১৩ বছরে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

সবুজ টিলায় ঘেরা স্বপ্ন

 

খলিলুর রহমান ফয়সাল

 

প্রকৃতিগতভাবে সিলেটের লোক শরীফ মেজাজের। অপরদিকে বৌদ্ধ, হিন্দু ও মুসলিম সাধকদের পদচারণায় সিলেট অঞ্চল ধন্য হয়েছে। শাহ আব্দুল করিম, হাছন রাজা, রাধারমণ দত্ত, আছিম শাহ, কালু শাহ’সহ অসংখ্য আউল-বাউল আর সাধু-সন্ন্যাসীর জন্মস্থান সিলেট। তাদের রচিত প্রাণ-জুড়ানো, হূদয়-নিংড়ানো বিখ্যাত দেহতত্ত্ব, ভক্তিমূলক, অনুরাগ আর প্রেম-ভালোবাসার সুরে রচিত গানগুলো বিশ্বখ্যাত। পৃথিবীর ৩ হাজার স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাষার মধ্যে ফ্রান্সের বিখ্যাত ভাষা জাদুঘরে বাংলাদেশের দুটি ভাষা লিপিবদ্ধ রয়েছে। একটি বাংলা, অপরটি সিলেটের আঞ্চলিক সিলেটি ভাষা। সিলেটি ভাষার আবার নাগরী নামে লেখ্য রূপও রয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে সিলেট বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করছে। এই সমস্ত গৌরবগাঁথা সংবলিত ইতিহাস সিলেটবাসীকে আলাদা মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। তাদের বাংলাদেশের সকল জনগোষ্ঠী থেকে স্বতন্ত্র সিলেটি হিসেবে জায়গা করে দেয় ইতিহাসের পাতায়। এই অঞ্চলের চারদিকই প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ঘেরা। প্রকৃতির মাঝে রয়েছে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

কৃষি বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রসরমান বিশ্বের সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা, সমতা অর্জন, জাতীয় পর্যায়ে উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্র সৃষ্টি, আধুনিক জ্ঞান চর্চা, কৃষি বিজ্ঞানের সঙ্গে সম্পর্ক যুক্ত আনুষাঙ্গিক অন্যান্য বিষয়ে শিক্ষাদান, গবেষণা ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম পরিচালনা, নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও জাতির কল্যাণে হস্তান্তরের উদ্দেশ্যে ১৩ বছর আগে একটি বড় স্বপ্ন তৈরি হয়। অপার সম্ভাবনার সেই স্বপ্নটি ১৩ বছর পর সাফল্য হিসেবে প্রকাশ পেয়েছে। ২০০৬ সালের ২ নভেম্বর উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সামগ্রিক কৃষি ব্যবস্থাকে উন্নত করতে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। সিলেট বিভাগীয় শহর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার পূর্বে এবং রাজধানী ঢাকা থেকে ২৪০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে টিলাগড় নামক স্থানে ২০.২৩ হেক্টর (৫০ একর) জায়গা নিয়ে গড়ে উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাস। এছাড়াও মূল ক্যাম্পাস থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে তামাবিল বাইপাস রাস্তার উত্তর পাশে বিকেএসপি’র পূর্ব দিকে ৪.৯৭ হেক্টর (১২.২৯ একর) এলাকায় বহিঃক্যাম্পাস হিসেবে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের গবেষণা মাঠ গড়ে তোলা হয়েছে।

সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনায় হাওরের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছে এখানকার গবেষকরা। হাওরে বছরে ৭/৮ মাস চারদিকে থৈ থৈ পানি থাকে। শুধুমাত্র বসতভিটার উঁচু জায়গাটুকুই দ্বীপের মতো ভাসমান থাকে। সিকৃবির প্রচেষ্টায় সেখানে ফিরে এসেছে সচ্ছলতা। বোরো ফসল নির্ভর হাওরাঞ্চলে এক সময় শীতকালেও মাঠের পর মাঠ পতিত থাকতো। ২০১৫ সাল থেকে সুনামগঞ্জের দেকার হাওর’সহ বিভিন্ন হাওরের প্রান্তিক কৃষকদের জীবনমান উন্নয়নে সিকৃবি নানাবিধ পদক্ষেপ নিয়েছে। সিকৃবির মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের সহায়তায় কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন (কেজিএফ)-এর অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পে বিভিন্ন মৌসুমে লাগসই প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে প্রান্তিক জনপদের প্রভূত উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। প্রকল্পের প্রধান গবেষক প্রফেসর ড. মো. আবুল কাশেম, প্রফেসর ড. মো. আবু বকর সিদ্দিক, প্রফেসর ড. মো. শহীদুল ইসলাম, প্রফেসর ড. জসিম উদ্দিন আহাম্মদ. পিএইচ.ডি ফেলো সহযোগী প্রফেসর মো. আব্দুল আজিজ, গবেষণা সহযোগী মান্না সালওয়াসহ অন্যান্য গবেষকদের সার্বিক তত্ত্বাবধানে লাগসই ধান চাষ, সবজি চাষ, মাছ চাষ, গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন, কবুতর পালনসহ নানাবিধ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

