দুর্দশায় আটকে আছে ব্যাংকিং খাত :সিপিডি

 ইত্তেফাক রিপোর্ট

দেশে আর্থিক খাতে সংস্কার না করে প্রণোদনা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হচ্ছে। যারা এই প্রণোদনা বা ভর্তুকির অর্থে লাভবান হচ্ছে তারা আর্থিক খাতে সংস্কার হতে দিচ্ছে না। গতকাল রবিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়নে বাংলাদেশের উন্নয়নের স্বাধীন পর্যালোচনা, ২০১৯-২০ অর্থবছর প্রারম্ভিক মূল্যায়ন শীর্ষক প্রতিবেদনে এমন তথ্য তুলে ধরেছে সেন্টার ফর পলিসি ডয়ালগ (সিপিডি)। এসময় বাংলাদেশের রাজস্ব খাত, ব্যাংক, পুঁজিবাজার এবং বৈদেশিক লেনদেনের সার্বিক অবস্থা তুলে ধরে বিশ্লেষণ করেন যথাক্রমে সিপিডির সিনিয়র রিসার্স ফেলো ড. তৌফিকুল ইসলাম খান, নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ও সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান। বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, দেশের প্রবৃদ্ধির যে হিসাব দেওয়া হচ্ছে সেটি সুতাকাটা ঘুড়ি কিংবা সুতাকাটা বেলুনের মতো। অর্থনীতির অন্য হিসাবের সঙ্গে এর সংযোগ নেই। বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, বিগত কয়েক বছর যাবত্ দেশের ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ জিডিপির ২৩ ভাগে আটকে আছে; কিন্তু জিডিপি প্রবৃদ্ধি পাঁচ থেকে ছয়-সাত-আট ভাগে উন্নীত হয়েছে। তিনি বলেন, ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে; কিন্তু প্রবৃদ্ধি বাড়ছে, দেশের পুঁজিবাজারে বড়ো ধরনের সংকট চলছে কিন্তু প্রবৃদ্ধি বাড়ছে, আমদানি প্রবৃদ্ধিও কমেছে। ব্যক্তি শ্রেণি বলছে, তারা ব্যবসায় লাভ করতে পারছেন না। তারপরেও প্রবৃদ্ধি বাড়ছে, এটা কীভাবে সম্ভব হচ্ছে? সংস্কারের অভাবে যারা লাভবান হয়েছেন, তারাই সংস্কার করতে দিচ্ছেন না। অর্থাত্ যারা কর না দিয়ে টাকা বিদেশে পাচার করে এবং ব্যাংকের টাকা নিয়ে ফেরত দিচ্ছেন না, পুঁজিবাজারের টাকা নিয়ে ফটকাবাজি করেন, সরকারি প্রকল্পের টাকা নিয়ে অতিমূল্যায়িত করছেন, তারা সংস্কারের শত্রু হিসাবে এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছেন। প্রবৃদ্ধির হিসাব তৈরি করা সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংলাপ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি। তিনি বলেন, দেশে এক নীতিকেন্দ্রিক উন্নয়নব্যবস্থা চলছে। বিনিয়োগ যা হচ্ছে পুরোটাই রাষ্ট্র করছে। মূলত অবকাঠামো নির্ভর উন্নয়নের সঙ্গে বাণিজ্য, রাজস্ব বা অর্থনীতির অন্য চলকগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক অনেক দুর্বল। সরকারি প্রণোদনা নির্ভর অর্থনীতিতে বৈষম্য বাড়বে। বিশ্বে আরেকটি মন্দার পদধ্বনি দেখা যাচ্ছে। এরকম অবস্থায় নীতিকাঠামো পরিবর্তন করতে হবে। ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান যেমন সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নির্দেশ এসেছে, তেমনি আর্থিক খাতে সংস্কারের জন্য সরকারি সর্বোচ্চ পর্যায় হতে নির্দেশ আসতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন ব্যাংকিং খাত নিয়ে বিশ্লেষণ তুলে ধরে বলেন, ব্যাংক হলো অর্থনীতির হূিপণ্ড; কিন্তু ব্যাংকিং খাত দুর্দশায় আটকে আছে। এ পরিস্থিতি কাটাতে উপায় থাকলেও নীতিনির্ধারকদের উদ্যোগে ঘাটতি রয়েছে। খেলাপি ঋণ আদায় হলে টাকার অঙ্ক যা দাঁড়াত তার পরিমাণে বাংলাদেশের চলমান অনেক প্রকল্প যেমন—তিনটি পদ্মা সেতু অথবা তিনটি পদ্মা রেলওয়ে ব্রিজ, তিনটি মাতারবাড়ী পাওয়ার প্লান্ট, পাঁচটি মেট্রোরেল অথবা সাতটি রামপাল বিদ্যুেকন্দ্রে ব্যয়ের সমান হতো। খেলাপি ঋণ জুন পর্যন্ত ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। শক্ত হাতে খেলাপি ঋণ দমন করা গেলে আমাদের দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ পর্যন্ত বেশি হতে পারত। ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে দীর্ঘমেয়েদে ঋণ খেলাপিদের যে সুযোগ দেওয়া হয়েছে তাতে ভালো ঋণ গ্রহীতাদের চেয়ে মন্দা ঋণ গ্রহীতারা বেশি সুযোগ পাবে। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে ১৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকা পুনঃমূলধন দেওয়া হয়েছে। এই টাকায় পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দরের মতো চারটি সমুদ্রবন্দর করা সম্ভব। অনিয়মে ডুবে যাওয়া ফারমার্স ব্যাংককে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। এধরনের উদ্যোগ অনিয়মকে আরো উত্সাহিত করবে। ব্যাংকিং খাতের বর্তমান অবস্থা দিয়ে দেশের প্রবৃদ্ধি টেকসই হওয়া সম্ভব নয়।

পর্যালোচনায় পুঁজিবাজার নিয়ে বিশ্লেষণ তুলে ধরেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি বলেন, ২৭ লাখ বিও অ্যাকাউন্টের কথা বলা হলেও প্রকৃত বিও অ্যাকাউন্ট রয়েছে ৬৬ লাখ। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, কারা এসব অ্যাকাউন্টে বিনিয়োগ করছে সেটি খতিয়ে দেখতে হবে। ইনসাইডার লেনদেন তথ্য ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগও প্রশ্নবিদ্ধ। দুর্বল কোম্পানিগুলোর দর অনেক ওঠানামা করছে। কারসাজির ফলে পুঁজিবাজারে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী লাভবান হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা। নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসির মনিটরিং ব্যবস্থা আরো জোরদার করে এসইসির কাঠামোতে পরিবর্তন আনার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, পুঁজিবাজারে তারল্যের সংকট নেই, এখানে আস্থার সংকট প্রবল।