‘কঠিন চীবর দানোত্সব’

মো. নিজাম উদ্দিন লাভলু

রামগড়

 

কঠিন চীবর দানোত্সব পার্বত্য চট্টগ্রামের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী চাকমা ও মারমাদের অন্যতম ধর্মীয় অনুষ্ঠান। মাসব্যাপী এ দানোত্সব চলছে পাহাড়ের বৌদ্ধ বিহারগুলোতে। বুদ্ধের প্রজ্ঞাদীপ্ত শিক্ষা ‘বর্ষাবাস’ পালনের সমাপনী অনুষ্ঠান শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা এবং দানোত্তম কঠিন চীবর দান উত্সব হলো বৌদ্ধদের পবিত্র ধর্মীয় অনুষ্ঠান। এ উত্সবের মধ্য দিয়ে বৌদ্ধরা তথাগত গৌতম বুদ্ধের পরম কল্যাণময় শিক্ষা চর্চার ব্রত হয়। হিংসা ক্রোধ ও মোহের বদলে প্রেম, দয়া ও ক্ষমায় মানুষের কল্যাণে তপস্যা ভিক্ষুদের। বৌদ্ধ ভিক্ষুদের পরিধেয় বস্ত্রকে বলা হয় চীবর। তাই এ বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের পরিধেয় বস্ত্রের অভাব দূর করতেই কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠান। তাই বৌদ্ধদের কাছে প্রবারণা পূর্ণিমা ও কঠিন চীবর দান অত্যন্ত গুরুত্ববহ অনুষ্ঠান। কঠিন চীবর সারাবছর দান করা যায় না। বছরে মাত্র ৩০ দিন এই দান করা যায়। আশ্বিনী পূর্ণিমার পরবর্তী দিন থেকে শুরু করে কার্তিকী পূর্ণিমা পর্যন্ত এই ৩০ দিন কঠিন চীবর দানের কাল। বিশেষ সময়কালে দান করতে হয় বলে তাকে কাল দান বলা হয়। এ বছর প্রবারণা পূর্ণিমার পরদিন, অর্থাত্ ১৪ অক্টোবর থেকে কঠিন চীবর দানোত্সবের শুরু হয়েছে। চলবে ১১ নভেম্বর পযন্ত।

কঠিন চীবর দানোত্সবের সূচনা সম্পর্কে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা বলেন, বুদ্ধ শ্রাবস্তীর জেতবন বিহারে বাস করাকালীন কোশলরাজের বৈমাত্রেয় ভ্রাতা ৩০ জন ভিক্ষুকে উদ্দেশ্য করে কঠিন চীবর দানের অনুমতি প্রদান করেছিলেন।

কোনো এক সময় পাবেয়্যবাসী উক্ত ৩০ জন ভিক্ষু পাবা নগর থেকে শ্রাবস্তীর জেতবনে বুদ্ধের দর্শন লাভের উদ্দেশ্যে বের হন। তখন বর্ষাবাসের মাত্র দুই-একদিন বাকি ছিল। তাই তারা শ্রাবস্তীতে পৌঁছাতে না পেরে সাকেত শহরেই বর্ষাযাপন করেন। বর্ষাবাস শেষ হলে তারা বুদ্ধের দর্শনে আসেন। তাদের পরনের চীবর ব্যতীত আর কোনো অতিরিক্ত পোশাক ছিল না। একটি চীবরেই স্নান করতে হতো, আবার শুকিয়ে গেলে গায়ে দিতে হতো। এভাবে রোদ-বৃষ্টিতে ওই এক জোড়া চীবর এক সময় ছিঁড়ে গিয়েছিল। এভাবে ছেঁড়া চীবর গায়ে দিয়েই অত্যন্ত ক্লান্ত দেহে তারা শ্রাবস্তীর জেতবনে বুদ্ধের নিকট গমন করেন। বুদ্ধ চিন্তা করলেন, আমি যদি কঠিন চীবরের অনুমতি দিতাম তাহলে এ ভিক্ষুরা দোয়াজিকখানি রেখে অন্য একটি পরিধান করে এলে এত কষ্ট পেতেন না। কঠিনের অনুমতি পূর্বের বুদ্ধরাও প্রদান করেছেন তা দিব্যজ্ঞানে দর্শন করে বুদ্ধ বললেন, ভিক্ষুগণ সঠিকভাবে কোনোদিন ভঙ্গ না করে প্রথম বর্ষাবাস পালনকারী ভিক্ষু কঠিন চীবর গ্রহণ করতে পারবে। আমি (বুদ্ধ) অনুমতি প্রদান করছি। এভাবে বুদ্ধ প্রথম কঠিন চীবর দান ও গ্রহণের অনুমতি দিয়ে দাতা ও গ্রহীতা উভয়ের জন্য পূণ্য সঞ্চয়ের দুর্লভ সুযোগ দান করেন।

জগতের অন্যান্য দানে শুধুমাত্র দাতারাই দানের ফল প্রাপ্ত হন। কিন্তু এই কঠিন চীবর দানই একটি মাত্র দান, যে দানে দু-পক্ষই মহাফল লাভ করে। এ সকল বিবেচনা করেই বুদ্ধ কঠিন চীবর দানের অনুমতি দিয়েছিলেন। অতি পূণ্য লাভের আশায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী চাকমা ও মারমা সম্প্রদায়ের মানুষ  চীবর দানে মরিয়া হয়ে ওঠেন।

খাগড়াছড়ি মারমা উন্নয়ন সংসদের সভাপতি বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব মংপ্রু চৌধুরী বলেন, ‘এক সময়, মারমা ও চাকমা সম্প্র্রদায়ের নারীরা দানের জন্য চীবর নিজের হাতে তৈরি করতেন। পাহাড়ের জুমে কার্পাস তুলা ফলিয়ে সেই তুলা থেকে সুতা তৈরি করতেন। বন-জঙ্গলের বিশেষ গাছের কস দিয়ে রঙ তৈরি করে সুতাগুলো রঙিন করা হতো। সেই সুতা দিয়ে কোমর তাঁতে নারীরা দানের চীবর বানাতেন। আর এ কাজটা করা হতো একদিনের মধ্যে। কালের বিবর্তনে এখন আর নিজের হাতে এ চীবর তৈরি করে দান করা সম্ভব হয় না। বাজার থেকে কিনে দান করা হয় এখন। তবে আগের ঐতিহ্য লালন করতে নারীরা এখন নিজেরা কোমর তাঁতে ছোট একখণ্ড কাপড় বুনে তা বাজার থেকে সংগৃহীত চীবরের সঙ্গে সংযুক্ত করে দেন।’

কঠিন চীবর দানোত্সব অনুষ্ঠানের অন্যান্য পর্বের মধ্যে থাকে পবিত্র মঙ্গলাচরণ পাঠ, ভোরে পরিত্রাণ পাঠ, পুষ্প পূজা ও ভিক্ষু সংঘের প্রাতরাশ, জাতীয় পতাকা ও ধর্মীয় পতাকা উত্তোলন, বুদ্ধ পূজা, শীল গ্রহণ, সংঘ দান ও ভিক্ষু সংঘের ধর্ম দেশনা, অনুত্তর পুণ্য ক্ষেত্র ভিক্ষু সংঘকে পিণ্ড দান, দানোত্তম কঠিন চীবর দান এবং ধর্মোপদেশ। সন্ধ্যায় প্রদীপ প্রজ্জ্বলন ও ফানুস ওড়ানোর মাধ্যমে শেষ হয় এ উত্সব।