নির্বাচন ঘিরে চাঙ্গা অর্থনীতি

এম. এ. মাসুম

 

দীর্ঘ বিরতির পর আবার নির্বাচনী আমেজে সরগরম হয়েছে সারা দেশ। আসন্ন একাদশ সংসদ নির্বাচন সব দল অংশ গ্রহণ করায় নির্বাচনের দিন যতই এগিয়ে আসছে ততই স্ফীত হচ্ছে ভোটের অর্থনীতি।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যয় ছাড়িয়ে যাবে ৪ হাজার কোটি টাকা। প্রার্থীদের ন্যূনতম ব্যয়, ইভিএম প্রকল্পে বরাদ্দ, নির্বাচন কমিশন ও আইন-শৃঙ্খলা সংস্থার ব্যয়, ভাতা ও আনুষঙ্গিক কাজে বিপুল এ খরচ হবে।

জাতীয় নির্বাচনের ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাচ্ছে। পাঁচ বছরে বিদ্যমান মূল্যস্ফীতির তুলনায় এ ব্যয় বেড়েছে প্রায় দেড় গুণ। ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের বাজেট ছিল প্রায় ৫শ কোটি টাকা। যদিও শেষ পর্যন্ত সব আসনে নির্বাচন না হওয়ায় ব্যয় হয় ২৮৩ কোটি টাকা। এবারের জন্য নির্বাচন কমিশন (ইসি) এখন পর্যন্ত ব্যয় ধরেছে ৭৩২ কোটি টাকা। তবে ইভিএম কেনার খরচ এ বাজেটের মধ্যে নেই।

এদিকে ইসি নির্বাচনের ব্যয় বাড়ালেও প্রার্থীদের ব্যয়সীমা একই রেখেছে। ২০১৪ সালের মতোই প্রার্থীর ব্যয়ের সীমা ২৫ লাখ টাকা। তবে ভোটারপ্রতি সর্বোচ্চ ব্যয় ৮ টাকার পরিবর্তে ১০ টাকা করা হয়েছে। কিন্তু নির্বাচন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বাস্তবে প্রার্থীরা অনেক বেশি টাকা খরচ করেন। এবারের নির্বাচনে ৩০০ আসনের জন্য প্রায় ১২ হাজারের কাছাকাছি মনোনয়নপত্র বিক্রি করা হয়েছে যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। ফরম কিনতে প্রার্থীদের প্রায় ৩৬ কোটি টাকা খরচ করতে হয়েছে। এদিকে মোট ৩,০৬৫ জন মনোনয়ন জমা দিয়েছেন তার মধ্যে ২,২৭৯ জনকে বৈধ প্রার্থী হিসাবে ঘোষণা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। আরও বেশ কিছু প্রার্থী ইসিতে আপিল করেছেন মনোনয়ন বৈধ করার জন্য। যদি ৩,৫০০ জন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তা হলে সরকারি হিসাবে প্রার্থীদের খরচ হবে ৮৭৫ কোটি টাকা।

নির্বাচন কমিশন সূত্র জানা যায়, ১৯৯৬ সালে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচন পরিচালনা ব্যয় ছিল ৭ কোটি ৬২ লাখ ৯৬ হাজার ৩০১ টাকা। অন্যদিকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার ব্যয় ছিল ২৯ কোটি ৪১ হাজার টাকা। অথচ ওই নির্বাচনের কয়েক মাস পর সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনা ব্যয় যেখানে ছিল ১১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা সেখানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার ব্যয় ছিল ১৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচন পরিচালনা ব্যয় ছিল ৩০ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। অন্যদিকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার ব্যয় ছিল ৪২ কোটি ৮ লাখ টাকা। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচন পরিচালনা ব্যয় ছিল ৬৭ কোটি ২১ লাখ টাকা। অন্যদিকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার ব্যয় ছিল ৯৭ কোটি ৭৯ লাখ টাকা।

২০১৮-১৯ অর্থ বছরের বাজেটে সরকার ১ হাজার ৮৯৫ কোটি টাকা নির্বাচন কমিশনের জন্য বরাদ্দ রেখেছেন বলে জানা যায়। ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে ছিল ৯৫৩ কোটি টাকা। দেখা যাচ্ছে, ২০১৮-১৯ সালের বরাদ্দ পূর্বের বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। মনে করা হচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখেই এ বছর বাজেট বরাদ্দ বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে। জানা যায়, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য নির্বাচন কমিশন ৭৩২ কোটি টাকা ব্যয় অনুমোদন দিয়েছে। ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) প্রকল্পের আংশিক বাস্তবায়নে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে।

এবার ২ শতাধিক ব্যবসায়ী নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করছেন। ফলে ব্যাপক টাকার প্রবাহ ঘটার সম্ভাবনা আছে। নির্বাচনকে ঘিরে যানবাহন, প্রিন্টিং, আপ্যায়ন, মাইকিং, সামাজিক গণ মাধ্যম ব্যবহারে বিপুল অর্থ ব্যয় হবে। নির্বাচনে গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হতে পারে। বিপুল সংখ্যক মানুষের সমাগম এবং টাকার প্রবাহের ফলে গ্রামীণ দ্রব্য সামগ্রী ক্রয় বিক্রয় বাড়বে। জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে হাজার হাজার কোটি টাকা অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এর ফলে টাকার প্রবাহের গতি বাড়তে পারে। ইতোমধ্যেই ব্যানার-ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে শহর ও গ্রামের অনাচে কানাচে। চায়ের দোকান, মুদি দোকান, বিলাসবহুল শপিং মল, হোটেল, রেস্তোরাঁয় চলছে নির্বাচনী আড্ডা ও প্রচার-প্রচারণা যার প্রভাব পড়ছে অর্থনীতিতে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তরের দিক সম্পর্কে নির্বাচনী ইশতেহারে সুস্পষ্ট প্রতিফলন থাকা উচিত। এলডিসি উত্তরণে উন্নয়ন রাষ্ট্র থেকে উদ্যোক্তা রাষ্ট্রে যেতে হবে। আর উদ্যোক্তা তৈরির জন্য সরকারি নীতিগত সহায়তা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।