মৌসুমীর পরিবেশ বাঁচানোর সংগ্রাম

 

>>  মুহাম্মদ শফিকুর রহমান

 

‘বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। অপূর্ব সুন্দর সব নদী রয়েছে এ দেশে। অথচ এখন নদী মরে যাচ্ছে। পাহাড় কেটে ফেলা হচ্ছে। ইকোসিস্টেম ভেঙে পড়েছে। উদ্ভিদ ও প্রাণিকূল একে একে বিলুপ্ত হচ্ছে। ছোটবেলায় যেসব ফুল দেখেছি, পাখি দেখেছি, সেসবের কিছু কিছু এখন অদৃশ্য।’ কথাগুলো ফারজানা হোসেন মৌসুমীর। তিনি একজন সাইক্লিস্ট। নদী ও পাহাড় রক্ষাসহ বিভিন্ন পরিবেশ সচেতনতামূলক কাজ করছেন। নভেরা নামে একটি গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা। সচরাচর পরিবেশ বাঁচানোর আন্দোলনগুলো যে আঙ্গিকে হয়, মৌসুমীরটা তার একটু ব্যতিক্রম। তার প্রতিষ্ঠিত গ্রুপ নভেরা মেয়েদের সাইকেল চালানো শেখায়। সাইকেলে মেয়েরা র্যালি করে। এসময় তারা যেসব প্ল্যাকার্ড বহন করে, তাতে লেখা থাকে :নদী বাঁচাও, পাহাড় বাঁচাও, বন বাঁচাও, সবুজ বাঁচাও, পৃথিবী বাঁচাও, গাছ বাঁচাও, গাছ বাঁচলে মানুষ বাঁচবে, বাতাস দূষণ বন্ধ করো, নির্মল বাতাস চাই, পানি দূষণ বন্ধ করো, পাখিদের বাঁচতে দাও, আমার মাটি আমার মা, উজার হতে দেব না, হাওর বাওর বিল বাঁচাও ইত্যাদি সচেতনতামূলক স্লোগান। রক্ষণশীলতার দেয়াল মৌসুমীরা যেন ভেঙে ফেলেছে। মেয়ে মানুষ সাইকেল চালাবে। কত রকম কথা, কটাক্ষ তো আছেই। কিন্তু এসবকে তারা পাত্তাই দেন না। তিনি বলেন, ‘আমরা যখন পরিবেশের জন্য কাজ করি। তখন আসলে কে কী বলল, ওসব ভাবার একদমই সময় হয় না।’ নভেরা নারায়ণগঞ্জ জেলার স্বপ্নবাজ নারীদের গ্রুপ। এই ফেসবুক গ্রুপে প্রায় চার শ নারী সদস্য রয়েছেন। এদের মধ্যে বেশিরভাগ সাইকেল চালান। কেউ কেউ আছেন, যারা সাইকেল চালানো শিখতে আগ্রহী। দেশের প্রথম নারী ভাস্কর নভেরা আহমেদের নামে রাখা হয় এই গ্রুপের নাম। গ্রুপটির প্রতিষ্ঠাতা মৌসুমী ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা করেন। সমাজ কল্যাণমূলক কাজ করেন অনেক আগে থেকেই। তিনি ২০১৪ সালে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের স্কুল ‘সমগীত পাঠশালা’য় পড়াতেন। কারাতেও শিখেন সেই সময়ে। ২০১৪-এ তার সাইকেল চালানোর হাতেখড়ি হয়। এত কিছু থাকতে সাইকেল কেন পরিবেশ বাঁচানোর আন্দোলনের বাহন হিসাবে বেছে নেওয়া হলো। মৌসুমী বলেন, ‘মেয়েরা সাইকেল চালাতে পারে। এই সমাজ তা ভাবতেই পারে না। মেয়েদের সাইকেল চালানো ভালো চোখে দেখে না। নারীর সাইকেল চালানো এক সাহসী কাজ, কুসংস্কার আর অজ্ঞতার মূলে কুঠারাঘাত। অন্যদিকে সাইকেল পরিবেশবান্ধব বাহন। সাইকেলে জৈব জ্বালানি ব্যবহূত হয় না। এসব কারণে সাইকেলকেই বেছে নিয়েছি মানুষকে সচেতন করতে। আমরা বিভিন্ন সময়ে সাইকেল র্যালি করি। বিভিন্ন বিষয় মানুষকে সচেতন করে তুলতে চেষ্টা করি।’ সে রকমই একটা ঘটনার কথা মৌসুমী জানালেন। এক বাস ড্রাইভার অযথাই হর্ন বাজিয়েই যাচ্ছিলেন। পরে আমরা তাকে হর্ন বাজানোর বিষয়টা বুঝিয়ে বলি। পরে তিনি এর ক্ষতিকারক দিকগুলো বুঝতে সক্ষম হন। দৃশ্যত এসব কর্মকাণ্ডে কোনো পরিবর্তন এসেছে কি? মৌসুমী বলেন, ‘আমাদের ছোট ছোট কাজগুলো একসময় পরিবর্তন নিয়ে আসবে। পরিবেশদূষণ করলে নিজেরই ক্ষতি। মানুষের মধ্যে এই বোধ জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করে যাচ্ছি। ফলে অনেকেই এখন সচেতন হয়ে উঠেছে।’

