রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত ব্রহ্ম মন্দির

দিবা দ্বিতীয় প্রহর, আমি আছি অফিসের কাজে মগ্ন। আজ রবিবার, তাই অন্যান্য দিনের তুলনায় কাজের চাপ একটু বেশি বৈকি। এর মাঝে মোবাইল ফোন বেজে উঠল। অপর প্রান্ত থেকে সুজন মামা বলে উঠলেন, ‘সিলেটে ব্রহ্ম মন্দির কোথায়?’ বললাম, ‘বন্দর বাজারে অবস্থিত।’

—গিয়েছিস ঐখানে?

—সময়ের অভাবে যাওয়া হয় নাই।

—সিলেটে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এসেছিলেন, এর শত বর্ষ পূর্তি হতে যাচ্ছে। তুই জানিস কিছু?

—মামা, এ ব্যাপারে আগেই শুনেছি। এও শুনেছি যে, ঐ সময়ে কবি গুরু যেসব স্থানে এসেছিলেন, তার মধ্যে ব্রহ্ম মন্দিরও একটি।

—আসছে সপ্তাহে চল ঘুরে আসি ব্রহ্ম মন্দির থেকে।

মামার কথায় একবাক্যে রাজি হয়ে গেলাম। কারণ এই সুযোগ মিস করলে যাওয়াই হবে না। যাই হোক, মনে মনে ভাবলাম, ব্রহ্ম মন্দিরে যাবই যেহেতু সিলেটে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আগমনের ইতিহাসটা জেনে নেওয়া যাক। ফোন দিলাম পরিচিত কয়েকজনকে। এর মধ্যে বিজয় বিশ্বাস বললেন, ‘ফোনে বিস্তারিত বলা যাবে না। তুমি কবে যাবে ব্রহ্ম মন্দিরে? আমিও যাব তোমার সাথে, সেদিন বলব সিলেটে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আসার ইতিহাস।’ যাই হোক, অপেক্ষার প্রহর গোনা শুরু করলাম। সেই কাঙ্ক্ষিত দিনে সকালবেলা বের হলাম আমি আর সুজন। স্নিগ্ধ সকাল, নেই কোনো কোলাহল। ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পৌঁছে গেলাম গন্তব্যের কাছাকাছি। কিন্তু ব্রহ্ম মন্দির কোথায়? কোথাও কোনো পথ নির্দেশনাও চোখে পড়ল না। নিরুপায় হয়ে ফোন দিলাম বিজয় বিশ্বাসকে। তিনি বললেন, ‘দুর্গা কুমার পাঠশালার পাশে যে বাজার আছে, তার পাশে দেখা পাওয়া যাবে ব্রহ্ম মন্দিরের।’ বেশ কিছুসময় খোঁজাখুঁজি করে শেষপর্যন্ত মন্দিরের দ্বারে এসে পৌঁছালাম। রিকশা থেকে নেমেই দেখা পেলাম বিজয় বিশ্বাসের। তিনি আমাদের ভেতরে নিয়ে গেলেন। বাজারের মধ্যে অবস্থিত মন্দিরটি। সংস্কারের অভাবে কিছুটা খাপ ছাড়া অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। শত বছরের পুরোনো এ মন্দির। আমরা এগিয়ে গেলাম। মন্দিরের গায়ে বটগাছ তার সংসার পেতে বসেছে। বিজয় বিশ্বাস বললেন, বাংলা ১৩২৬ সালের কার্ত্তিক মাসের মাঝামাঝি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বেড়াতে এসেছিলেন শিলং শহরে। ব্রাহ্ম সমাজের তদানীন্তন সম্পাদক, পরলোকগত গোবিন্দনারায়ণ সিংহ ছিলেন গুরুদেবের একান্ত অনুরাগী। কবি শিলংয়ে এসেছেন একথা শোনামাত্র তাকে সিলেটে আনার জন্য গোবিন্দনারায়ণ সিংহের খুব আকাঙ্ক্ষা হলো। চটপট করে তিনি ব্রাহ্ম সমাজের পক্ষ থেকে কবিকে শ্রীভূমি সিলেটে আসার সাদর আমন্ত্রণ জানিয়ে টেলিগ্রাম করলেন। কবি জবাবে জানালেন, সিলেটে আসা তার পক্ষে সম্ভবপর নয়। কেননা দীর্ঘ পথভ্রমণ বিরক্তিকর। কবির অসম্মতি জানার পরেও গোবিন্দনারায়ণ সিংহ নিরস্ত হলেন না। আঞ্জুমান ইসলাম, মহিলা সমিতি ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও টেলিগ্রাম করবার ব্যবস্থা করলেন। এমনভাবে যখন তার কাছে আহ্বানের পর আহ্বান আসতে লাগল, তখন তাকে সম্মতি জানাতেই হলো। বিজয় বিশ্বাসের কণ্ঠে আমরা শুনছি ব্রহ্ম মন্দিরে রবি ঠাকুরের আগমনের ইতিহাস। মন্দিরের ভেতরে আমরা ঘুরে ঘুরে দেখলাম কোথাও কোথাও রং চটে গেছে আস্তরণ খসে পড়েছে। মন্দিরের একপাশে গিয়ে বসলাম। বিজয় বিশ্বাস বলছিলেন, ভৌগলিক দিক দিয়ে সিলেট শিলংয়ের কাছাকাছি হলেও সিলেট পর্যন্ত সরাসরি রাস্তা ছিল না। শিলং থেকে চেরাপুঞ্জি