ঢাকায় অপারেশনের ফাঁকে গোপনে মায়ের সঙ্গে দেখা করেন খোকা

পরিবারের অন্য কাউকে কিছু না জানিয়েই গোপনে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন সাদেক হোসেন খোকা। ক্যাম্পে ট্রেনিং শেষে ঢাকায় অপারেশনের ফাঁকে গোপনে একবার মায়ের সঙ্গে দেখা করেছিলেন তিনি। 

১৯৭১ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় ছাত্র ইউনিয়নের তৎকালীন নেতা রুহুল আমীন এবং গোপীবাগের মাসুদসহ (বুড়া) বেশ কয়েকজন মিলে প্রথমে খোকারা যান নরসিংদীর শিবপুরে। ওখানে কয়েক দিন অবস্থানের পর যুদ্ধের ট্রেনিং নেওয়ার জন্য আগরতলার পৌঁছলে তাদের রিসিভ করেন শহীদুল্লাহ খান বাদল (রাশেদ খান মেননের ছোট ভাই)। 

সেখান থেকে প্রথমে বটতলাস্থ সিপিএম অফিসে গিয়ে মেননের সঙ্গে দেখা করে খোকা চলে চলে যান দুই নম্বর সেক্টরে। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ছিলেন সেই সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার। মেজর হায়দারের (পরে কর্নেল হায়দার) নেতৃত্বে ঢাকার মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। দুই নম্বর সেক্টরের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের নাম ছিল ‘মেলাঘর’। 

মেলাঘরের পারিপার্শ্বিক পরিবেশ বসবাসের জন্য একেবারেই উপযুক্ত ছিল না। পাহাড় আর ঘন জঙ্গলে পূর্ণ ছিল চারিদিক। লাল মাটির উঁচু-নিচু পাহাড়ি পথ একটু বৃষ্টি হলেই বেশ পিচ্ছিল হয়ে পড়তো। শৌচকর্ম সারতে যেতে হতো বনের ভেতরে। এ ক্যাম্পে বেশিরভাগই ছিল ঢাকা শহরের ছেলে, এ রকম পরিবেশে থাকতে তারা অভ্যস্ত ছিল না। খোকা ও তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু মরহুম মেসবাহ উদ্দিন সাবু এক সঙ্গে থাকতেন। 

এ ক্যাম্পেই তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হয় আবু সাইদ খান, শাহাদত চৌধুরী, ফতেহ আলী চৌধুরী, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, সুলতান উদ্দিন রাজা, আতিকুল্লাহ খান মাসুদ, নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু, পল্টনের মানিক (পরে শহীদ), গাজী গোলাম দস্তগীর, মিজান উদ্দিন আহমেদ, শহিদুল্লাহ, চিত্রশিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদ, মাসুদ, কাজী ভাই, উলফাৎ ও বাকী (পরে শহীদ) অন্যতম। 

মেজর হায়দারের অধীনে তিন সপ্তাহ গেরিলা ট্রেনিং শেষে তারা সম্মুখ যুদ্ধের ট্রেনিং গ্রহণ করেন ক্যাপ্টেন গাফফারের (পরে জাতীয় পার্টি নেতা ও মন্ত্রী) নেতৃত্বাধীন সাব সেক্টরে। ওখানে ট্রেনিং শেষ করার পর প্রথমদিকে কসবা-মন্দভাগ (মির্জাপুর) বর্ডার এলাকার সাব সেক্টরে কয়েকটি সম্মুখযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন তিনি। ট্রেনিং শেষে একটি গেরিলা গ্রুপের কমান্ডার হিসাবে ঢাকায় আসেন সাদেক হোসেন খোকা। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের কাছে বিমান বাহিনীর রিক্রুটিং অফিস, বাবুপুরা পুলিশ ফাঁড়ির সফল অপারেশনের নেতৃত্ব দেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে (নভেম্বর) বিডিআর গেটে (তৎকালীন ইপিআর) সফল অপারেশনের নেতৃত্বও দিয়েছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ঢাকায় অনেকগুলো সফল অপারেশনের নেতৃত্ব দেন ভয়ংকর সাহসী গেরিলা নেতা সাদেক হোসেন খোকা। যুদ্ধের ৯ মাসই প্রতিদিন এক বা একাধিক ঘটনা ঘটিয়েছেন তিনি।

সাদেক হোসেন খোকার ১৯৫২ সালের ১২ মে জন্ম নেন। সবশেষ ২০১৯ সালের ৪ নভেম্বর নিউইয়র্কে ম্যানহাটনের স্লোন ক্যাটরিং ক্যানসার সেন্টার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সাদেক হোসেন খোকা দীর্ঘদিন ধরে কিডনির ক্যানসারে ভুগছিলেন।

ইত্তেফাক/জেডএইচ