সিকৃবি আরেকটি গবেষণাও চোখে পড়ার মতো। টমেটো বা শিম এখন আর শুধুমাত্র শীতকালে চাষ হবে না। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. শহীদুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে শিমের গ্রীষ্মকালীন নতুন দুটি জাত অনুমোদন পেয়েছে। প্রোটিন সমৃদ্ধ এই জাতগুলোর তিনি নাম দিয়েছেন  সিকৃবি শিম-১ ও সিকৃবি শিম-২। এই জাত সিলেট অঞ্চলে বছরব্যাপী ধরে প্রোটিনের চাহিদা মেটাবে বলে আশা করা যাচ্ছে। সিলেট অঞ্চলের কৃষি আবহাওয়া সম্পর্কিত তথ্য জানার জন্য প্রথমবারের মতো স্থাপন করা হয়েছে অটোমেটেড অ্যাগ্রোমেটিওরোলজিক্যাল স্টেশন। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষি বনায়ন ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের ক্লাইমেট স্মার্ট এগ্রিকালচার ল্যাবের তত্ত্বাবধানে এ অত্যাধুনিক অ্যাগ্রোমেটিওরোলজিক্যাল স্টেশনটি চালু করা হয়েছে।

ছোটবড় টিলা পরিবেষ্টিত ৫০ একর আয়তনের মনোরম সিকৃবি ক্যাম্পাস। সবুজে ঘেরা, ছোট ছোট টিলা ক্যাম্পাসের পরিবেশকে আরো মোহনীয় করে তুলেছে। আয়তনে ছোট হলেও এর রূপ-সৌন্দর্য আমাদের হূদয়ে আলাদা একটা টান ও ভালোবাসা জন্মায়। প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে দেখেছি কীভাবে ফিনিক্স পাখির মতো উঠে দাঁড়িয়েছে আমার প্রিয় ক্যাম্পাসটি। সিকৃবির শিক্ষার্থীরা এখানকার বিভিন্ন সংগঠনে যোগ দিয়ে নিজেদের আত্মবিশ্বাস আরো বাড়িয়েছে। বিশেষ করে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো মননশীল চিন্তা করতে সাহায্য করছে।

স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর বাবা-মা তাদের সন্তানদের মাথায় শুধু ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার ভূত চাপিয়ে দেন। কিন্তু কৃষিও একটি মহান পেশা। শুধুমাত্র কৃষিবিদদের গবেষণা ও পরিশ্রমের ফলে কৃষক আজ টনকে টন ধান, পুকুর ভরা মাছ ঘরে তুলছে, মাংস ও ডিমের মাধ্যমে আমিষের চাহিদা মেটাচ্ছে। দেশের চাহিদা মিটিয়েও বছরে ২-৩ লাখ টন চাল রপ্তানির সক্ষমতা অর্জিত হয়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমার থেকে হুট করে কয়েক লাখ মানুষ আমাদের দেশে ঢুকে পড়ে।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর ১৩ বছরে দাঁড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটদের মান নিয়ে সবাই গর্ব করছে। তবে আমার কাছে আবেগের আরেকটি নাম সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। নবান্নকে সামনে রেখে ছায়া-সুনিবিড়, সবুজ টিলায় ঘেরা ছোট্ট সুন্দর ক্যাম্পাসের জন্মদিনে প্রতিটি ধূলিকণায় যেন রঙ লেগেছে। এর রঙ ছড়িয়ে পড়ুক বিশ্বময়।