চট্টগ্রামে খালের জমিতে সাড়ে তিন হাজার বহুতল ভবনসহ নানা অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। সর্বোচ্চ ১৬তলা ভবন পর্যন্ত খালের জমিতে নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ভবন, আবাসিক হোটেলসহ বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা ও ব্যক্তি মালিকানাধীন ভবন রয়েছে। বহুতল ভবনগুলোর অধিকাংশই সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের বলে জানা গেছে।
চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের আওতায় নগরীর ৩৬টি খালের সীমানা নির্ধারণ করতে গিয়ে ওই সব অবৈধ বহুতল ভবন ও স্থাপনা পাওয়া যায়। ৯৭ দশমিক ৭ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ৩৬টি খালের মধ্যে ইতিমধ্যে ৩৪টি খালের সীমানা নির্ধারণ ও উচ্ছেদ কাজ সম্পন্নের পথে বলে জানানো হয়েছে। বাকি দুটি পাকিজা খাল ও চট্টেশ্বরী খালের সঠিক লোকেশান উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। গত জুলাই থেকে সিডিএর তত্ত্বাবধানে এ পর্যন্ত একটি বেসরকারি সার্ভে প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে সার্ভে ও সীমানা নির্ধারণের কাজ পরিচালিত হচ্ছে।
জানা যায়, সরকারের বিএস জরিপ অনুযায়ী খালগুলোর সীমানা চিহ্নিত করা হচ্ছে। সিডিএর আইন অনুযায়ী খাল সংলগ্ন এলাকায় ভবন ও স্থাপনা নির্মাণ করতে হলে খালের সীমানা থেকে ১২ ফুট পর্যন্ত জায়গা (বাপারল্যান্ড) খালি রাখতে হয়। সিডিএ তার আইন অনুযায়ী উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করলে সে ক্ষেত্রে আরো কয়েক হাজার ভবন ও স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হবে। সিডিএর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, এমনিতে খালের জায়গা উদ্ধার করতে গিয়ে তাদের ত্রাহি অবস্থা। পুরো আইন মানতে গেলে কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হতে হবে। সিডিএ কর্তৃক গৃহীত নগরীর জলাবদ্ধতা প্রকল্পের মূল বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। এক্ষেত্রে সিডিএ খালের জন্য জমি অধিগ্রহণ ও উচ্ছেদের দায়িত্ব পালন করছে।
এদিকে নগরীর খালের সীমানা উদ্ধারে গিয়ে যেসব ভবন ও স্থাপনা পাওয়া যায় তার বেশির ভাগের নকশা সিডিএ থেকে অনুমোদিত বলে দাবি করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ভবন মালিকদের মতে সিডিএ থেকে প্ল্যান গ্রহণের সময় সিডিএ থেকে কোনো আপত্তি করা হয়নি। সিডিএ তাদের দেওয়া তথ্য ও নকশা উপস্থাপনের মাধ্যমে অনুমোদন পেয়েছে। তাছাড়া একটি ভবন নির্মাণ করতে কয়েক বছর সময় লেগেছে। এর মধ্যেও সিডিএর সংশ্লিষ্ট এলাকার পরিদর্শক কিংবা অথরাইজড বিভাগ থেকে কোনো আপত্তি আসেনি। কিন্তু ভবন ও স্থাপনা নির্মাণের ২০ থেকে ৩০ বছর পর সিডিএ বলছে খালের জমির ওপর স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে।
নগরীর সুগন্ধা আবাসিক এলাকার এক ভবন মালিক জানান, সিটি করপোরেশন থেকে ৪ কাঠার প্লট কিনে ৯৩ সালে ভবন নির্মাণ করেছি। কিন্তু এখন বলা হচ্ছে ভবনের অধিকাংশ খালের জমিতে পড়েছে। নগরীর ফয়স লেক এলাকায় বাংলাদেশ টেলিভিশন চট্টগ্রাম কেন্দ্রের পাশে ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (ইউএসটিসি) ১৬ তলা বিশিষ্ট ভবন গয়না ছড়া খাল সংলগ্ন খাস জমির ওপর নির্মাণ করা হয়েছে। সিডিএ থেকে জানানো হয়, সিডিএর মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী ওই জায়গা খালের মাটি-বালি সংরক্ষণাগার হিসেবে ব্যবহূত সিলটেপ এর জন্য রাখা হয়েছে। নগরীর প্রবর্ত্তক মোড় এলাকায় গড়ে ওঠা বহুল আলোচিত প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনটি অধিকাংশ অংশ খালের ওপর নির্মিত। এটি হিজড়া খালের ওপর নির্মাণ করা হয়েছে।
সিডিএর উচ্ছেদ কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত এক কর্মকর্তা জানান, এটি ভেঙে ফেলার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সময় নিয়েছে। নগরীর সিডিএ আবাসিক এলাকার সম্মুখে হিজড়া খাল ঘেঁষে কোনো প্রকার ইমারত বিধিমালা না মেনে হোয়াইটেন নামক আবাসিক হোটেল নির্মিত হয়েছে। এটি হিজড়া খালের শুরুর অংশে নির্মিত হয়েছে। নগরীর আগ্রাবাদ ফায়ার সার্ভিস এলাকায় নাসির খাল সংলগ্ন সুলতান কলোনি এলাকায় সাততলা বিশিষ্ট জাবেদ টাওয়ার নির্মিত হয়েছে। এটি স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরের মালিকানাধীন বলে সিডিএ থেকে জানা যায়। এই বহুতল ভবনের বেশ কিছু অংশ খালের জায়গায় পড়েছে বলে জানা গেছে।
১৯৯৫ সালে চট্টগ্রাম মহানগরীর জন্য সিডিএ কর্তৃক যে মাস্টার প্ল্যান নির্মাণ করা হয়েছিল তা এ পর্যন্ত অনুসরণ না করায় অবৈধ ভবন ও স্থাপনা যত্রতত্র গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে মাস্টার প্ল্যানে নগরীর নতুন খাল নির্মাণ এবং পুরোনো খালগুলোর কোথায় কীভাবে সংস্কার করতে হবে তা স্পষ্ট উল্লেখ ছিল। সংশ্লিষ্ট নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী সিডিএ নকশা অনুমোদনসহ সার্বিক কর্মকাণ্ড চালালে নগরীতে যেমন অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মিত হতো না। একইভাবে নগরীর জলাবদ্ধতাও ভয়াবহ রূপ লাভ করত না।
সিডিএর জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের পরিচালক নির্বাহী প্রকৌশলী আহমদ মঈনুদ্দিন জানান, সীমানা চিহ্নিত খালসমূহের পাশে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা গেলে নগরীর ৮০ শতাংশ জলাবদ্ধতা নিরসন হবে। অপরদিকে নগরীর অভ্যন্তরে থাকা ছোটো ছোটো নালা-নর্দমাসমূহ পরিষ্কার থাকলে অভ্যন্তরীণ পানিসমূহ সহজে খালে গিয়ে পড়তে পারলে নগরবাসী জলাবদ্ধতা থেকে রেহাই পাবে।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী শাহিনুল ইসলাম খান বলেন, খালের জমিতে বা খালের পাশে ভবন নির্মাণকারীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে মিথ্যা তথ্য দিয়ে নকশা অনুমোদন নিয়েছে। আবার অনেকে নকশা বহির্ভূত ভবন নির্মাণ করেছে। তিনি স্বীকার করে বলেন, অনেক ক্ষেত্রে সিডিএ কর্তৃক জমির দলিলপত্র যাচাই করার ক্ষেত্রে তাদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।