মৌসুমী জানালেন, নভেরায় সাইকেল চালানো শিখতে কোনো টাকা দিতে হয় না। বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে তারা। মাসে একটি কর্মশালা তিন দিনব্যাপী হয়ে থাকে। সর্বশেষ কর্মশালায় ১৬ জন মেয়ে এতে অংশ নিয়েছে। এ পর্যন্ত পাঁচটি সফল কর্মশালার আয়োজন করেছে নভেরা। কর্মশালা ভিত্তিক আয়োজন কিছুদিন আগে শুরু হলেও তারা সাইক্লিং শেখায় তিন বছর ধরে। সাইকেল না থাকলেও এখানে সাইকেল চালানো শেখা যায়। নভেরার সদস্যরা নিজেরা চাঁদা তুলে সাইকেল কিনে নিয়েছে।

১৫ জন প্রশিক্ষক রয়েছেন। যারা বিভিন্ন পেশায় রয়েছেন। আবার সময় করে সাইকেল চালানো শেখান। কর্মশালার বাইরে প্রায় শতাধিক নারী সাইকেল চালানো শিখেছে বলে জানা গেছে। অনেকে আছে এই গ্রুপে এসে সাইকেল চালানো শিখে এখন অন্যদের শেখাচ্ছে। নভেরার একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য নারায়ণগঞ্জ চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক সুমনা আক্তার। তিনি বলেন, ‘আমাদের কার্যক্রমে বিভিন্ন বয়সী নারীদের উত্সাহ, আগ্রহ দেখা গেছে। যা আমাদের অনুপ্রেরণা জোগায়।’ তিনি মনে করেন, কম দূরত্বে আমরা সবাই সাইকেল ব্যবহার করলে পরিবেশের ক্ষতির পরিমাণ একটু হলেও কমে। জানা গেল, তিনি নিজেও যাতায়াতের জন্য সাইকেল বেছে নেন। ২০১৯ সালের জলবায়ু সপ্তাহে নভেরার সদস্যরা পরিবেশবান্ধব বাহন সাইকেলে চড়ে মানুষের প্রতি আহ্বান জানায়, পরিবেশের সমস্ত উপাদানের প্রতি মানুষের প্রবল ‘ভালোবাসা’ জন্ম হোক। প্রত্যেক মানুষ চেতনা ফিরে পাক, পরিবেশকে সুরক্ষা করেও উন্নয়ন সম্ভব। মানুষের সঙ্গে পরিবেশের একটা চমত্কার মিথোজীবিতা গড়ে তোলা খুব জরুরি।