পর্যন্ত সড়ক ছিল। চেরাপুঞ্জি থেকে খাসিয়ারা ব্যক্তিকে বহন করে নিয়ে যাওয়ার একটি পদ্ধতির প্রচলন করেছিল। কিন্তু সে ব্যবস্থা মানবাধিকারের লঙ্ঘন বলে কবি সরাসরি নাকচ করেন এবং সিলেট থেকে প্রেরিত নিমন্ত্রণ বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেন। কবির নেতিবাচক উত্তর পেয়ে গোবিন্দনারায়ণ সিংহ, আনজুমানে ইসলাম, মহিলা পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ করে কয়েকটি টেলিগ্রাম পাঠান। আবেগঘন টেলিগ্রামগুলো কবির হূদয়কে প্রভাবিত করে। তিনি সিলেট আসার দীর্ঘ অথচ বিকল্প পথটি বেছে নিলেন। গৌহাটী থেকে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের লামডিং-বদরপুর সেকশন হয়ে করিমগঞ্জ-কুলাউড়া হয়ে সিলেট আসতে রাজি হন। ৩১ অক্টোবর কবিগুরু শিলং থেকে গৌহাটী অভিমুখে যাত্রা করেন। সেখানে কবিকে সংবর্ধনা জানানোর জন্য বিশাল আয়োজন করা হয়। দিন তিনেক সেখানে অবস্থান করে কবি ৩ নভেম্বর গৌহাটী থেকে সিলেটের উদ্দেশে রওনা দেন। গৌহাটী থেকে সিলেটের পথ প্রায় প্রতিটি স্টেশনেই কবিকে এক পলক দেখার জন্য ভক্তদের ভিড় লেগে যায়। সিলেট থেকে একটি প্রতিনিধিদল কবিগুরুকে এগিয়ে আনতে বদরপুর পর্যন্ত যায়। ট্রেন কুলাউড়া জংশনে পৌঁছালে তাকে প্রাণঢালা সংবর্ধনা জানানো হয়। কবি ও তার সহযাত্রীরা কুলাউড়াতে রাত্রিযাপন করেন। কবিকে সংবর্ধনা জানানোর জন্য অভ্যর্থন পরিষদ গঠন করা হয়। সভাপতি নিযুক্ত হন খানবাহাদুর সৈয়দ আব্দুল মজিদ। ৫ নভেম্বর সকালে ট্রেন সিলেট স্টেশনে পৌঁছালে কবিগুরুকে রাজকীয় সম্মান প্রদান করা হয়। অভ্যর্থনা জানাতে উপস্থিত হন খানবাহাদুর সৈয়দ আব্দুল মজিদ, মৌলভী আব্দুল করিম, রায়বাহাদুর প্রমোদচন্দ্র দত্ত, এহিয়া ভিলা, কাজী বাড়ি ও মজুমদার বাড়ি, দস্তিদার বাড়ির অভিজাত ব্যক্তিবর্গ। সিলেট মহিলা সমাজের পক্ষে অভ্যর্থনা জানান নলিনীবালা চৌধুরী। সুরমা নদীর উপর ঐতিহ্যবাহী কিনব্রিজ তখনো হয়নি। কবিগুরু ও তার সঙ্গীরা বজরায় সুরমা নদী পাড়ি দিয়ে মূল সিলেট শহরে প্রবেশ করেন। সিলেটের ঐতিহ্যবাহী চাঁদনীঘাটকে পত্র-পুষ্প পতাকা, মঙ্গল ঘট আর লাল শালু দিয়ে সুসজ্জিত করা হয়। শহরের বিশিষ্ট ব্যক্তি মৌলভী আব্দুল করিমকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ একটি সুসজ্জিত ফিটন গাড়িতে করে শহরের উত্তর-পূর্বাংশে ছোট টিলার উপর পাদ্রি টমাস সাহেবের বাংলোর পাশে একটি বাড়িতে যান। এখানেই কবির থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সেখানে পৌঁছালে কবিকে সংগীত ও চন্দন তিলকের মাধ্যমে অভ্যর্থনা জানানো হয়। ওইদিন সন্ধ্যায় ব্রাহ্মসমাজের আমন্ত্রণে কবি উপাসনায় যোগ দেন। সেই দিন কবি গুরু তার নিজের রচিত ব্রাহ্ম সংগীত গেয়ে শোনান ‘বীণা বাজাও যে অন্তরে’। বিজয় দাদার কথার আবেশে কিভাবে যে ঘণ্টা কেটে গেল, টেরই পেলাম না। আমরা কতটুকুই জানি এ ইতিহাস বা জানিয়েছি আমাদের প্রজন্মদের। আমরা কি এগিয়ে এসেছি এই স্মৃতিময় স্থানের রক্ষণাবেক্ষণে, এই প্রশ্নই মাথার ভেতর বারবার ঘুরপাক খাচ্ছিল। 

 

যাবেন কিভাবে

ঢাকার সায়েদাবাদ, ফকিরাপুল, রাজারবাগ ও মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে গ্রিনলাইন, শ্যামলী, এনা, হানিফ বা বিআরটিসি বাসে অথবা ট্রেনে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে সকালে আন্তঃনগর পারাবাত, দুপুরে জয়ন্তিকা ও কালনী এবং রাতে উপবন সিলেটের পথে ছোটে ভাড়া ৩৬০ থেকে ১২০০ টাকার মধ্যে। সেখান থেকে বন্দর বাজার দুর্গা কুমার পাঠশালার পাশে। ভাড়া নেবে সিএনজি অটোরিকশা ভাড়া ১০০ থেকে ১৫০ টাকা।