পাবনার অদম্য এক নারীর কথা

  রুমী খোন্দকার

 

পাবনার মধ্য শহরের গোপালপুর মহল্লার ক্ষুদ্র শিল্প উদ্যোক্তা অদম্য এক নারী অনুজা সাহা। অর্থনীতিতে এমএসসি পাশ করে কোথাও চাকরি না পেয়ে নিজ চেষ্টায় তিনি এখন স্বাবলম্বী। নিজেই স্বনির্ভর হননি, কিন্তু প্রায় ২০০ নারীকে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছেন। শহরের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সেলিম নাজির উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক (অব) অমূল্য সাহা ও তার স্ত্রী অঞ্জনা সাহার একমাত্র  সন্তান অনুজাকে সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ থেকে এমএসসি পাশ করান। চেষ্টা-তদবির করে মেয়ের জন্য একটি সরকারি বা বেসরকারি চাকরি জোগাড় করতে পারেননি তারা।

আলাপচারিতায় অনুজা সাহা বলেন, এইচএসসি পাশ করার পর আকস্মিকভাবে তার বিয়ে হয়। এখন ছয় বছর বয়সি ছেলেসন্তান ‘অর্ণব’-এর মা তিনি। স্বামীর ব্যাবসায়িক অবস্থা খারাপ হয়ে যাওয়ায় অর্থনৈতিক সংকটে সংসারজীবনে দিশেহারা হয়ে পড়েন অনুজা সাহা। কোথাও কোনো কর্মের সংস্থান না হওয়ায় পত্র-পত্রিকায় দেশের বিভিন্ন স্থানের নারী উদ্যোক্তার গল্প পড়ে উদ্বুদ্ধ হন। চাকরির আশা ছেড়ে দিয়ে ব্যবসা শুরু করার পরিকল্পনা নেন। অনুজার মা অঞ্জনা সাহা মেয়ের ব্যবসা করার ব্যাপারে অনাগ্রহী ছিলেন। সংসারে অভাব-অনটন বুঝতে পেরে মা একসময় সম্মতি দেন।

অনুজা সাহা সিদ্ধান্ত নেন খাবারের ব্যবসা করার। মায়ের সহযোগিতায় স্বল্প পুঁজি নিয়ে ক্ষুদ্র পরিসরে খাবারের হোম ডেলিভারি সার্ভিস চালু করেন তিনি। প্রতিষ্ঠানের নাম দেওয়া হয় অর্ণব অ্যান্ড কোং। হোম ডেলিভারি সার্ভিস থেকে নানা ধরনের পিঠা, কেক, মিষ্টি, বেকারি আইটেম, সাদা ভাত, বিরিয়ানি সরবরাহ শুরু হয় পাবনার নানা স্থানে। বিভিন্ন স্থানের বড়ো বড়ো অর্ডার পেতে শুরু করে অর্ণব অ্যান্ড কোং। ধীরে ধীরে এই ব্যবসার প্রসার ঘটতে থাকে। পুঁজির পরিমাণও বেড়ে যায়। এখানেই অনুজা থেমে নেই। বিসিক থেকে ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ নেন। মায়ের কাছ থেকে সেলাই ও কাটিংয়ের কাজ শেখেন তিনি। সেটা কাজে লাগাতে শুরু করেন। প্রশিক্ষণ নেন যুব উন্নয়নের। পাশাপাশি শুরু করেন বুটিক হাউস ব্যবসা। সেটাও আলোর মুখ দেখতে থাকে। ছোটোবেলা থেকেই নৃত্য ও সংগীতচর্চায় পারদর্শী অনুজা গড়ে তোলেন ‘মন ময়ূরী’ নামের আরেকটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। এখানে আর্ট, নৃত্য, সংগীত, আবৃত্তি, হাতের লেখা শেখানো হয় কোমলমতি শিশুদের। অনুজা জানান, তার খাবারের প্রতিষ্ঠানে ২৫ জন এবং বুটিক হাউজে ১৫০ জন শ্রমিক কাজ করছেন। আজ তিনিই শুধু স্বাবলম্বী হননি, প্রায় ২০০ দরিদ্র নারীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পেরে তিনি  আনন্দিত।

কথা হয় তার প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মরত আলপনা, পূর্ণিমা, অমলা, কৃষ্ণা, পারভিন, রেখা, লায়লা, রেহেনা, জলি, সিঁথি, তৃপ্তি, স্মৃতি, রূপাসহ অনেকের সঙ্গে। তারা বলেন, সংসারে অভাব-অনটনের কষ্ট ছিল। এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করে তাদের দারিদ্র্য অনেক কমে গেছে। স্বামীর মুখের দিকে খুব একটা তাকিয়ে থাকতে হয় না। অনুজা বলেন, সরকারিভাবে আর্থিক সহযোগিতা পেলে তার বিশ্বাস আরো এগিয়ে যেতে পারবেন। একই সঙ্গে অন্য সব নারীর অভাব-অনটন ঘুচিয়ে স্বনির্ভর করে তুলতে পারবেন।