্যায়ে অন্য দেশের মানুষকে আমরা সাহায্য করব। কিন্তু ভাগ্যের কি পরিহাস, স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরেও আমাদের এসব দৃশ্য দেখতে হয়, তা খুবই কষ্টের।

স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরেও যদি আমাদের সন্তানদের ‘পেটে লাথি’ খেতে হয়, তাহলে আমাদের ব্যর্থতাটা কোথায়, তা বিবেচনার দাবি রাখে। সন্তানদের একটি সুন্দর ভবিষ্যত্ উপহার দেওয়া যেমন প্রত্যেক পিতামাতার কর্তব্য, তেমনি আমাদের ওপরও এখন এই দায়িত্বের ভার এসে পড়েছে। ভবিষ্যত্ প্রজন্মের জন্য একটি সংহতিপূর্ণ সমাজ গড়ে দেওয়া আমাদের একান্ত কর্তব্য। এই দায়িত্ব পালনে নেতৃত্ব প্রদান করতে হবে সরকারকে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খাদ্যেও নিশ্চয়তা দিতে হবে প্রত্যেক নাগরিককে, স্বাবলম্বী করে তুলতে হবে প্রত্যেককে। সামগ্রিক উন্নয়ন একটি আবশ্যিকতায় পরিণত হয়েছে। এ কাজে ব্যর্থ হলে ইসমাইল হোসেনের মতো অসংখ্য সোনার মানুষকে এভাবে হারাতে হবে আমাদের, যা আমাদের জন্য হবে লজ্জার এবং অপূরণীয় ক্ষতি।

n লেখক :চেয়ারম্যান, এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন—ইডিএ